ক্রিমিয়া বা ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দূরত্ব বাড়ছে। পশ্চিমা শক্তি স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে এসেছে তাদের সামরিক জোট-ন্যাটো। মূলত ক্রিমিয়ায় সৈন্য ঢুকিয়ে ঐ অঞ্চলকে নিজের করে নেয়া আর ইউক্রেন সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জবাবে ন্যাটো আর বসে থাকছে না। তাই উত্তেজনা এখন সামরিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে বলা চলে। রাশিয়ার সামরিক তত্পরতার পাল্টা জবাবে ন্যাটোও পূর্ব ইউরোপে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে। ন্যাটোর কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়েও পরিষ্কার করে তা পাননি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ। উল্টো ন্যাটোর অভিযোগ, ক্রিমিয়াকে নিজের মধ্যে নিয়ে মস্কো সব ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে।
ক্রিমিয়াকে নিয়ে রাশিয়ার কলেবর বৃদ্ধির ঘটনাকে ইউরোপের নিরাপত্তায় বিরাট হুমকি বলে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ন্যাটো মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন। ব্রাসেলসের এক সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ন্যাটো তার সদস্যদের স্বার্থে সমন্বিত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রাখবে। একই সাথে রাশিয়ার সাথে সামরিক বেসামরিক সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়। এ অবস্থায় মস্কোর সাথে পরামর্শ করার প্রস্তাব দিয়েছে রুশ উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি অ্যান্তোনভ। ইউক্রেনে রাশিয়া সেনা অভিযান চালাতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় ব্রাসেলস সম্মেলনে। বিমানের নিরাপত্তার জন্যও ক্রিমিয়ার আকাশ পথ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করে দিয়েছে ইউরোপের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা। ক্রিমিয়ার আকাশ পথ ব্যবহার না করার পরামর্শ সংস্থাটির। যদিও ইউক্রেনই এখন পর্যন্ত ক্রিমিয়ার আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ঐ পরামর্শ বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে গোটা ইউরোপ।
ক্রিমিয়া ইস্যুকে ইউরোপের অনেক নেতা ১৯৩৮ সালে হিটলারের চেকোশ্লাভিয়া দখলের সাথে তুলনা করেছেন। ঐ সময়ে চেকোশ্লাভিয়ার অধিকাংশ মানুষের ভাষা ছিলো জার্মান। এমন বক্তব্য সমালোচনায় ক্ষিপ্ত রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ জানান, নিজ সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে জড়োর হবার অধিকার রয়েছে তাঁর দেশের সেনাবাহিনীর। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ব ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করছে ন্যাটো। লাভরভ জানান, মহড়া শেষে সৈন্যরা আবারো নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যাবে। একই সাথে বেলারুশে মস্কোর আধা সামরিক বাহিনীর যৌথ মহড়ার নতুন ঘোষণাও চিন্তায় ফেলেছে ইউরোপীয় নেতাদের।
রাশিয়াকে সায়েস্তা করতে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা মাথায় রেখেছে ন্যাটো। এর মধ্যে মস্কোর গায়ে জ্বালা ধরাবে এমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাটি হলো- বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোতে ন্যাটোর স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ছিলো এমন দেশ এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুনিয়ার নিরাপত্তায় মনোযোগ দিচ্ছে ন্যাটো। ঐ অঞ্চলে চলবে নিয়মিত সামরিক মহড়া ও বিমান টহল। এরই মধ্যে এ কাজে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। পেন্টাগন জানিয়েছে, ন্যাটোর মহড়ায় আরো যুদ্ধ বিমান পাঠানো হবে। একই সাথে বাল্টিক সাগরে পাঠানো হচ্ছে মার্কিন রণতরী। ওয়াশিংটন বা ইউরোপ আমেরিকার ২৮ জাতির সামরিক সংগঠন ন্যাটো খুব ভাল করেই জানে রাশিয়ার স্পর্শকাতরতা কোথায়। সেটা হলো পোল্যান্ড। এ কারণে সেখানেও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নিচ্ছে ন্যাটো। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকট তৈরির জন্য এই পরিকল্পনাই যথেষ্ট।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলছেন, ন্যাটোর পরিকল্পনা উত্তেজনা প্রশমনে এবং সংকট সমাধানে কূটনৈতিক পথ বের করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। এর পরপরই রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করে আনে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলেই কি উত্তেজনা কমছে? কারণ অনেকেই সেনা প্রত্যাহারের জন্য রাশিয়াকে সাধুবাদ জানালেও ন্যাটো তা অস্বীকার করে বলছে, ইউক্রেন সীমান্ত থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করেনি মস্কো। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর সব ধরনের সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্য হলো আগামী মে মাসের যৌথ সামরিক মহড়া। আটকা পড়া সাবমেরিন উদ্ধারের ঐ মহড়ায় ন্যাটোর সাথে রাশিয়ারও যোগ দেয়ার কথা ছিলো। মজার ব্যাপার হলো- আফগানিস্তানে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক অটুট থাকবে। সংস্থার মহাসচিব রাসমুসেনই এই তথ্য জানিয়েছেন।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই হয়তো সামরিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। যেটুকু জানা গেছে, ঐ এলাকার নিয়মিত মহড়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে ইউক্রেনকে। উদ্দেশ্য, সেদেশের সামরিক বাহিনীকে অত্যাধুনিক করে গড়ে তোলা। এরই মধ্যে ইউক্রেনের সামরিক চাহিদার তালিকা চেয়েছে ন্যাটো।
