‘আমার কল্পনাশক্তি খুবই কম। বড় মাপে কল্পনা করতেও পারি না। আর আমি যা লিখি তাতে খুব কল্পনার দরকারও হয় না। চারপাশের প্রবহমান জীবন, মানুষের চলমান সুখ-দুঃখ, মানুষের কান্না-হাসি, চোখের কোনে জল চিকচিক করে ওঠা- এসব কবিতায় ধরবার চেষ্টা করি। আমরা সবসময় শুনে এসেছি কবিতা ‘কল্পনালতা’ বা কল্পনার ফসল। আমার কাছে কবিতা তা নয়। কল্পনায় ভর করে কিছু লিখেছি বলে মনে পড়ে না। বলছিলেন কবি নীরেন্দ নাথ চক্রবর্তী। বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বলতম এক নাম। বাংলা কবিতায় এক নতুন ভাষা ও নতুন দর্শণ নিয়ে উদ্ভাসিত তিনি। গতকাল ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম আয়োজিত ‘কবিতার দিক দিগন্ত’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।
বয়স ৯০ ছুঁয়েছে। কিন্তু এখনো তারুণ্যের ঝলক তার কথায়। ভাবনায়। হাঁটেন একটু খুঁড়িয়ে কিন্তু গলার স্বর এখনো উদাত্ত। প্রায় দেড় ঘণ্টা কবিতা নিয়ে অত্যন্ত সরলভাবে আলোচনা করলেন। তুলে ধরলেন বাংলা কবিতার পটভূমি, সাম্প্রতিক প্রবণতাসহ বিভিন্ন বিষয়। প্রতিটি বিষয় বিশ্লেষণ করলেন নানা কবিতার উপমায় ও ব্যাখ্যা দিয়ে। মিলনায়তন ভর্তি দর্শক মগ্ন হয়ে পুরোটা সময় শুনলেন এই জীবন্ত কিংবদন্তির কথা।
এইচএসবিসি ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৩’ প্রদান উপলক্ষে বাংলাভাষার বিশিষ্ট এই কবি ঢাকায় এসেছেন। গতকালের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর এমিরেটাস আনিসুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত।
নীরেন্দ নাথ চক্রবর্তী বলেন, যা চোখের সামনে দেখি তাই নিয়েই কবিতা লিখি। কলকাতায় দেখেছি, ঢাকাতেও দেখছি পরিবারগুলো ছোট হয়ে আসছে। এ নিয়েই একটি কবিতা লিখেছি ‘সাকুল্যে তিন জন’। এভাবেই নিজের চোখে দেখা বিষয় নিয়ে লিখি।
কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা কবিতা পড়েন না তাদের দোষ দেয়া চলে না। কবিতা পড়েননি বলে তারা কোন খারাপ মানুষ নন। কিন্তু কবিতার কাছ থেকে যে কিছু পাওয়া যেতে পারে- এ ধারণা তাদের নেই। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে মনে যে আনন্দ-বিষাদ খেলা করে- এটা অনেকে বুঝবেন না। এটা বুঝবার অনুভুতি নিয়েও সবাই জন্মায় না। কিন্তু ভাল মানুষ হতে কোন বাধা থাকে না।
তাহলে কবিতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী, দেনা-পাওনার কোন সম্পর্ক আছে? নিজেই প্রশ্ন করেন কবি। এরপর উত্তরও দিয়ে দেন। বলেন, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য চোখে ধরা পড়ে না। কবিতা এক গোপন সৌন্দর্য বোধকে প্রকাশ করে। তবে কবিতা থেকে আমাদেও প্রাপ্তি তিনটি। এক- আনন্দের মুহূর্তে আমরা কবিতার কাছ থেকে সমর্থন পাই। দুই- কবিতার কাছ থেকে শোকের সান্ত্বনা পাই। তিন- যখন মানুষ ভগ্নজানু অবস্থায় লড়াই করবার শক্তি হারিয়ে ফেলে, কবিতা তখন লড়াই ছেড়ে যেতে দেয় না। লড়াই চালিয়ে যাবার শক্তি জোগায়।
