হোসনি মুবারকের আমলের শেষ দিকেই ভুগতে শুরু করেছিল পর্যটন শিল্প। এরপর আসলেন মোহাম্মদ মোরসি।
কিন্তু তিনিও ফিরিয়ে আনতে পারেননি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর এর পরের ঘটনা তো বলার
অপেক্ষা রাখে না। অশান্ত মিসরে সবকিছুতেই এখন হ-য-ব-র-ল
আব্দুল সালাম ওমর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাচীন সামগ্রীর ব্যবসা করেন। তার দোকানটি অবস্থিত লুকজর শহরে। মিশরের দক্ষিণাঞ্চলীয় এ শহরটির বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বিশাল উন্মুক্ত জাদুঘর হিসেবে। অর্থ ঢাললে সেখান থেকে কয়েক হাজার বছরের পুরনো সামগ্রীও কেনা যায়। ওমরের দোকানে প্রধানত পাওয়া যায় ফেরাউনের আমলের দেব-দেবী ও প্রাচীন মিশরীয় রাণীদের মূর্তি। তাছাড়া তিনি বিক্রি করেন পুরনো চিত্রকর্ম ও সুগন্ধী। কয়েক বছর আগেও তার দোকানে খদ্দেরের অভাব ছিল না। কিন্তু ইদানিং তার ব্যবসা নেই বললেই চলে। পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে ওমর বলছিলেন, ‘অবর্ণনীয় অবস্থা বিরাজ করছে মিসরে। আমার ব্যবসায়ী বন্ধুরা সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আসলে রাজনৈতিক অস্থিরতা মিসরের পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
ফুলে ফেঁপে উঠছিল মিসরের পর্যটক বাণিজ্য; বছরে আয় হচ্ছিল কোটি কোটি ডলার আর এই শিল্পটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ জড়িত হয়ে পড়েছিল দেশের লক্ষ লোক। প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের আমলের শেষ দিকেই ভুগতে শুরু করেছিল পর্যটন শিল্প। এরপর আসলেন মোহাম্মদ মোরসি। কিন্তু তিনিও ফিরিয়ে আনতে পারেননি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর এর পরের ঘটনা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। অশান্ত মিসরে সবকিছুতেই এখন হ-য-ব-র-ল। এ অবস্থায় বিদেশি পর্যটকরা প্রায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দেশটির উপর থেকে। অথচ ২০১০সাল পর্যন্ত পর্যটনই ছিল মিসরের অর্থনীতির প্রাণ। সে বছর দেশের জাতীয় আয়ে পর্যটনের প্রতিনিধিত্ব ছিল ১২ শতাংশ। যার পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
লুকজরে ২০১০ সালে হোটেল অকুপেন্সি রেট ছিল ৮০ শতাংশ। এটি এখন মাত্র ৪%। এতেই বোঝা যায় পর্যটন শিল্পের বর্তমান করুণ অবস্থাটা। এ সম্পর্কে আব্দুস সালাম ওমর বলছিলেন, ‘২০১০ সালে পর্যটন শিল্প সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল। দোকানে সাতজন লোক খাটাতাম। তার পরেও খদ্দেরদের সব চাহিদা পূরণ করতে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি একাই বসে থাকি দোকানে। তাও অলস সময় কাটাই। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে আমাকে।’ লুকজরের চেম্বার অব কমার্স-এর প্রধান মোহাম্মদ অথম্যান-এর অভিমত, সত্যি বলতে গেলে দেশের সব খাতই এখন ভুগছে। এর মধ্যে সবচে’ বেশি ভুগছে পর্যটন খাত।
