দেশের সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম পথিকৃত এবিএম মূসা আর নেই। গতকাল বুধবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। তার মৃত্যুতে নিভে গেল সত্ ও আপোষহীন সাংবাদিকতার আরেকটি উজ্জ্বল দীপশিখা। তিনি নেই কিন্তু তার কর্মময় জীবন, তার সাহসী উচ্চারণ দীর্ঘদিন আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রায় পথ দেখিয়ে যাবে। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
সাংবাদিকের অবস্থান থেকে সবসময় সত্য উচ্চারণ করেছেন এবিএম মূসা। সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক ভুল অবস্থানের সমালোচনা করেছেন নিঃশঙ্কচিত্তে। জাতির বিবেকের মতই ছিল তার উচ্চারণ। ফলে সাংবাদিকতা জীবনে অনেকবার সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু এ নিয়ে কখনোই বিচলিত হননি। নির্ভীক সাংবাদিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তার লেখায়, সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন টেলিভিশনে গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনা করে গেছেন এবিএম মূসা।
প্রবীণ এ সাংবাদিকের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, ৩ কন্যা, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ল্যাব এইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এবিএম মূসাকে গত ২৯ মার্চ ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার রক্তের কণিকা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। গত ৭ এপ্রিল তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়।
এবিএম মূসার শেষ ইচ্ছানুযায়ী ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে শায়িত করা হবে। লাইফ সাপোর্টে থাকা সাংবাদিক এবিএম মূসাকে গতকাল দুপুরে চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করার পরই মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে তার বাসভবনে নিয়ে আসা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় ইকবাল রোডে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় এবিএম মূসার মরদেহ নেয়া হবে জাতীয় প্রেসক্লাবে। সেখানে বাদ জোহর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে ফেনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে সাংবাদিক এবিএম মূসার মরদেহবাহী গাড়ি। এরপর ফেনীর মিজান ময়দানে ফেনী প্রেস ক্লাবের আয়োজনে তৃতীয় এবং তার নিজ গ্রামে চতুর্থ ও শেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
এ বি এম মূসা দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। ১৯৫০ সালে দৈনিক ইনসাফ থেকে তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু। ওই বছর তিনি ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তত্কালীন পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান অবজারভার বন্ধ করে দিলে তিনি দৈনিক সংবাদে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে প্রকাশনা শুরু হলে তিনি অবজারভারে ফিরে যান। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান অবজারভারে রিপোর্টার, স্পোর্টস রিপোর্টার, বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি, সানডে টাইমস প্রভৃতি পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে তিনি রণাঙ্গন থেকে সংবাদ পাঠাতেন। স্বাধীনতার পর তিনি বিটিভির মহাব্যবস্থাপক, মর্নিং নিউজের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে এবিএম মূসা ব্যাংককে অবস্থিত জাতিসংঘের পরিবেশ কার্যক্রমের (এসকাপ) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে যোগ দেন। দেশে ফিরে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তিনি নিউ নেশনের উপদেষ্টা সম্পাদক ও নিউজ ডে পত্রিকার সম্পাদক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি কিছু দিন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রিয় কলাম লেখক এবিএম মূসা একজন দর্শকপ্রিয় আলোচক এবং সংবাদ বিশ্লেষক হিসেবে বিভিন্ন চ্যানেলের টক শোতে অংশ নিয়েছেন। বক্তা হিসাবেও তিনি ছিলেন নির্ভীক।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিভিন্ন মহলের শোক
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এবিএম মূসার অমূল্য অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যু দেশের সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যমের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে এবিএম মূসা বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ বলেন, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তার অবদানের মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে যে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকালে তাঁর মতো একজন সত্, নিষ্ঠাবান, নিরপেক্ষ, নির্লোভ ও নির্ভীক সাংবাদিকের খুবই প্রয়োজন ছিল। এ অভাব পূরণ হওয়ার নয়। এবিএম মূসাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের বাসভবনে যান বেগম খালেদা জিয়া।
এছাড়া প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, জাতীয় পার্টি -জাপার চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচএম এরশাদ, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মরতুজা আহমদ প্রমুখ। এছাড়াও শোক জানিয়েছেন বাসসের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন-ডিকাব-এর সভাপতি মাঈনুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক আঙ্গুর নাহার মন্টি, ঢাকাস্থ গোপালগঞ্জ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি সেলিম ওমরাও খাঁন ও সাধারণ সম্পাদক গাজী জহিরুল ইসলাম। এছাড়াও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাকের পার্টি, জালালী পার্টি, রুর্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন, নতুনধারা বাংলাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার সমিতি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদ প্রভৃতি সংগঠন।
এবিএম মূসার মৃত্যুতে ড. ইউনূসের শোক বার্তা
এক শোক বার্তায় শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এবিএম মূসার মৃত্যুতে উপমহাদেশের সাংবাদিকতা জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। শুধু বাংলাদেশ নয়—এই উপমহাদেশের সকল মানুষ তাঁর অন্তর্ধানে ব্যথিত হবে। তাকে হারানোর মধ্যে দিয়ে জাতি আজ একজন অভিভাবক হারালো। তিনি ছিলেন জাতির কাছে প্রচণ্ড বিশ্বস্ততার প্রতীক। জাতি তাঁর কথায় ও কাজে নির্দ্বিধায় নির্ভর করতে পারতো। ড. ইউনূস তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
