আর সবার মতোই কবিতা দিয়েই শুরু। মাকে নিয়ে। গাছপালা নিয়ে। ফুল-লতা, মনের ভাল লাগা মন্দ লাগা নিয়ে লিখেছি লাইনের পর লাইন। কষ্ট-মস্ট করে অন্তমিল দিয়ে লেখা এসব পদ্য মনে হতো কবিতায় বুঝিবা বিপ্লব ঘটছে। এর ফাঁকে ফাঁকে গল্পও লেখা চলছে। জামালপুর ছোট্ট শহর। তখন একটিও পাকা সড়ক ছিল না। সয়েলিং করা কিংবা ইট বিছানো দুই-একটি সড়ক। আর সবই পাক্কা মাটিতে শক্ত বাঁধুনির রাস্তা এপাড়া ওপাড়াকে জুড়িয়ে দিয়েছে। আর ছিল রাস্তার মোড়ে মোড়ে কেরোসিনে আলো জ্বালানোর ল্যাম্পপোস্ট। সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশ যখন রাঙা হতে শুরু করে, সে সময়টাতেই একটা লোক ঘুরে ঘুরে ল্যাম্পপোস্টের বাতিতে কেরোসিন ঢালত। বাতি জ্বেলে ঝলমলিয়ে তুলত রাস্তার মোড়। এসব কিছুতেই আমার মুগ্ধতা। কবিতা লিখতে দেখে সবাই বাহবা দিল, এতে ফুলে যেত বুক।
তখন মফস্বল শহরে দৈনিক পত্রিকার আনাগোনা ছিল কম। ঐদিনকার পত্রিকা ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে আসত বিকালে। কিছু কিছু ঘরে পত্রিকা পৌঁছুত সন্ধ্যেয়। আর আমরা খবরের কাগজের ব্যাপারে ছিলাম একেবারেই বে-খবর। শহরে তখন সাকুল্যে একটাই রেডিও দেখেছিলাম—বেঢপ সাইজের। তার অ্যান্টেনা টাঙ্গানো ছিল লনে পোঁতা লম্বা বাঁশের ডগায়। তাই কবিতা ছাপানোর নেশাটা তখন তেমন চাগিয়ে ওঠেনি। ভাবনা ছিল, ভবিষ্যতে বই ছাপা হবে। আর আগেই এক্সারসাইজ খাতা শাদা কাগজে মুড়িয়ে প্রচ্ছদে রং-বেরঙের আঁকিবুকি করতাম। বইয়ের নাম লিখতাম। তার নিচে নিজের নাম। ঠিক ছাপা বইয়ের মতো। ওতেই আনন্দ।
আমাদের বাসার পাশেই আশেক মাহমুদ কলেজের এক অধ্যাপকের বাস। শহরে কবি হিসেবেও মশহুর। নাটোরের লোক। কবি আবদুর রহমান আব্বাসী। খুব সজ্জন। আমাকে কবিতা লিখতে দেখে তিনি উত্সাহ দেন। আমি হাওয়ায় উড়ি।
আমার সহপাঠী বন্ধু খসরু। আবদুল বারী খান। সম্প্রতি এডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে অবসরে যাপন করছেন। সে যোগাড় করে নিয়ে এল টাকা। ঐ দিয়ে বই হবে না— লিফলেট হবে, কবিতার লিফলেট। তখন আমরা দুইজনেই ক্লাস ফোরের ছাত্র। ছাপার হরফে বেরুলো আমার প্রথম কবিতা ‘গোলাপ ফুল’ লিফলেটের আকারে। শহরময় বিলি করে বেড়াই দুই বন্ধু। কেউ মুচকি হাসেন। কেউ মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। কেউ ভয় পান, কবিতা স্পর্শ করলেই যদি পয়সা দাবি করি। বিনে মূল্যের কবিতা বুঝালেও বোঝেন না। রাতারাতি শহর জুড়ে আমার নতুন নাম হলো ‘কবি সাহেব’। শিক্ষকরাও ডাকেন। সহপাঠীরাও ডাকেন। বড় ভাইরাও। এর পর ক্লাস সেভেনে আরো একটা কবিতার লিফলেট ‘রবি’। এর মধ্যেই দৈনিক পত্রিকা ঘাটতে শিখেছি। ছোটদের পাতা দেখতে পেয়েছি। সদস্য হয়েছি সাপ্তাহিক জনতার। সোনালী দিনের আসর’-এ। দৈনিক সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’-এ দৈনিক ইত্তেফাক-এর ‘কচি-কাঁচার আসর’-এ। এদিকে কচি-কাঁচার মেলার সাথেও জড়িয়ে গেলাম। আমাদের শহরের মেলার নাম ‘এগিয়ে চলো কচি-কাঁচার মেলা’। সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে দাদা ভাইয়ের সাথে কত যে চিঠি চালাচালি, তাকে ঘিরে কত যে কৌতূহল।
এর মধ্যেই লেখা ছাপা হচ্ছে দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা অধুনালুপ্ত) -এর সাত ভাই চম্পায়। কচি-কাঁচার আসরে সোনালি দিনের আসরে। খেলাঘরে, অধুনালুপ্ত আজাদ-এর মুকুলের মহফিলে। এমনকি সাহিত্যের পাতাতেও। কবিতা, গল্প, ভারি ভারি প্রবন্ধ।
ক্লাস এইটে এসে আমরা সেই দুই বন্ধু মিলে প্রকাশ করলাম একটি ম্যাগাজিন ‘প্রভা’। আমি সম্পাদক, আবদুল বারী খান প্রকাশক। তখন আয়ুব খানের জঙ্গী শাসন। কত যে আয়ুবি কালাকানুন। ময়মনসিং জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে পেলাম শো-কজ নোটিস। আর এদিকে পুলিশ সবগুলো কপি বাজেয়াফত করে নিয়ে গেল। আমার সাহিত্য জীবনে প্রথম ধাক্কা। এরপর আরো কত যে ধাক্কাধাক্কি।
এর মধ্যে আমি বুঝে গিয়েছি। কবিতা লেখা আমার কাজ নয়। আমি নেমে গিয়েছি গল্প-উপন্যাস লেখার সাধনায়। সাধনা এখনো চলছে।
আমার জন্ম ১৭ জুন ১৯৫২, জামালপুর শহরে। আমার ছোটদের জন্য প্রকাশিত শিশু-কিশোর বইগুলো হলো: গ্রহলোকের গোয়েন্দা, অবাক বাড়ির সিংহদরোজা, চন্দ্রলোকে গণ্ডগোল, রাঙামাটির রহস্য-রঙ্গ, পুতুল কন্যা, দুঃখী পালোয়ানের বীরত্বগাঁথা, বাঁশের কেল্লার গণ-নায়ক, সিন্দবাদের সাত দেশ, রাজার বাড়ি ধুম-ধাড়াক্কা, নির্বাচিত শিশু-কিশোর সমগ্র ও মামার বাড়ি পালাই পালাই।
আতা সরকার
আর সবার মতোই কবিতা দিয়েই শুরু। মাকে নিয়ে। গাছপালা নিয়ে। ফুল-লতা, মনের ভাল লাগা মন্দ লাগা নিয়ে লিখেছি লাইনের পর লাইন। কষ্ট-মস্ট করে অন্তমিল দিয়ে লেখা এসব পদ্য মনে হতো কবিতায় বুঝিবা বিপ্লব ঘটছে। এর ফাঁকে ফাঁকে গল্পও লেখা চলছে। জামালপুর ছোট্ট শহর। তখন একটিও পাকা সড়ক ছিল না। সয়েলিং করা কিংবা ইট বিছানো দুই-একটি সড়ক। আর সবই পাক্কা মাটিতে শক্ত বাঁধুনির রাস্তা এপাড়া ওপাড়াকে জুড়িয়ে দিয়েছে। আর ছিল রাস্তার মোড়ে মোড়ে কেরোসিনে আলো জ্বালানোর ল্যাম্পপোস্ট। সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশ যখন রাঙা হতে শুরু করে, সে সময়টাতেই একটা লোক ঘুরে ঘুরে ল্যাম্পপোস্টের বাতিতে কেরোসিন ঢালত। বাতি জ্বেলে ঝলমলিয়ে তুলত রাস্তার মোড়। এসব কিছুতেই আমার মুগ্ধতা। কবিতা লিখতে দেখে সবাই বাহবা দিল, এতে ফুলে যেত বুক।
তখন মফস্বল শহরে দৈনিক পত্রিকার আনাগোনা ছিল কম। ঐদিনকার পত্রিকা ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে আসত বিকালে। কিছু কিছু ঘরে পত্রিকা পৌঁছুত সন্ধ্যেয়। আর আমরা খবরের কাগজের ব্যাপারে ছিলাম একেবারেই বে-খবর। শহরে তখন সাকুল্যে একটাই রেডিও দেখেছিলাম—বেঢপ সাইজের। তার অ্যান্টেনা টাঙ্গানো ছিল লনে পোঁতা লম্বা বাঁশের ডগায়। তাই কবিতা ছাপানোর নেশাটা তখন তেমন চাগিয়ে ওঠেনি। ভাবনা ছিল, ভবিষ্যতে বই ছাপা হবে। আর আগেই এক্সারসাইজ খাতা শাদা কাগজে মুড়িয়ে প্রচ্ছদে রং-বেরঙের আঁকিবুকি করতাম। বইয়ের নাম লিখতাম। তার নিচে নিজের নাম। ঠিক ছাপা বইয়ের মতো। ওতেই আনন্দ।
