শরণার্থী হয়েই জীবন পার?

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৩২
অভ্যন্তরীণভাবে নানা সমস্যার মুখে থাকা ছোট্ট দেশ লেবানন এখন আরো কঠিন সমস্যার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে লেবাননকে শরণার্থীদের একটা বিরাট বোঝা বহন করতে হচ্ছে। দেশটির নিজস্ব নাগরিকদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সিরিয়ান। সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে লেবাননই সবচেয়ে ভঙ্গুর এবং ছোট্ট দেশ। আর এর প্রমাণ পাওয়া গেছে গতমাসে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, শরণার্থী সমস্যা লেবাননের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। লেবাননের জনগণ অনেক ভদ্রতা দেখিয়েছে। কিন্তু এর মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং তাদের এই কঠিন সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে চলাটাই এখন দুষ্কর হয়ে পড়ছে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, শরণার্থী সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫শ’ শরণার্থী নিবন্ধিত হচ্ছে। অর্থাত্ প্রতিটি মিনিটে একটির বেশি। শরণার্থীর সংখ্যা যেহারে বাড়ছে সেহারে খাদ্য সাহায্য-সহযোগিতা বাড়ছে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, শরণার্থীদের জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ এর মাত্র ১৪ শতাংশ পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে সাহায্য দিয়ে এক লঙ্কা কাণ্ড ঘটে যায়। সহযোগিতার ক্ষেত্র এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। একজন স্ত্রী তার অসুস্থ স্বামী এবং চার সন্তানকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। অভিযোগ- তারা শত চেষ্টা করেও সাহায্য পাচ্ছিলেন না। সিরিয়ায় এখন সরকারপন্থি এবং সুন্নিপন্থি মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। আর গৃহযুদ্ধের এই অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে লেবাননেও। দেশটিতে শিয়া এবং সুন্নি মুসলামান জনগোষ্ঠীর বসবাস। আছে খ্রিস্টানও। ইতোমধ্যে লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১০০ মানুষ নিহত হয়েছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদপন্থি এবং বিরোধীদের মধ্যে চলা সংঘাতে। নিম্ন-মধ্যআয়ের দেশ সিরীয় শরণার্থীর কারণে লেবাননে এখন জনসংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। যুদ্ধের প্রথমদিকে অনেক সিরীয় শরণার্থীর বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সামর্থ্য ছিল। এখন সেটা ধীরে ধীরে কমছে। অনেক অ্যাপার্টমেন্ট এখন খালি পড়ে আছে। লেবাননের বেকা উপত্যকা, বৈরুতের সাবরা এবং শালিতা ক্যাম্পে অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করে বাস করছে অনেকে। এই স্থানগুলো আগে থেকেই বিখ্যাত হয়ে আছে। কারণ ১৯৮২ সালে ইসরাইলের আক্রমণের সময় ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের ওপর লেবাননের খ্রিস্টান মিলিশিয়ারা গণহত্যা চালিয়েছিল। ক্যাম্পগুলো বৈরুত থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে গড়ে তোলা হয়েছে। দাহিয়েহ নামের এই জেলা শিয়া নিয়ন্ত্রিত। এখানে প্রায় ১০ হাজার শরণার্থী রয়েছে। বস্তিতে বাস করলেও তারা মনে করছেন, সিরিয়ার চেয়ে এখানে তারা অনেক ভাল আছেন। অনেকে আবার অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে বাস করছেন। এদেরই একজন মোহাম্মেদ যিনি ২শ’ ডলারের একটি কক্ষ ভাড়া করে বাস করেন। কক্ষে কেবল ইঁদুর আর ইঁদুর। এখানকার পানি লবণাক্ত। গোসল করতে গেলেই চোখ জ্বালা-পোড়া করে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি একটা কাজ জোগাড় করতে পারেননি। ফলে কতদিন এইভাবে ভাড়া করে থাকতে সমর্থ হবেন সেটা নিয়ে তিনি অনিশ্চতায় আছেন। নাজওয়া নামের ৫ সন্তানের জননী সিরিয়ার ইদলিব থেকে ৫ মাস আগে এখানে এসেছেন। সঙ্গে আছে তার তিন মেয়ে। আর দুই ছেলে সিরিয়ায় আছে। সমপ্রতি তিনি জানতে পেরেছেন তার এক ছেলে নিহত হয়েছে। আরেকজন কোথায় আছেন সেটা তিনি জানেন না। তবে তিনি ছেলের নাম প্রকাশ করতে চাননি। যদি তার নামটা প্রকাশ হয় তাহলে তাকে খোঁজা হবে এই ভয়ে। তিনি দুই মাস আগে ব্লু কার্ডটা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন নতুন করে আবেদন করলেও পাননি। জমির মালিক প্রতিদিন তাকে হুমকি দিচ্ছে যে ভাড়া না দিতে পারলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। শাবরা এবং শাতিলা ক্যাম্পের জনসংখ্যা কিছুদিন আগেও ১০ হাজার ছিল যা এখন ২৫ হাজারে পরিণত হয়েছে। অথচ ক্যাম্পের আয়তন বাড়েনি। লেবানন কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পের আয়তন বাড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ফলে ৮০ থেকে ১শ’ স্কয়ার ফুটের স্থানে চার-পাঁচতলা ভবন গড়ে উঠেছে। ক্যাম্পগুলো এত সংকীর্ণ যে সেখানে আলো-বাতাস ঠিকমতো পৌঁছায় না। জনসংখ্যার ঘনত্বে সেখানে গরম লেগেই থাকে। ফলে অসুখ বাড়ছে। অন্যদিকে ক্যাম্পগুলোতে লেবাননের মিলিশিয়া বাহিনী এবং অস্ত্রধারীরা এখানে আসা-যাওয়া করছে এবং কালোবাজারিতে লিপ্ত রয়েছে। এরফলে অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠনের কর্মীরাও এখানে আসতে পারছে না। মন্দের ভালো! শরণার্থী শিবিরে নানা সমস্যা থাকলেও বাড়ির চেয়ে ভাল। অন্তত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পারছেন সিরিয়ার নাগরিকরা। শরণার্থী শিবিরগুলোও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। জর্ডানের শিবিরগুলোর কাছে বাজার গড়ে উঠেছে, এমনকি আধুনিক সুপার শপও। শরণার্থীদের মতে, শিবিরে নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হলেও বাড়ির চেয়ে ভাল! কারণ সিরিয়ায় থাকা মানে জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া। কেবল বন্দুকের ভয় নয়। আছে না খেয়ে থেকে আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে নিজেকে ঠেলে দেয়া। এই যেমন হোমস শহরের কথাই ধরা যাক। শহরটি একবছরের বেশি সময় সরকার দখল করে রেখেছে। শহরের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী আলতাওয়ে জানান, তাদের আগে খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। ফলে তারা যদি বোমা কিংবা বন্দুকধারীদের গুলিতে না মরে তাহলে ক্ষুধার যন্ত্রণায় মরতে হবে। ফলে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা মাটিতে লতা-পাতা, ঘাসসহ যা কিছু পাচ্ছে তাই কাঠের সাহায্যে সামান্য পানিতে গরম করে খাচ্ছে। কয়েকদিন আগে একজন ঘাস খাওয়ার ছয় ঘন্টা পর মারা যায়। অনেকে নানা অসুখে ভুগছে। কিন্তু চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুই তাদের জন্য সুখকর। কিন্তু তবুও বাঁচতে চায় মানুষ। আর সেজন্যই যারা সুযোগ পাচ্ছে দেশ ছাড়ার তারাই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে।