আমিনুল হত্যার অভিযোগপত্র শ্রমিক নেতাদের প্রত্যাখ্যান

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০১
গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলায় সিআইডি’র দেয়া চার্জশিট (অভিযোগ) প্রত্যাখ্যান করেছে শ্রমিক সংগঠন কমিটি ফর জাস্টিস ফর আমিনুল। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার দাবি করেছেন, এটা বানোয়াট, ভুল ও মিথ্যা। এতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। এটা মূল খুনিকে রক্ষার শামিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ বাজার-সুবিধা (জিএসপি) ফিরে পেতে তড়িঘড়ি করে এ অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। মামলাটির পুন:তদন্তের দাবি করে আদালতে ‘নারাজি পিটিশন’ করা হবে। শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতারের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন নিহত আমিনুলের সহকর্মী বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার। আমিনুল ইসলাম বিসিডব্লিউএস ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের আশুলিয়া শাখার সভাপতি ছিলেন। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ব্রাহ্মণশাসন মহিলা কলেজের সামনে থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে পুলিশ উদ্ধার করে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম লাশ দাফন করে। এ ঘটনায় ঘাটাইল থানার এসআই শাহীন মিয়া অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পরে আমিনুলের ভাই রফিকুল ইসলাম এ ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান ও বোরকা পরা অজ্ঞাতনামা এক নারীকে আসামি করে ঘাটাইল থানায় আরেকটি এজাহার দেন। এই মামলাটি পরে সিআইডি তদন্ত করে। গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের পলাতক নেতা মোস্তাফিজুর রহমানকে এক মাত্র আসামি করে গত বছরের নভেম্বর মাসে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি ফজলুল কবীর। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কল্পনা আক্তার জানান, তদন্ত শেষে যে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে, তাতে আমিনুল হত্যাকাণ্ডে শুধু মোস্তাফিজুর রহমানকে সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনা মূল খুনিকে রক্ষার শামিল। আমিনুলের পরিবার ও তার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে সিআইডি’র দেয়া এ অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আইনগতভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতার বলেন, আমিনুলকে যেভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এটা কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। চাপে পড়ে একটি বানোয়াট, ভুল ও মিথ্যা অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। জিএসপি ফিরে পেতে সরকার তড়িঘড়ি করে এ অভিযোগপত্র দিয়েছে। আমিনুল হত্যার বিচার করা না হলে শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামবেন বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে তিন আন্তর্জাতিক সংগঠনের চিঠি : আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পুনঃ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি পাঠিয়েছে প্রভাবশালী তিনটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন। এগুলো হলো ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি), ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়ন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লোবাল ইউনিয়ন। বৃহস্পতিবার জেনেভা থেকে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে এবং ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ই-মেইলে ঐ চিঠি পাঠান আইটিইউসি’র সাধারণ সম্পাদক শরণ বড়ুয়া, ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফিলিপ জেনিং এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লোবাল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জিরকি রাইনা। এর আগে গত বুধবার মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আমিনুলের খুনিদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে বলে, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার ছাড়া বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর থেকে কালো ছায়া দূর হবে না। অভিযুক্ত মোস্তাফিজের হদিস নেই : ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর আশুলিয়ার বাইপাইলে আমিনুলের সংগঠনের কার্যালয়ে যান মোস্তাফিজুর রহমান ও একজন বোরখা পরিহিত নারী। রাত ৮টার দিকে তারা আমিনুলকে ডেকে নেয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। লাশ শনাক্তের পর আমিনুলের ভাইয়ের দায়ের করা মামলাটি পুলিশের করা হত্যা মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে ঘাটাইল থানা, পরে টাঙ্গাইলের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে মামলাটির তদন্তভার সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়। এক বছর তদন্ত শেষে গত নভেম্বর মাসে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর মামলার অভিযোগপত্র টাঙ্গাইল জেলা আদালতে জমা দেন। তবে আমিনুল হত্যার পর থেকেই মোস্তাফিজুর পলাতক ছিলেন। সর্বশেষ গত বছরের ১০ জুন সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে মোস্তাফিজুরকে ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার কাদিরপাড়া গ্রামে মোস্তাফিজুরের বাড়ি। মোস্তাফিজুর একসময় সাভারের হেমায়েতপুরের কুইন্স সাউথ নামে একটি গার্মেন্টসের শ্রমিক ছিলেন। ২০০৯ সালে তার চাকরি চলে যায়। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মোস্তাফিজুর ছিলেন একই সঙ্গে তিনটি সংস্থার সোর্স। এগুলো হলো জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর (এনএসআই), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও শিল্প পুলিশ। আমিনুল খুন হওয়ার আগে ও পরে তার সন্দেহভাজন খুনি মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছিল। সিআইডি ঐ দুইটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ ও মাঠ কর্মকর্তা লুত্ফর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায় যে, আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় গার্মেন্টস কারখানার বিভিন্ন তথ্যের জন্য মাঠ পর্যায়ের অনেকেরই সঙ্গে তাদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হয়। বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের জন্য গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের নেতা, গার্মেন্টস শ্রমিক এমনকি সোর্সদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। মোস্তাফিজুর’র সঙ্গে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার তথ্যের জন্য তাদের যোগাযোগ হতো। অভিযোগ পত্রে গোয়েন্দা শাখার এই দুই কর্মকর্তা জড়িত কিনা-এমন কোন তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। তবে আমিনুলের সহকর্মীরা বলছেন, তাকে যেভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে একাধিক ব্যক্তি তা ঘটিয়েছেন। একা মোস্তাফিজুরের পক্ষে এভাবে একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা সম্ভব নয়। আমিনুলের স্ত্রী হোসনে আরা ফাহিমা শুক্রবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘সংগঠনের বাবুল ভাই ও কল্পনা আপার সাথে কথা হয়েছে। এ মামলায় পুলিশ যে চার্জশিট দিয়েছে তা আমরা মানি না। এ বিষয়ে আমরা আইনি সহায়তা নিব। ’