রাজধানীতে আবার শুরু চাঁদাবাজির সেই ধারা! ‘আমি শীর্ষ সন্ত্রাসী শুব্রত বাইনের সহযোগী বলছি। আমাদের সহযোগীরা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত হয়েছে। তাদেরকে চিকিত্সার জন্য মোটা অংকের টাকা প্রয়োজন। আপনার কাছে চাই এক লাখ টাকা। বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে দেবেন। তবে পুলিশ বা র্যাবকে জানাবার চেষ্টা করবেন না। তা হলে প্রাণটাই চলে যাবে’। এভাবেই গেল সপ্তাহে ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা এক প্রকৌশলীকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে চাঁদাদাবি করে সন্ত্রাসীরা। ঐ প্রকৌশলী থানা পুলিশের দারস্ত হননি। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে তার বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাংখীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কেউ তাকে দিয়েছে অভয়, আবার কেউ বলেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়ার। এ অবস্থায় কী করবেন জানতে তিনি একাধিক সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছেন। শুধু এ প্রকৌশলী নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককেও একইভাবে ফোনে চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়েছে। প্রাণভয়ে ঐ শিক্ষক শাহবাগ থানায় জিডি (সাধারণ ডাইরি) করেছেন। একই হুমকি নিয়ে কাফরুল থানায় জিডি করেছেন একজন আইনজীবী।
এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (পশ্চিম) শেখ নাজমুল আলম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ অধিকাংশ ঘটনার তদন্তে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র এ কাজটি করে থাকে। তাদের অস্ত্র শুধু মোবাইল ফোন। পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ চক্রটিকে ফালতু বলে উল্লেখ করেন। তিনি মোবাইল ফোনে হুমকি দিলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে (ডিবি) অবহিত করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, পুলিশ সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে।
চাঁদাবাজি সম্পর্কে ডিসিডিবি নাজমুল আলম আরও বলেন, চাঁজাবাজির তীব্রতা আগের মত নেই। দু’একটি যদি হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নানা চিন্তা করে পুলিশের দারস্ত হন না। ফলে পুলিশ থাকে অন্ধকারে।
তিনি আরও বলেন, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে ডিএমপি সদা সর্তক রয়েছে। এর সঙ্গে কারো জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রভাবশালী হলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত জিডিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ শিক্ষক জানান, মোবাইল ফোনে চাঁদাদাবি করে হুমকি দেয় তিন দফায় ভিন্ন ভিন্ন নম্বরে। টাকা না দিলে হুমকিদাতারা তার স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে অপহরণের কথা জানায়। প্রাণভয়ে ঐ শিক্ষক থানা পুলিশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেন। বিষয়টির তদন্ত ন্যস্ত হয় ডিবিতে। কাফরুল থানায় দায়েরকৃত জিডির বাক্তব্য প্রায় অনুরূপ। অপরদিকে হজ্বে যাওয়ার আগে দারুস সালাম এলাকার এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে চাঁদাবাজরা মোটা অংকের টাকা দাবী করে হুমকি দেয়। হুমকির কারণে তিনি হজ্বে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঐ ব্যবসায়ী যোগাযোগ করেন ডিবিতে। ডিবির সহায়তায় তিনি শেষটায় চাঁদাবাজদের কবল থেকে মুক্তি পান এবং হজ্বে যান।
একইভাবে হুমকির শিকার হন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ। তিনি এ ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় জিডি করেন। ঘটনাটি তদন্ত করে ডিবি (মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ হুমকি প্রদানকারী প্রতারক রানা চৌধুরীকে গত ২৯ মার্চ ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। রানা চৌধুরী ঘটনার কথা স্বীকার করে গত ৩ এপ্রিল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
সাম্প্রতিক এ ধরনের বেশকটি চাঁদাবাজি ও হুমকির ঘটনার রহস্য উদঘাটনকারী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে যারা চাঁদাবাজি করছে তারা প্রতারক চক্র। যাদের অধিকাংশের বাড়ি মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানা এলাকার লুন্দি ও শ্রীকৃষ্ণদি এলাকায়। এরা বিভিন্নভাবে বিশেষ করে বাসার দারোয়ান, গাড়িচালক, কাজের লোকের মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হয়। এরপর তারা মোবাইল ফোনে টাকা চেয়ে হুমকি দিয়ে থাকে। আর তাদের হুমকিতে ভীত হয়ে অনেকেই কুরিয়ার সার্ভিস বা বিকাশের মাধ্যমে টাকা প্রদান করে থাকে।
পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তার পরামর্শ হচ্ছে এসব হুমকির ঘটনায় শংকিত হওয়ার কিছু নেই। এ চক্রের অধিকাংশের অবস্থান ঢাকার বাইরে। হুমকি-ধমকি তাদের চাঁদাবাজির কৌশল। লাখ টাকা দিয়ে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়েই খুশী হয়।
পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, হজ্বগামী দারুসসালামের গার্মেন্ট ব্যবসায়িকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেয় এ চক্রটি। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ঐ নম্বরে (হুমকি প্রদানকারীর ফোন নম্বর) হুমকি না দেওয়ার জন্য ম্যাসেজ প্রদান করেন। পরবর্তীতে হুমকি প্রদানকারী মাদারীপুরের তৌহিদ তাকে ফোন করে বলে, ‘স্যার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর এ ধরনের কাজ করব না। আমি সেই তৌহিদ কয়েকমাস আগে মাদারীপুর থেকে যাকে আপনি গ্রেফতার করেছিলেন।’
রাজধানীর যে সব এলাকায় চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে ঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে আসল চাঁদাবাজদের (পেশাদার সন্ত্রাসী চক্র) উত্পাত একেবারে কমেছে এমনটা বলা যাবে না। নগরীর মিরপুর, মতিঝিল, কাফরুল, পল্লবী, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ঢাকা কলেজের সামনে (বিভিন্ন মার্কেটে) চাঁজাবাজির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকরা। এসব চাঁদাবাজদের সঙ্গে সরকারদলীয় বিভিন্ন সংগঠনের বেশ কিছু সদস্য জড়িত রয়েছে। তবে প্রাণ ভয়ে কেউ বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে না। লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় পুলিশ কিছুই করতে পারে না। পুলিশের ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন, যাদের নামে চাঁদাবাজি চলছে তারা হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত (বিদেশে আত্মগোপনকারী), ফার্মগেটে সুইডেন আসলাম (বর্তমানে কারাগারে) ও আশিক (বিদেশে আত্মগোপনে), কাফরুলে কিলার আব্বাস (বর্তমানে কারাগারে), পল্লবীতে মুসা (বিদেশে আত্মগোপনে), মোহাম্মদপুরে নবী হোসেন (বিদেশে আত্মগোপনে) ও মতিঝিলে মানিক। তবে কলকাতার কারাগারে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগীদের তত্পরতা তেমন একটা নেই।
