রেফারীর শেষ বাঁশী বাজার সাথে সাথে ব্রাদার্স ইউনিয়নের ফুটবলাররা কেউ কেউ হতাশায় মাঠেই বসে পড়লেন। আর ডাগ আউটে থাকা ফেনীর সকার ক্লাবের খেলোয়াড় কোচ কর্মকর্তারা মাঠে ঢুকে জড়িয়ে ধরলেন খেলোয়াড়দের, আনন্দ করলেন। এ যেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাস। এমন উল্লাস ওদেরই মানায়।
কারণ মফস্বলের একটি দল দেশের বড় মঞ্চের টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠেছে। এটাই অনেক কিছু। বড় দলগুলোকে ছাপিয়ে অন্য কোনো দলকে সেরা লড়াইয়ের আসরে প্রত্যাশা করে কেউ। তার উপর সেটা যদি হয় জেলার ফুটবল দল। প্রতিপক্ষ ব্রাদার্স এমন একটি দল যার গায়ে ঐতিহ্যের রংটা এখনো জ্বলজ্বল করছে। যারা বড় দলকে কামড়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা রাখে। সেই ব্রাদার্সকে উল্টো কামড়ে দিয়েছে ফেনীর সকার ক্লাব। অবশেষে ফুটবলে সকার ক্লাবের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে একথা বলতেই হবে। কারণ তাদের মতো একটি দল ফাইনালে উঠা সেটা অনেক বড় ব্যাপারই বলতে হয়। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাথিউ ম্যান্ডি ও আব্দুল্লাহ আল মামুনের গোলে সকার ক্লাব ২-০ ব্যবধানে ব্রাদার্সকে হারিয়ে মধুমতি ব্যাংক স্বাধীনতা কাপ ফুটবলের ফাইনালে উঠেছে। একথা অনেকের কাছে বিশ্বাস্য মনে হতে চাইবে না। হওয়ার কথাও না। যারা এই টুর্নামেন্টের খেলাগুলো নিয়মিত দেখেছেন তারা আগেই ভবিষ্যত্ বাণী করেছিলেন ব্রাদার্সের উপর কোপ বসাবে ফেনীর দলটি। তাদের কথাই মিলেছে। দলের গাম্বিয়ান কোচ ওমর সিসে কৌশল করে তার ছেলেদের দিয়ে পুরো ম্যাচটা সামাল দেন। ব্রাদার্সকে আটকে রাখেন। ম্যাচের শেষ ভাগে গিয়ে ব্রাদার্সের উপর শক্ত আঘাত বসায় সকার ক্লাব। ৮১ ও ৮৫ মিনিটে দুই গোল করে ব্রাদার্সের ভারতীয় অভিজ্ঞ কোচ সৈয়দ নইম উদ্দিনের চোখের সামনে দিয়ে ছোঁ মেরে ফাইনালে উঠার টিকিটটা নিয়ে গেলেন গাম্বিয়ান তরুণ কোচ ওমর সিসে।
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত সকার ক্লাব ফেনীর প্রথম বিভাগ ফুটবলে ১১ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দুই বার খেলেছে এক সময়ের নিটল টাটা জাতীয় ফুটবলে। দেশের ব্যবসায়ী নেতা ক্লাবের পৃষ্ঠাপোষক আব্দুল আওয়াল মিন্টু নিজ জেলা ফেনীর দলটিকে বাংলাদেশের ফুটবলের বড় আসরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন ২০০৯ সালে। সকার ক্লাব ২০০৯ সালে বাংলাদেশের পেশাদার লিগের তৃতীয় আসরে খেলতে শুরু করে। ঢাকার বাইরের অনেক দল যখন যাওয়া আসার মধ্যেই ছিল, সেসময় একমাত্র সকার ক্লাবই টিকে রয়েছে। জায়ান্ট কিলার হিসাবে এই দলটির নাম আছে। টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন শেখ রাসেলকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় করে দিয়েছে সকার ক্লাব। সেমিফাইনালে ব্রাদার্সকে একইভাবে হটিয়ে দিল। সামনের খেলাগুলোতেও সকার ক্লাব যে কোনো দলের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। গাম্বিয়ান তিন ফরোয়ার্ড ল্যান্ডিং, কাব্বা জোবে এবং ম্যাথিউ মেন্ডি সকার ক্লাবকে টেনে নিয়ে গেছেন এতো দূর। যে কারণে দলের অধিনায়াক আকবর হোসেন রিদন বলেছেন, ‘ফুটবলটা কতো সহজ সেটা ওদের সাথে খেলে বুঝতে পারছি। বিশেষ করে ল্যান্ডিংয়ের খেলা বলতেই হয়।’
ব্রাদার্স কাল ম্যাচ হারলেও শুরুতে তারাই গোলের সবচেয়ে সহজতম সুযোগ হারিয়েছে। ১০ মিনিটের মধ্যে ব্রাদার্স তিনবার সুয়োগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি। প্রথমার্ধের শেষ ভাগে ব্রাদার্সের গোলের বল সকার ক্লাব লাইন থেকে ফিরিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় সকার ক্লাবের খেলা। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটেই সকার ক্লাব ২ গোল করেছে। যেটা ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটেই করতে পারতে ব্রাদার্স।
৮১ মিনিটে গাম্বিয়ান ফুটবলার ম্যাথিউ ম্যান্ডি হেডে গোল করেন ১-০। ব্রাদার্সকে ঘুরে দাঁড়ানোর বিন্দু মাত্র সুযোগ না দিয়ে ৪ মিনিট ব্যবধানে, ৮৫ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করেন সকার ক্লাবের বদলী ফুটবলার আব্দুল্লাহ আল মামুন ২-০। এই গোলই ব্রাদার্সের কফিনে পেরেক ঠুকে যায়।
ম্যাচ শেষে সকার ক্লাবের গাম্বিয়ান কোচ ওমর সিসে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। কঠিন ম্যাচ খেললাম। ব্রাদার্স শক্তিশালী দলগুলোর একটি। আমার লোকাল খেলোয়াড়রা ভালো খেলার জন্য মুখিয়ে ছিল। প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়ে বলছি আমার লোকাল ও ফরেন প্লেয়াররা ভালো খেলেছে বলেই ম্যাচ জিতেছি।’ হতাশ ব্রাদার্সের কোচ নইম উদ্দিন দুষলেন তার ফরেন ফুটবলারদের। ফেনীর বিদেশি তিন খেলোয়াড়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেছেন, ‘ফেনীর ফরেন ফুটবলাররাই ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।’
