‘পাতালে হাসপাতালে’- কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের লেখা ছোটগল্প। দেশে স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা নিয়ে এটি লিখেছিলেন তিনি। এই লেখনীর বর্ণনার চাইতেও নিচে নেমে গেছে রাজধানীতে পৌর করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবার মান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সময় সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যকেন্দে চিকিত্সক থাকেন না। রোগীরা যথাযথ চিকিত্সাসেবা বঞ্চিত। ওষুধ, যন্ত্রপাতি এবং লোকবল সংকটও রয়েছে। অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ আছে সমানতালে। এছাড়া ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের উত্পাততো আছেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল-হারুন বলেন, আগে সমস্যা ছিল, এখন অনেকটা সমাধান হয়েছে। বর্তমানে যথাযথ মনিটরিং করা হচ্ছে। তারপরেও কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নগরবাসীর চিকিত্সাসেবার জন্য রয়েছে ৩টি হাসপাতাল। এছাড়া আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারি প্রকল্পের ৫৫টি স্বাস্থ্যসেবা এবং ১০টি মাতৃসদন কেন্দ্র রয়েছে। আরবান প্রকল্পের আওতায় নগরীতে ১১০টি স্যাটেলাইট টিম রয়েছে। প্রতি টিমে সদস্যসংখ্যা ২ জন। এছাড়া রয়েছে ৪টি হোমিওপ্যাথিসহ ২২টি দাতব্য চিকিত্সালয়। ৫৫টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দে র মধ্যে ২৫টির রয়েছে নিজস্ব ভবন। বাকি ৩০টি স্বাস্থ্যকেন্দ পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া করা ভবনে।
তবে ভাড়া ভবনগুলো চিকিত্সাসেবা দেয়ার উপযুক্ত নয়। শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দে চিকিত্সক, প্যারামেডিক, পরিদর্শক এবং নার্স মিলিয়ে জনবল ১৯ জন হওয়ার কথা। তবে কোথাও আছে তিনজন, কোথাও চারজন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আফজালুর রহমান বলেন, আমার জানা মতে চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম ভালোই চলছে। নগরবাসীর কাছে এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বেশ সুনামও রয়েছে।
তবে সরেজমিনে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যায়নি। ৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, দুপুর ১২টা। নয়াটোলা মাতৃসদন কেন্দে গিয়ে দেখা যায়, তিনজন রোগী অভ্যর্থনা টেবিলের সামনের চেয়ারে বসা। আশেপাশে কেউ নেই। কথা হয় রোগীদের সঙ্গে। তারা জানান, সাড়ে ১১টায় এসেও চিকিত্সককে পাননি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললে তাদের বলা হয়, বৃহস্পতিবার বলে ডাক্তার একটু আগেই চলে গেছেন। মাতৃসদনের দ্বিতীয় তলায় তিন-চারজন কর্মচারীকে দেখা যায়। এখানে ভর্তি হয়ে থাকা শাহেলা বানু জানান, প্রসূতিপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার জন্য ভর্তি হয়েছি। চিকিত্সকরা মোটামুটি খোঁজ-খবর নেন। কিন্তু এখানকার ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। অধিকাংশ শারীরিক পরীক্ষা বাইরে করাতে হয়। বিদ্যুত্ চলে গেলে গরমে আর অন্ধকারে থাকতে হয়। এ মাতৃসদনের এক কর্মচারী বলেন, জনবল সবসময় একরকম উপস্থিত থাকে না। তারপরও এ কেন্দ টিতে রোগীরা ভালোই চিকিত্সাসেবা পান। প্যাথলজিক্যাল বিষয়ে অনেক সময় প্যাথলজিস্ট না থাকলে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। ৬ এপ্রিল, রবিবার, সকাল ১১টা। পশ্চিম আগারগাঁও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভাড়া দালানে ছোট্ট পরিসরে রোগীদের বসার কক্ষে দু’জন কর্মচারী বসে আছেন। রোগী বসে আছেন ৪ জন। তবে তাদের সময় না দিয়ে চিকিত্সক ব্যস্ত আছেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপে কথা হয় এখানকার প্রশাসনিক সহকারী সুমন রাজার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন রোগী আসে। এটি প্রাথমিক চিকিত্সাকেন্দ্র। এখানে কোনো জটিল রোগের চিকিত্সা হয় না। এছাড়া সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত নয়াবাজারের মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, লালবাগের মহানগর শিশু হাসপাতাল, নাজিরাবাজার মাতৃসদন হাসপাতালসহ আরবান প্রাইমারী হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারি প্রজেক্টের আরো কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে প্রায় অভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যায়।
বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে আরবান হেলথ কেয়ারের ৫৩১ কোটি টাকার স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। মূলত ১৯৯৮ সালে রাজধানীর মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার ও বিদেশি দাতাসংস্থার অর্থায়নে আরবান হেল্থ কেয়ার প্রকল্পের যাত্রা শুরু। যার আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০০০ সালে। প্রকল্পের কাজ চলমান।
