ফিলিপাইন

শান্তি চুক্তি শান্তি আনবে কী

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৩৩
সময় কত কিছুই না বদলে দেয়! ২০১০ সালে বেনিগনো একুইনো থ্রি তখনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি; ছিলেন সিনেটর। তবে ঢাকে বাড়ি পড়ে গিয়েছিল নির্বাচনের। এ অবস্থায় ফিলিপাইনের বিদ্রোহী গ্রুপ মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ)-এর নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন আমেরিকান দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সান্ধ্যভোজের সময় কথা প্রসঙ্গে শীর্ষস্থানীয় এক বিদ্রোহী নেতা বলেছিলেন, ‘বেনিগনো একুইনো থ্রি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন, কিন্তু আমাদের সমস্যাটি বোঝা তাঁর জন্য খুবই দুষ্কর। সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে তিনি অপরিপক্ব।’ আজ চার বছর পর সেই বেনিগনো একুইনো থ্রি-ই ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর সরকারের আমলেই এমআইএলএফ-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত হল শান্তি চুক্তি। এ ব্যাপারে আরেক বিদ্রোহী নেতা মন্তব্য করেছেন, ‘তিনি প্রেসিডেন্ট না থাকলে হয়তো এ চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হতো না।’ বেনিগনোর মা কোরাজন একুইনোসহ ফিলিপাইনের অনেক নেতাই দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও অঞ্চলে সহিংসতা বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছিলেন; কিন্তু কেউই সফল হতে পারেননি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হয়তো সেই বন্ধ্যাত্ব ঘোচাতে যাচ্ছেন। শান্তি চুক্তির ফলশ্রুতিতে এমআইএলএফ সকল সদস্য ২০১৬ সাল নাগাদ অস্ত্র সমর্পণের পর ফিরে যাবে স্বাভাবিক জীবনে। শান্তি চুক্তিতে সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন পিস প্যানেলের সভানেত্রী মিরিয়াম করোনেল-ফেরার এবং এমআইএলএফ-এর পক্ষে মোহজের ইকবাল। চুক্তি সাক্ষর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেনিগনো একুইনো থ্রি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। ২০০৬ সালে নেপাল সরকার ও মাওবাদী বিদ্রোহীদের মধ্যে শান্তি চুক্তির পর এটিই বিশ্বের সবচে’ উল্লেখযোগ্য শান্তি চুক্তি, যেটি গত ২৭ মার্চ স্বাক্ষরিত হয়েছে ম্যানিলার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও অঞ্চল পেতে যাচ্ছে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন। ফিলিপাইন সরকার আশা করছে চুক্তির ফলে দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মুসলমানের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে এবং সত্যি সত্যিই শান্তি ফিরে আসবে দেশটিতে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা— চুক্তি করা হয়েছে শুধু এমআইএলএফ-এর সঙ্গে। কিন্তু মিন্দানাওয়ে সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপ, যারা লড়ে যাচ্ছে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকা মুসলিম চরমপন্থী নেটওয়ার্ক আবু সায়াফ-এর দৌরাত্ম্যও উল্লেখ করার মতো। মিন্দানাওয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ৫০ লাখেরও বেশি মুসলমান বসবাস করলেও সেখানে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এরই মধ্যে তারা চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ও হুমকি দিয়েছে ওই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার। কিন্তু বেনিগনো একুইনো থ্রি’র সুবিধাটা হচ্ছে কিছুদিন আগে করা এক জরিপে দেখা গিয়েছিল তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। অথচ শান্তি চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল তখন। সে হিসেবে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও চুক্তি বাতিল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি তাঁর ছয় বছরের মেয়াদ ঠিকই কাটিয়ে যেতে পারবেন এবং রাজনৈতিক পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে এ চুক্তিকে বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হবেন। এমআইএলএফ-এর আদি সংগঠনের নাম মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট। জেবিদাহ গণহত্যার পর ১৯৬০’র দশকে এই সংগঠনটি সৃষ্টি হয়েছিলো। নীতির দ্বন্দ্বে ১৯৭৭ সালে জন্ম নেয় এমআইএলফ। এর প্রতিষ্ঠাতা নুর মিসউরি। এই সংগঠনটির সদস্যদের হিংস্রতার কারণে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি লোক আর বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে প্রায় ২ লাখ লোককে। তাদের সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার। বর্তমানে ফিলিপাইনে বেশ কয়েকটি মুসলিম বিদ্রোহী দল সক্রিয় থাকলেও ম্যানিলা সরকার এমআইএলএফকেই সবচে’ বেশি মূল্যায়ন করে। কারণ ম্যানিলা সরকার বিদ্রোহ দমনে যতোবার সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে মিন্দানাওয়ে ততোবারই এমআইএলএফ যোদ্ধাদের কাছ থেকে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। তারা ভাবে, সরকার ফিলিপাইনের মুসলমানদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করে। তাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ফিলিপাইনে নতুন কোনো বিষয় নয়।