বারান্দার ইজি চেয়ারে চোখ বুঁজে বসে আছেন লোকটি। চোখ-মুখে পরম তৃপ্তির চিহ্ন। হাতে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার কচি-কাঁচার আসরের জন্মদিনের সংখ্যাটি। লোকটির বয়স আশির কাছাকাছি ঊনাশি। এ বয়সে কী কেউ কচি-কাঁচার আসর পড়ে! অন্য কেউ দেখলে হয়তো হেসেই কুটি কুটি হবে। কিন্তু আতহারউদ্দিন নামের এই লোকটি পড়েন। শুধু পড়েন বললেও ভুল হবে, বলা চলে কচি-কাঁচার আসরের অন্ধভক্ত তিনি। আচ্ছা তোমাদের কাছে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি— তোমরা তো কচি-কাঁচার আসর নিয়মিত পড়ছো, তাই না? কী একটু নড়ে-চড়ে বসলে যে! তার মানে মাঝে মাঝে দু’একটা সংখ্যা মিসও যায় তোমাদের, কি ঠিক বলেছি তো? কিন্তু এই আতাহারউদ্দিন লোকটার কথা এইমাত্র বলছিলাম না তোমাদের, তিনি কিন্তু জীবনে কচি-কাঁচার আসরের একটি সংখ্যাও মিস দেননি। দুর্ঘটনাক্রমে কোনো সংখ্যা মিস গেলে তিনি কিন্তু সোজা ইত্তেফাক অফিসে চলে যান। এই বয়সে সামান্য (!) একটা পত্রিকার জন্য পত্রিকা অফিসে ছুটে চলা পাবলিককে তাহলে কী পাগল পাঠক না বললে চলে? হ্যাঁ, তিনি একজন পাগল পাঠকই বৈকি! হকার বাসায় ইত্তেফাক দিয়ে যাবার পরে, চুপিচুপি আসরের পাতাটিকে নিয়ে এসে নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে পড়তে বসেন তিনি। পড়তে বসলে সকালের নাস্তা করার কথাটাও ভুলে যান তিনি। পুরোটা পড়া শেষ না হওয়া অবধি ওঠেন না তিনি।
বারান্দার চেয়ারে বসে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ভুগছেন তিনি। ২রা এপ্রিল। তার স্পষ্ট মনে আছে, ১৯৫৫ সালের এই দিনটিতেই সর্বপ্রথম তার সাথে পরিচয় হয় আতহারউদ্দীনের। সেই তখন থেকেই তাকে নিজের অনুজতুল্য ভাবতেন তিনি। ছোট ভাইটির মতোই একান্ত আদর ও স্নেহে যতন করে রাখতেন তিনি। তার সাথে এখন পর্যন্ত সেই আগের সম্পর্কটাই রয়ে গেছে তার। বয়স বাড়লেও ছোট ভাইটির প্রতি সামান্যতম ভালোবাসা কমেনি তার। তবে একটা ব্যাপারই আশ্চর্যের। আজ তার বয়স বাড়লে তার ছোট ভাইটি যেন সেই আগের বয়সেই দাঁড়িয়ে আছে। সেই কিশোরসুলভ চপলতা তার মাঝে এখনো বর্তমান। এখনো সে শিশু-সাহিত্যকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। আতাহারউদ্দিন মনে মনে আরেকবার হেসে উঠলেন। যে অনুজটি একসময় তার লেখা পরম যত্নে ছাপতো সে-ই এখন তার নাতনির লেখা ছাপছে। দাদুকে চুপিচুপি আসর পড়তে দেখে আতাহারউদ্দিনের নাতনি রিয়াও এখন আসরের একনিষ্ঠ ভক্ত, পাঠিকা। চলতি সংখ্যায় তার সেই ছোট্ট নাতনিটার একটা লেখাও ছিল। ভাবতেই পুলকিত হয়ে ওঠেন তিনি। এমন নিঃস্বার্থবান অনুজ কে পেয়েছেন কবে? মনের গভীর থেকেই কচি-কাঁচার আসরের চিরজীবী হবার প্রার্থনাবাক্য বের হয়ে আসে তার...।
