চকবাজার এলাকার বাসিন্দা শাহীন আহমেদ। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। জন্ম নিবন্ধনের সনদ দিয়ে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেছেন ঠিকই কিন্তু এখন পড়েছেন সমস্যায়। সনদে মেয়ের নামের বানান ভুল। স্কুল কর্তৃপক্ষ সাত দিন সময় দিয়েছেন নির্ভুল সনদ জমা দেয়ার জন্য। কয়েক মাস আগে শাহীন আহমেদ কষ্ট করে জন্ম সনদ নিয়েছিলেন, এখন আবার দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন শুদ্ধ সনদ নেয়ার জন্য। গত বুধবার এজন্য তিনি এসেছিলেন লালবাগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। নিজে জন্ম-মৃত্যু সনদ শাখায় দুই দফা আসার পর জানলেন নতুন করে শুদ্ধ সনদ নেয়ার নিয়ম-কানুন। এরপর নতুন করে আবেদন করেছেন বানান ঠিক করার জন্য। আঞ্চলিক কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা জানিয়েছেন ১৫ দিন লাগবে শুদ্ধ জন্ম সনদ দিতে। এখন উপায় কি? কাজকর্ম ফেলে এভাবে প্রতিদিন আসা-যাওয়া তো সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত শাহীন আহমেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিছু টাকা দিয়ে কাজটা দুই-একদিনের মধ্যে করিয়ে ফেলবেন। তিনি জানান, এর আগে গত ডিসেম্বরে ৩০০ টাকা দিয়ে তিনদিনে জন্ম নিবন্ধনের সনদটি নিয়েছিলেন।
এই অবস্থা শুধু শাহীন আহমেদের নয়। পুরো রাজধানীবাসীর। আগে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে নাগরিকত্ব সনদ, চারিত্রিক সনদ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদ, বৈধব্য সনদ, আয়ের সনদ, আবাসন পরিবর্তন বা স্থানান্তর সনদ, ভূমিহীন সনদপত্র, প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক ভাতার সনদপত্র, পাসপোর্ট সত্যায়ন, স্বাক্ষর বা টিপসই/ছবি সত্যায়ন, জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরম সত্যায়িতসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়া যেত। কিন্তু দুই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন না হওয়ায় এসব সেবা দেয়ার ক্ষমতা এখন নেই ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের। যে কারণে প্রয়োজনীয় সনদ পেতে এভাবেই নিত্য ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমস্যার কথাও কাউকে বলতে পারছেন না তারা।
ডিসিসি ভাগ হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের সনদ দেয়ার ক্ষমতা এখন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত হয়। কিন্তু ঢাকাবাসীর অনেকেই এসব আঞ্চলিক কার্যালয় চেনেন না। আবার সেখানে গেলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। এছাড়া প্রায় প্রতিটি কার্যালয় ঘিরে অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে। ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা খরচ না করলে এখন সনদ পাওয়া মুশকিল। যা পাওয়া যায়, তাতেও ভুল অনেক।
আরেকজন ভুক্তভোগী জানান, নগরভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ জন্ম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রকারের সনদ নিয়ে নিয়মিত বাণিজ্য করে থাকেন। সনদের জন্য নামমাত্র ফি নির্ধারিত থাকলেও কয়েকগুণ বেশি আদায় করা হয়। অল্প সময় বা দিনে দিনে সনদ নিতে গুণতে হয় বড় অংকের টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি চক্র এই অর্থ হাতিয়ে নেন।
রাজধানীর ৯২টি ওয়ার্ডের এসব সেবা এখন দুই সিটি কর্পোরেশনের ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে দেয়া হচ্ছে। কাউন্সিলর বা মেয়রের দায়িত্ব আমলাদের দেয়া হলেও তারা জনসেবার দিকে তেমন নজর দিচ্ছেন না। আবার প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রশাসক বদলের নিয়ম করায় দেখা দিয়েছে অন্যরকম জটিলতা। যারা দায়িত্ব পাচ্ছেন তারাও সংস্থার উন্নয়নের বিষয়ে মনোযোগী হতে না হতেই বদলি হয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে দুই বছরের বেশি সময় পার করেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।
রাজধানীর ওয়ার্ড কাউন্সিরের কার্যালয়গুলো এখন ওয়ার্ড সচিবের কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। ভাঙ্গাচোরা অফিসগুলোতে সচিবদের দেখা মেলা ভার। সরেজমিনে গত মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে (পরীবাগ এলাকা) গিয়ে দেখা যায়, বেলা সাড়ে ১২টা বাজে অথচ ওয়ার্ড সচিব নেই। তিনি কোনো কাজে বাইরে গেছেন। নাগরিকত্ব সনদ নিতে আসা এক মহিলা বসে আছেন। কার্যালয়ের ওপর একটি জনবিজ্ঞপ্তি লাগানো রয়েছে। ‘এতদ্বারা’ দিয়ে শুরু করা বিজ্ঞপ্তির সারাংশ হলো, যেকোনো সনদ-সংক্রান্ত প্রয়োজনে অঞ্চল-১ কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু সেই অঞ্চল-১ কার্যালয় কোথায় সেটা ঐ মহিলা জানেন না। এমনকি বেশির ভাগ স্থানীয় লোকজন জানেন না। ওয়ার্ড সচিব সেকেন্দার আলী মোবাইল ফোনে ইত্তেফাককে বলেন, এই আঞ্চলিক কার্যালয়টি ফুলবাড়িয়ার নগর ভবনের ১০ তলায়। সেখান থেকেই নাগরিকত্ব সনদে স্বাক্ষর করে আনতে হয়।
ওয়ার্ড সচিবের কথা মতো আঞ্চলিক অফিসে গেলে নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, আগে ৯০ জন কাউন্সিলর ও ৩০ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর নগরবাসীর সেবা দিতেন। এখন সেই কাজ ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়ে চলছে। তিনি স্বীকার করেন, কাউন্সিলররা যে সেবা দিতেন, তারা তা পারছেন না। আগে কমিশনাররা রাস্তাঘাট, ড্রেন, রাস্তার লাইটসহ বিভিন্ন বিষয়ে উন্নয়নের প্রস্তাব দিতেন। তারা চেষ্টা করতেন কীভাবে এলাকার উন্নয়ন করা যায়। কিন্তু আঞ্চলিক কর্মকর্তারা দিনের দিন রুটিন মাফিক কাজ করছেন। তবে সনদের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন ঐ কর্মকর্তা।
রাজধানীর সব ওয়ার্ডে সচিবের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিজস্ব কোনো কার্যালয় নেই। এলাকাবাসী জানান, সাবেক কাউন্সিলর হাজী আবদুল কাদের শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে হাজি আশরাফ আলী মার্কেটের নিচতলায় কার্যালয় বানিয়ে দায়িত্ব পালন করতেন। এখন ছোটখাটো সমস্যা, নানা রকমের সনদের জন্য তাদের আঞ্চলিক কার্যালয়ে দৌড়াতে হয়।
ভোগান্তির শিকার নগরবাসীর অনেকের দাবি এ সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন না হওয়া। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ডিসিসির নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন আছে। এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনদের পরাজিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। কাজেই তারা নির্বাচন দিচ্ছে না। এতে ডিসিসি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নাগরিকরা নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্দেশ্য হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা।