আমাদের বাসার পাশেই আশেক মাহমুদ কলেজের এক অধ্যাপকের বাস। শহরে কবি হিসেবেও মশহুর। নাটোরের লোক। কবি আবদুর রহমান আব্বাসী। খুব সজ্জন। আমাকে কবিতা লিখতে দেখে তিনি উত্সাহ দেন। আমি হাওয়ায় উড়ি।
আমার সহপাঠী বন্ধু খসরু। আবদুল বারী খান। সম্প্রতি এডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে অবসরে যাপন করছেন। সে যোগাড় করে নিয়ে এল টাকা। ঐ দিয়ে বই হবে না— লিফলেট হবে, কবিতার লিফলেট। তখন আমরা দুইজনেই ক্লাস ফোরের ছাত্র। ছাপার হরফে বেরুলো আমার প্রথম কবিতা ‘গোলাপ ফুল’ লিফলেটের আকারে। শহরময় বিলি করে বেড়াই দুই বন্ধু। কেউ মুচকি হাসেন। কেউ মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। কেউ ভয় পান, কবিতা স্পর্শ করলেই যদি পয়সা দাবি করি। বিনে মূল্যের কবিতা বুঝালেও বোঝেন না। রাতারাতি শহর জুড়ে আমার নতুন নাম হলো ‘কবি সাহেব’। শিক্ষকরাও ডাকেন। সহপাঠীরাও ডাকেন। বড় ভাইরাও। এর পর ক্লাস সেভেনে আরো একটা কবিতার লিফলেট ‘রবি’। এর মধ্যেই দৈনিক পত্রিকা ঘাটতে শিখেছি। ছোটদের পাতা দেখতে পেয়েছি। সদস্য হয়েছি সাপ্তাহিক জনতার। সোনালী দিনের আসর’-এ। দৈনিক সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’-এ দৈনিক ইত্তেফাক-এর ‘কচি-কাঁচার আসর’-এ। এদিকে কচি-কাঁচার মেলার সাথেও জড়িয়ে গেলাম। আমাদের শহরের মেলার নাম ‘এগিয়ে চলো কচি-কাঁচার মেলা’। সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে দাদা ভাইয়ের সাথে কত যে চিঠি চালাচালি, তাকে ঘিরে কত যে কৌতূহল।
এর মধ্যেই লেখা ছাপা হচ্ছে দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা অধুনালুপ্ত) -এর সাত ভাই চম্পায়। কচি-কাঁচার আসরে সোনালি দিনের আসরে। খেলাঘরে, অধুনালুপ্ত আজাদ-এর মুকুলের মহফিলে। এমনকি সাহিত্যের পাতাতেও। কবিতা, গল্প, ভারি ভারি প্রবন্ধ।
ক্লাস এইটে এসে আমরা সেই দুই বন্ধু মিলে প্রকাশ করলাম একটি ম্যাগাজিন ‘প্রভা’। আমি সম্পাদক, আবদুল বারী খান প্রকাশক। তখন আয়ুব খানের জঙ্গী শাসন। কত যে আয়ুবি কালাকানুন। ময়মনসিং জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে পেলাম শো-কজ নোটিস। আর এদিকে পুলিশ সবগুলো কপি বাজেয়াফত করে নিয়ে গেল। আমার সাহিত্য জীবনে প্রথম ধাক্কা। এরপর আরো কত যে ধাক্কাধাক্কি।
এর মধ্যে আমি বুঝে গিয়েছি। কবিতা লেখা আমার কাজ নয়। আমি নেমে গিয়েছি গল্প-উপন্যাস লেখার সাধনায়। সাধনা এখনো চলছে।
আমার জন্ম ১৭ জুন ১৯৫২, জামালপুর শহরে। আমার ছোটদের জন্য প্রকাশিত শিশু-কিশোর বইগুলো হলো: গ্রহলোকের গোয়েন্দা, অবাক বাড়ির সিংহদরোজা, চন্দ্রলোকে গণ্ডগোল, রাঙামাটির রহস্য-রঙ্গ, পুতুল কন্যা, দুঃখী পালোয়ানের বীরত্বগাঁথা, বাঁশের কেল্লার গণ-নায়ক, সিন্দবাদের সাত দেশ, রাজার বাড়ি ধুম-ধাড়াক্কা, নির্বাচিত শিশু-কিশোর সমগ্র ও মামার বাড়ি পালাই পালাই।
