বড় নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৩১
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের রথ ছুটছে আজ থেকে। নয় ধাপে ভোট চলবে আগামী ১২ মে পর্যন্ত। আর ঐ ভোট গণনা হবে ১৬ মে। এবারের নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ৮১ কোটি ভারতীয় ভোটার তাদের সরকার বেছে নেবেন। এ ভোটার সংখ্যা পুরো ইউরোপের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। নয় লাখ ৩০ হাজার নির্বাচনী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে ভোটের জন্য। থাকছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ব্যবহারও। এবার উত্তর প্রদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩ কোটি ৪০ লাখ ভোটার ভোট দেবে। সবচেয়ে কম ভোটার হলো সিকিমে তিন লাখ ৬২ হাজার। এবারের নির্বাচনে পুরুষ ভোটার ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে আটটি অঞ্চলে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার সংখ্যা বেশি। নির্বাচনে দুই কোটি ৩০ লাখ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। যা মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ। এতো বড় নির্বাচনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করবেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রায় ১ কোটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। নির্বাচনে প্রার্থীরা ৭০ লাখ রুপি পর্যন্ত খরচ করতে পারবে। তবে সব নির্বাচনী আসনে খরচের সীমা এক নয়। এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা যদি মোট ভোটের ছয় ভাগের এক ভাগ না পান তাহলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রার্থী জামানত হারিয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনে ৩৬৩টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে বহুজন সমাজ পার্টি সর্বোচ্চ ৫০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কংগ্রেস করেছিল ৪৪০ আসনে আর বিজেপি ৪৩৩ আসনে। এবারও দলগুলোর অংশগ্রহণ কাছাকাছি। এবারের নির্বাচনে প্রথমবার ‘না’ ভোট দেয়ারও সুযোগ পাবেন ভোটাররা। নির্বাচনপূর্ব বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিরোধী দল বিজেপি এবার অনেক এগিয়ে। তবে তৃতীয় ফ্রন্টের গড়ার ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপি’র জন্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এছাড়া আম আদমি পার্টিও কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে দুই দলকে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতকে এ নির্বাচন করতে কিছু বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেমন দেশটিতে এখনো বেশিরভাগ নারী তাদের স্বামীর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। যদিও অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে ভারতীয় নারীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। দক্ষিণ দিল্লির একটি বস্তিতে বসবাস করেন শীলা কুমার। তিনি এবারের নির্বাচনে স্বামীকে প্রভাব খাটাতে দেবেন না বলে জানান। তার কণ্ঠস্বর অনেকটা আধুনিক ভারতীয় নারীদের মতো। তবে ভারতের সব নারী যে এ ধরনের সুযোগ পাবে তা নয়। আবার শীলার স্বামী এটি নির্ধারণ না করলেও আরেকজন আছেন যিনি এটি নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন জাতের বা বর্ণের নেতারা নির্ধারণ করে দেন কাকে ভোট দেয়া হবে। শীলা জানান, তারা মধ্য পর্যায়ের কুর্মি জাতের লোক। নেতারা যাকে বললেন সবাই তাকেই ভোট দেবে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের জাতিগত বিশ্বস্ততা প্রায়ই ভারতকে বিড়ম্বনায় ফেলে। এ ধরনের আনুগত্য বা স্বজনপ্রীতি আধুনিক মূল্যবোধের বিরোধী। তাই ভারতের গণতন্ত্র এখনো যথার্থ রূপ পায়নি। একদিকে হেলে কেবল সামনে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, অনেক ক্ষমতাশালীও জনগণের ভোটে পরাজিত হয়। দেশটির সংবিধানই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এ ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হয়েছে সংবিধানের জন্যই। রাজনৈতিক ভাষ্যকার অজয় বোসের মতে, রাজনীতিকরা তাদের ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। জনগণ যেমন ভোট দিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনতে পারে ঠিক তেমনি পরের নির্বাচনে ক্ষমতা থেকে ফেলেও দিতে পারে। ভারতের জন্য এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভোটের পদ্ধতিতে এখনো জাতিপ্রথার প্রভাব রয়েছে। গোষ্ঠীর নেতারা পুরো কমিউনিটিকে প্রভাবিত করে। যদিও ভারতের সংবিধান ও আইনে এ ধরনের জাতিগত বিভেদ নিষিদ্ধ। কিন্তু সামাজিক এই বিভক্তি এখনো ভোটের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। আগের অচ্ছুত-দলিতরা এখন প্রভাবশালী ভোটব্যাংক। তাদের ভোট পেতে রাজনৈতিক দলগুলো সব ধরনের অঙ্গীকার করছে। পরিবার ও সমাজের বড়রা ভোটারদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। যে কারণে ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বহিঃপ্রকাশ সহজ হয় না। জাতিগত এবং সামাজিক বৈষম্য, উন্নয়নের অভাব ভারতের গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রোহী মাওবাদীরা সব সময় নির্বাচন বর্জন করেছে। তারা সাধারণ নির্বাচন বানচালের হুমকি দিয়ে এসেছে বিভিন্ন সময়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিমধ্যে এই মাওবাদীদের ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২০টিতে এখন সক্রিয় রয়েছে মাওবাদীরা। পূর্বের বিহার থেকে শুরু করে মধ্য ভারত হয়ে সর্ব দক্ষিণের রাজ্য কেরালা ও তামিলনাড়ুতে তারা সক্রিয়। দরিদ্র কৃষক ও গরিবদের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও চাকরির বড় অংশে সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে তারা। ১৯৭৯ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত অতর্কিত ও আত্মঘাতী হামলায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। ইতিমধ্যে বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকায় নিরপত্তা বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মী ও ভোটারদের নিরাপত্তায় আরো সেনা পাঠনো হবে। একই অবস্থা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে। সেখানেও কয়েকটি গোষ্ঠী নির্বাচন বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে। আবার চীন সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এখন অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিরাট সংখ্যায় ভোটার। ভারতের অনেকগুলো রাজ্য বড় হওয়ায় একদিনে নির্বাচন হওয়া কঠিন। এ কারণে ধাপে ধাপে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের স্থানান্তরের মাধ্যমে এই নির্বাচন হবে। বিহারের মতো রাজ্যে ৬ দিনে নির্বাচন হবে। এই প্রদেশে সহিংসতা ও বুথ দখলের ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ। বোস বলেন, ভারতের নির্বাচনের সবচেয়ে অনন্য দিক হলো এর বিশাল ভোটার সংখ্যা। তবে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে জনগণ। তারা নিজেদেরকে প্রাসঙ্গিকই মনে করছেন।