অনেক কমে গেছে মিশরের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পর্যটন ব্যবসাতে তেজিভাব উবে গেছে অনেক আগেই। বিশ্বমন্দার প্রভাব ও মিশরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে কমে গেছে পশ্চিমা পর্যটকদের সংখ্যা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজেট দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যাচ্ছিলো, সেই পুরনো সমস্যাগুলো নিয়েই হাবুডুবু খাবে মোরসি সরকার। এতে নতুন প্রকল্পের জন্য তেমন বরাদ্দ নেই। বাড়তো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় এবং বাজেটের ঘাটতি মেটাতে মোরসি সরকারকে ঋণ নিতে হতো দেশি-বিদেশি উত্স থেকে। সেই সঙ্গে গুণতে হতো প্রচুর সুদ। এ সব কিছুর পর ক্রমাবনতিশীল জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের পেছনে ব্যয়ের জন্য খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকতো। চলতি অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজেটে মোরসি সরকার নতুন সরকারি বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলো মাত্র ৭৩.৭ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (৯.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে একটি জরিপে মিশরের অর্থনৈতিক বেদনা ও ভবিষ্যতের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো। এতে দেখা গিয়েছিলো, মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী বছর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। অথচ আগের বছর এমন লোকের সংখ্যাটা ছিলো ৫০ শতাংশ। ৪২ শতাংশ রায় দিয়েছিলেন, আগামী বছরে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। এর আগের বছরের চেয়ে এটি ছিলো ২০ শতাংশ বেশি। শতকরা ৭৬ শতাংশ রায় দিয়েছিলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক।
মিশরের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেকারত্ব। দেশটিতে বর্তমানে ৩.৫ মিলিয়ন লোক কর্মহীন। মোরসি সরকারের লক্ষ্য ছিলো, চলতি অর্থবছরে বেকারত্বের হার (যা শুরু হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে)। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় গত অর্থবছরের শেষ দিকে জানিয়েছিলো, আসছে অর্থবছরে ৮০ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলো, এ সংখ্যাটা বেকারত্বের হার কমাতে মোটেই অবদান রাখবে না। কারণ, মিশরে চাকরির বাজারে প্রতি বছর প্রায় সমসংখ্যক নতুন চাকরি প্রার্থী যুক্ত হয়। অধিকন্তু দেশের ২৭.৩ মিলিয়ন স্ট্রং ওয়ার্কফোর্সেও ২১.৩ মিলিয়নই অস্থায়ী শ্রমিক। এর ৪৬.৫ শতাংশ কাজ করে আনঅফিসিয়াল খাতে এবং কোনো চুক্তি ছাড়াই। ৬৭ শতাংশেরই স্বাস্থ্যবীমা নেই। অবাক করার মতো তথ্য হলো— মিশরের ২৫ শতাংশ লোক এখনো দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। রাজধানী কায়রোর ফুটপাতে অনেকেই শুয়ে থাকে সাহায্য পাওয়ার আশায়। খাবার কিনে খাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। অথচ হোসনি মুবারকের আমলে এতোটা খারাপ পরিস্থিতি ছিলো না।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিশরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে সম্পন্ন হওয়া জরিপটিতে (পিউ সার্ভে কর্তৃক) একটি প্রশ্ন ছিলো, আপনি কি দৃঢ় অর্থনীতির চেয়ে দৃঢ় গণতন্ত্রকে বেশি পছন্দ করেন। এমন প্রশ্ন শোনার পর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন শতকরা ৪৫ জন। পক্ষান্তরে ৫২ শতাংশের জবাবের সারমর্ম ছিলো, শক্তিশালী গণতন্ত্রের চেয়ে সুদৃঢ় অর্থনীতির অধীনে থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতএব বলা যায়, বসন্তের বাতাস বওয়া প্রয়োজন আসলে অর্থনীতিতে। তবেই আর উত্তপ্ত হয়ে উঠবে না তাহরির স্কোয়ার। প্রকৃতি মিশরকে দিয়েছে উজাড় করে। কিন্তু এগুলোকে কাজে লাগিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারছে না আর তারই প্রভাব পড়ছে রাজনীতিতে।
বিবিসি ওয়েবসাইট অনুসরণে
