সাভারের হেমায়েতপুর। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের টেলিভিশন বানানোর কারখানা। বিশাল জায়গা জুড়ে কারখানা। এখানে কাজ করছেন ১১১ জন। এদের মধ্যে ৮০ জনই নারী। ৬ জন সুপারভাইজার আর বাকি ৭৪ জন শ্রমিক। টেলিভিশন তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১০ ধাপেই কাজ করছে এই সকল নারী। কথা হয় তাদের কয়েকজনের সঙ্গে।
শেখ আফরোজা। সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করেছেন তিনি। কাজ করছেন ফিড সেকশনে। আফরোজার মতো আরো ৫ জন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সকলের বেতন ২০ হাজার টাকার অধিক। সবাই থাকেন ঢাকাতে। যাতায়াত করেন অফিসের গাড়িতে।
কথা হলো আরেকজন সুপারভাইজার শামসুন নাহার হাবিবের সাথে। তিনি কাজ করছেন প্রোডাকশনে। কথা প্রসঙ্গে বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজ শিখেছি। আমার এক ছেলে এক মেয়ে। পরিবার থেকে সব সময় সহায়তা করে।
নাসিমা আক্তার নামের আরেক সুপারভাইজার কাজ করছেন কিউসি বিভাগে। অন্য দুই সুপারভাইজার শিউলি বেগম ও জেবুন্নেসাও কিউসি বিভাগে কর্মরত আছেন।
এদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ব্যবস্থাপক গৌর চন্দ্র ঘোষ বলেন, ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে টেলিভিশন তৈরির কাজ শুরু হয়। বর্তমানে এই নারী শ্রমিকদের হাত দিয়ে বছরে ৫০ হাজার টেলিভিশন তৈরি করি আমরা। কায়িক পরিশ্রম ছাড়া ধৈর্য দিয়ে করা যায় বলে এটি নারীবান্ধব কাজ। তিনি মনে করেন, ইউসেপের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান এই কাজে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে ক্ষেত্রকে আরো বেশি প্রসারিত করতে পারেন। এছাড়া আমরা ভালো বেতন দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় না। এবিষয়ে মালিকরা সচেতন হলে শ্রমিকরা কাজের উত্সাহ পাবে।
অন্যদিকে কথা হয় কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গেও। মৌসুমি আক্তার সুমি। ১৩ বছর ধরে কাজ করছেন এখানে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানের অধিকাংশ কর্মী ইউসেপ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কাজ করে। এই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত একজন কর্মী ৯ হাজার টাকা বেতনে কর্ম জীবন শুরু করে। তাদের বোনাস, বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুবিধাদি আছে। সুমি আরো বলেন, অনেক মেয়ে আছে যারা প্রশিক্ষণের অভাবে কাজ করতে পারে না। তারা জানে না কোথায় গেলে এসব প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে। তাই যেমন প্রশিক্ষণের সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন প্রশিক্ষণের বিষয়ে সকলকে জানানো।
জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকে অবিভিক্ত পাকিস্তানের এই অঞ্চলে কিছু ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী তৈরির কারখানা ছিল। স্বাধীনতার পরে বিধ্বস্ত দেশে এই শিল্প একটু করে যাত্রা শুরু করে আজ বিশাল এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। আফ্রিকা ও আরব দেশসমূহে দেশে তৈরি এসব পণ্য রপ্তাণি করা হচ্ছে। আছে ব্যাপক চাহিদা। এক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। নিজের কর্মসংস্থান ছাড়াও দেশের সমৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন এই সকল নারী।
বিজ্ঞজনেরা বলছেন, বিদেশি নিম্নমানের আমদানি পণ্যের বাজার দখল রোধ ও চাহিদা মোতাবেক দক্ষ শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা এই খাতকে এগিয়ে নিয়ে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি করতে পারে।
এই শিল্পে দক্ষ শ্রমিক সরবরাহের প্রধান ভূমিকা পালন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউসেপ। ১৯৭২ সাল থেকে রোজগারি শিশুর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করে চলছে এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে তাদের ৮টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ৫৩টি ভোকেশনাল স্কুলে ৪৮ হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে ইউসেপের ইমপ্লিমেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস সেন্টার তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। গত বছর তারা ২৭৮ প্রশিক্ষিত কর্মীর চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এদের মধ্যে ২৫৬ জনই নারী।
ইউসেপের নির্বাহী পরিচালক জাকির হাসান বলেন, নারীরা ধৈর্যশীল, একাগ্রচিত্তে, সুনিপুণ হাতে কাজ করতে পারে বলে একাজে তারা অল্প সময়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কাজেও তারা দক্ষতার প্রমাণ রাখছে। তাই শিল্প কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকের চাহিদা অধিক। চাহিদা মোতাবেক আমরা শ্রমিক দিতে পারছি না। এই কাজে প্রশিক্ষিত একজন নারী ৬ হাজার টাকার অধিক বেতনে কাজে যোগদান করতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে তাদের শিক্ষার্থীদের অনেকেই ২০ হাজার টাকার অধিক বেতনে চাকরি করছে।
