শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলেও অনেক কোম্পানি ‘লোকসানে’

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪২
পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পর অনেক কোম্পানির আয় বাড়ার পরিবর্তে ‘কমে’ যায়। কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে মূলত বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে। যুক্তি দেখানো হয়, মূলধন বাড়লে কোম্পানির আয় বাড়বে, বাড়বে মুনাফা। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক কোম্পানির মূলধন ঠিকই বাড়ে, কিন্তু মুনাফা বাড়ে না। উপরন্তু লোকসান হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্র জানায়, কিছু কোম্পানি উচ্চ প্রিমিয়াম ও শেয়ারের চাহিদা সৃষ্টি করার জন্য মূলধন সংগ্রহের আগে ভালো মুনাফার ধারাবাহিকতা দেখায়। কিন্তু টাকা সংগ্রহের পরই দেখা যায় কোম্পানির আয় কমতে থাকে। ধীরে ধীরে লোকসানের দিকে চলে যায়। আর কিছু কোম্পানি মূলধন বাড়ানোর পরও মুনাফা থাকে আগের মতোই। ডিএসই’র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় ২০১১ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশবন্ধু পলিমারের মুনাফা ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকে মুনাফা ছিল ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর পরের প্রান্তিকগুলোতে মুনাফা হলেও ২০১৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফের ক্ষতি হয় ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এরপর মুনাফা হলেও তা তালিকাভুক্তির আগের তুলনায় কম। বেঙ্গল উইন্ডশোর তালিকাভুক্তির আগে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্তির প্রান্তিকে মুনাফা হয় ১৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে মুনাফার পরিমাণ। পরের প্রান্তিকে মুনাফা হয় ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপরের প্রান্তিকে মুনাফা আরও কমে দাঁড়ায় ৯১ লাখ টাকায়। ২০১০ সালে তালিকাভুক্তির আগে মালেক স্পিনিং ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে আসছিল। তালিকাভুক্তির দুই প্রান্তিক পরই ২২ কোটি ১৯ লাখ টাকা লস করে। এরপর আরও দুই প্রান্তিক যথাক্রমে ১৮ কোটি ৮৪ লাখ ও ৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা লস করে। তারপর মুনাফা হলেও ২০১২ সালের শেষ প্রান্তিকে ফের লস করে ১৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস তালিকাভুক্তির আগে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে আসছিল। তালিকাভুক্তির পরও প্রায় দুই বছর ভালো মুনাফা হয়। এরপর ২০১২ সালের শেষ প্রান্তিকে ৩০ লাখ ৭০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। এরপর মুনাফা হলেও তা কম। এ ব্যাপারে একাধিক কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দুয়েকটি প্রান্তিকে লস হতে পারে। ব্যবসায়িক কারণেই তা হতে পারে। তবে তালিকাভুক্তির পর ধারাবাহিকভাবে মুনাফা কমে যাওয়া ইতিবাচক নয়। কারণ শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করায় বড় অঙ্কের সুদের বোঝা কমে যায়। ফলে মুনাফা বাড়া উচিত। এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশের অনেক কোম্পানিতেই সুশাসনের অভাব রয়েছে। কোম্পানির হিসাবায়ন নিয়েও নানা প্রশ্ন থাকে। কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্সে সঠিক হিসাবের বহিঃপ্রকাশ হয় না। ফলে মুনাফারও হেরফের হয়। তিনি আরও বলেন, অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্তির আগে কর ফাঁকির জন্য কম মুনাফা দেখায় ফলে তালিকাভুক্তির আগ মুহূর্তে সঠিক হিসাবায়নের ফলে মুনাফা হঠাত্ বড় হয়ে যায়। এটাও দেখানো হয় তাদেরই স্বার্থে। ভালো প্রিমিয়াম পেতে। মনিরুজ্জামান আরও বলেন, কোম্পানি কোনো কারণে দুয়েকটি প্রান্তিকে লস করতে পারে। তবে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা কমে যাচ্ছে কিনা তা দেখা প্রয়োজন। তথ্যে দেখা গেছে, সালভো কেমিক্যাল তালিকাভুক্তির আগের প্রান্তিকে মুনাফা করে ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর আগেও ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছিল কোম্পানিটি। আর তালিকাভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই ওই প্রান্তিকে লস হয় ৪৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এরপরের প্রান্তিকে মুনাফা হলেও তারপরের প্রান্তিকে ফের লস হয় ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এরপর মুনাফা হলেও তুলনামূলক কম। তালিকাভুক্তির পর থেকেই এপোলো ইস্পাতের মুনাফা কমতে শুরু করেছে। গেল অর্ধ বার্ষিকে (জুলাই ’১৩-ডিসেম্বর ’১৩) এ কোম্পানির মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭ কোটি ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাত্ তালিকাভুক্তির পর ছয় মাসে এ কোম্পানির আয় কমেছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফারইস্ট ফাইনান্সের তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানিটি অব্যাহতভাবে মুনাফা করে আসছিল। তালিকাভুক্তির পরপরই শুরু হলো লস। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির লস হয়েছে ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর মুনাফা কমে যাওয়ার প্রবণতায় ডিএসই কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন। ডিএসই’র একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর লস করায় শেয়ারের দাম অনেক কমে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তালিকাভুক্তির আগে মুনাফা থাকায় অনুমোদন দেয়া হয়, কিন্তু এরপরই কোম্পানির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসে। তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলোর অনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণেই এমনটি হতে পারে। তালিকাভুক্তির আগে প্রিমিয়াম পেতে কিংবা শেয়ারের চাহিদা বাড়াতে কোম্পানিগুলো মুনাফা বাড়িয়ে দেখাতে পারে। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর প্রকৃত খরচ দেখিয়ে মুনাফার পূর্বতন ধারায় ফিরে আসতে পারে। তাছাড়া ছোট ছোট কোম্পানিতে মালিকের নানা খরচও কোম্পানির খরচ হিসাবে দেখানোর অভিযোগও আসে। কারণ তালিকাভুক্তির পর এ খরচের ভার শেয়ারহোল্ডারদের উপরও বর্তে যায়। তবে সব কোম্পানি এক রকম নয়। কিছু কোম্পানি বাস্তব কারণেই লস করে। পরে মুনাফার ধারায় ফিরে আসে।