বাংলার সব ফুল বসন্ত থেকে গ্রীষ্মে ফুটে আকুল হয়ে যায়। আদিতে বসন্ত ও গ্রীষ্মে মিলে চার মাসে একটি ঋতু ছিল। তারপর চার মাস বর্ষা এরপর চার মাস শীত ঋতু। সে আড়াই হাজার বছর আগের কথা। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বসন্ত ও গ্রীষ্মে গাছপালা নবপত্র-পল্লবে ব্যাকুল হয়ে ফুল ফুটানোর কাজ শুরু করে। সেইসঙ্গে মানুষ ও প্রাণীকূলের চিত্তচাঞ্চল্য শুরু হয়।
এককালের অপরূপ সৌন্দর্য আর পরিষ্কার পানি এবং উত্তাল স্রোতের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ মরে খালে পরিণত হয়েছে। যৌবনহারা সেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গফরগাঁও উপজেলায় শত শত বছরের প্রাচীন গ্রাম্য গাভীশিমুল বাজারের দেড়শত বছর বয়সী মহুয়া গাছে ফুল ফুটে চারিদিকে সৌরভ ছড়াচ্ছে। রাতের রাণী মহুয়া ফুল সন্ধ্যায় ফোটে আর ভোররাতে গাভীশিমুল বাজারে বিছিয়ে থাকে। মহুয়া ফুলের তীব্র সুগন্ধে দূর থেকে উড়ে আসে বাদুর, মৌমাছি, প্রজাপতিসহ নানা পাখি। উতলা হয়ে সারারাত কিচির মিচির করে গাছের শাখায় বসে। ভোরের আগে ঘুম চোখে মৌতাত নিয়ে ওদের আস্তানায় ফিরে যায়।
মহুয়া ফুলকে নিয়ে আছে নানা উপ্যাখান, কত কবিতা, কত গান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রয়েছে বহু গান। পাহাড়িরা এর ফুল দিয়ে নেশাদ্রব্য তৈরি করে। ভালুক নাকি রাতের বেলা এর ফুল খেয়ে মাতাল হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ নাথ তার মহুয়া কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘‘মহুয়া বসন্তের অনুচরণ, আর তার রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা”। তিনি মহুয়া ফুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন-রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার,/উচ্চ শিরে তবু রাজকুলবনিতার/গৌরব রাখিস উর্ধ্বে ধরে/ আমি তো দেখেছি তোরে/ বনস্পতি গোষ্ঠী-মাঝে অরণ্য সভায়/ অকুণ্ঠিত মর্যাদায়/ আছিস দাঁড়ায়ে/ শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে। প্রস্ফূটিত মহুয়া ফুলের মধুগন্ধী উদ্দমতা তুলনাহীন। এই গন্ধ দূরবাহী, তীব্র ও উন্মাদনাময়। আদিবাসী ও অরণ্যের পশুপাখির কাছে মহুয়া প্রিয় তরু। এই ফুলের নির্যাস উত্তেজক এবং আদীবাসীদের প্রিয় পানীয়।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ মইন উদ্দিন জানান, মধ্য ভারতের শুষ্ক অঞ্চলের বাসিন্দা এই গাছের পক্ষে বাংলাদেশের আর্দ্রতায় বিস্তার লাভ কিছুটা কঠিন বৈকি। তবুও মহুয়া এ দেশে অপ্রাপ্য নয় এবং ঢাকার রমনা পার্কের বিরাট মহুয়া গাছটিকে দেখলে বাংলাদেশকে মহুয়ার পক্ষে খুব একটা প্রতিকূল বলে মনে হয় না। মূলত ট্রপিক্যাল এরিয়া অর্থাত্ যে অঞ্চলে উষ্ণতা ও বৃষ্টি আছে সেখানেই বেড়ে ওঠে এই উঁচু গাছটি। ময়মনসিংহ অঞ্চলের গাছটি ছাড়া আর কোন শতবর্ষী মহুয়া গাছ আছে কিনা তার জানা নেই। বর্তমানে বনবিভাগ মহুয়ার ছোট জাতের চারা তৈরি করছে। এই চারা দিয়ে লম্বা মহুয়া গাছ হবে না। তবে যেখানে পুরনো মহুয়া গাছ আছে তা রক্ষা করার কর্মসূচি বন বিভাগের দায়িত্ব।
কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানের শিক্ষক কাওছার হোসেন ভূঁইয়া জানান, ফল পাওয়ার জন্য এই গাছ কেউ লাগায় না। মহুয়া ‘সেপোটিসিয়া’ পরিবারভুক্ত। বৈজ্ঞানিক নাম ‘মাধুকা ইন্ডিকা’। ইংরেজী নাম ‘বাটার ট্রি’। ৪০ থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এই গাছ। শীতে পাতা ঝরে বসন্তের মাঝামাঝি সময় নতুন পাতা জন্মায়। এর পাতা বল্লম আকারের, ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। অগ্রভাগ সূচালো এবং শিরা স্পষ্ট। মহুয়া ফুলের প্রান্তিক মঞ্জরি বহু পৌস্পিক, গুচ্ছবদ্ধ, নতমুখী। ফুলের পাপড়ির ভিতর থেকে উদগত লম্বা ধারালো গর্ভদণ্ডটি এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। পাঁপড়ি স্থূল রসালো এবং সাদা। এর বাকল লেসপ্রি রোগে এবং ক্ষত সারাতে ব্যবহূত হয়। ফুল কাশি নিরাময়ে ও হূদরোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। এই ফুল অনেকদিন শুকিয়ে রাখা যায়। শুধু সুরা তৈরিই নয়, মিষ্টান্ন, পুডিং এবং অন্যান্য খাদ্যেও এই ফুল ব্যবহার্য্য। মহুয়া ফুল বছরে একবারই বসন্তকালে ফুটে থাকে।
উপজেলার গাভীশিমুল গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি করিম মিয়া (৭৩) জানান, প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে পশ্চিম ভারতের হিন্দু সমপ্রদায়ের একদল লোক এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করার সময় তাদেরই একজন ভেলারাম রবিদাস মহুয়া গাছের চারাটি এখানে নিয়ে আসেন এবং লাগান। ব্রহ্মপুত্রের যখন যৌবন ছিল মাঝি-মাল্লারা মহুয়া ফুলের সুবাস নিতে তীর ঘেঁষে নৌকা বাইতেন। গাভীশিমুল বাজারের দেবেন্দ রবিদাস (৬০) জানান, তাদের সমপ্রদায়ের লোক এ ফুল দিয়ে পূজা-অর্চনার প্রসাদ তৈরি করে এবং মদও তৈরি করে। তারা এ ফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে ৫০/৬০ টাকা ছটাক দরে বিক্রিও করে থাকেন।
