আমাদের পরিবারের সপ্তাহের বাজার করতাম আমি। বাজারের খরচের টাকা থেকে টাকায় এক আনা সরিয়ে ফেলতাম। তখন তো এক আনায় অনেক কিছু পাওয়া যেত। সেই সূত্রে বলা চলে—ছেলেবেলায় ভালো চোর ছিলাম। চুরির টাকা দিয়ে প্রচুর বাংলা ছবি দেখতাম। হয়ে গেছি অল্প বয়সে ইঁচড়েপাকা। কিছুদিন পর নিজে নিজেই গ্লানি বোধ করলাম। তারপর মায়ের কাছ থেকে দুই টাকা আর আমার কাছে থাকা এক টাকা দিয়ে অন্নদা গোবিন্দ লাইব্রেরিতে ভর্তি হলাম। প্রকৃতপক্ষে বলা যায়, পাবনার ঐতিহ্যবাহী অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীতে আমার প্রথম পাঠ্য বইয়ের বাইরে বইপড়ার হাতেখড়ি।
পাবনার হায়দার পরিবারে জন্ম আমার। তবে পরিবারে যতটা বিত্ত ছিল ততটা বিদ্যা ছিল না। তবুও মায়ের অরজিন সকলকে (হায়দার পরিবারের) প্রভাবিত করেছে। আমার মা খুব বেশি পড়াশোনা করেননি। মাত্র ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ুয়া মা বানান করে করে অনেক দূর সাহিত্যে বিচরণ করেছেন। পড়ে ফেলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি, গোরা, কাজী নজরুল ইসলামের রচনাসহ আরো অনেক বিখ্যাতদের বই। যা আমাদের ভীষণভাবে অনুপ্রেরণা দিয়েছে ও সাহিত্যপ্রেমে আগ্রহী করে তুলেছে। আমার মা বলতেন, বাবা, লোকে কবে আমাকে বলবে, আপনি অমুকের মা? মায়ের এই জিজ্ঞাসা অনেকখানি আন্দোলিত করেছে সাহিত্য-সংসারে আসতে।
যে বয়সে নাটক, উপন্যাস পড়লে একজন ছাত্রের জীবন গোল্লায় যায় বলে ভাবা হয়, সে বয়সে ৭ম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার স্যার এবং সহকারী লাইব্রেরিয়ান বিমল কুমার ভৌমিক ‘পথের পাঁচালী’ পড়ার জন্য হাতে দেন। আমি একটানা পড়ে শেষ করি। পরিচিত হই নতুন এক পৃথিবীর সাথে। বুঝতে পারি, একেই বলে সাহিত্য। সাধারণের জীবন, জগত্ এসবসহ চেনাজানা ফুল, ফল, পাখি, বৃক্ষ, নদী, নারীকে আপন মনে হয়। নির্মাণ হয় আমার ভেতরের জগত্, নতুনভাবে। নিজেকে কখনো ভাবি, আমিই ‘অপু’। সেই ফুরফুরে ভাবনায় চলি। তারপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় পড়ে শেষ করি—রবীন্দ্র ও শরত্ রচনা, রামায়ণ, মহাভারতসহ শাহনামা, শেক্সপিয়রের নাটকসমূহ। পড়ি—ইলিয়ট, ওডেসি, টলস্টয়, গোর্কিসহ রাশিয়ান সাহিত্য।
এবারের ১৪ বইমেলায় অয়ন প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে আমার ‘কিশোর সমগ্র’। বেরিয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে আমার তত্ত্বাবধায়নে এই প্রথম কাজী নজরুলের জীবনী বাংলা-ইংরেজি একই সাথে। তারপর আনন্দিত হয়েছি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি একুশে পদক পেয়ে। তবে তার চেয়ে বড় পুরস্কার হলো—একুশে পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম ঘোষণা করা হলো, তার পরপরই সারাদেশ থেকে আমার অসংখ্য ভক্ত, পাঠকসহ পরিচিতজনরা আনন্দের সাথে জিজ্ঞাস করল—আপনি তো অনেক আগে পাওয়ার কথা, কেন এত দেরি? আমরা তো ভাবছি, পেয়ে গেছেন অনেক আগে’—এ সব। আমি শুধু একটাই কথা বলেছি যে, আমি এতো দিন পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্য হই নি, তাই পাইনি।
গত পাঁচ বছর উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করতে পারিনি। নজরুল ইনস্টিটিউটের অনেক চাপে ছিলাম। প্রচুর কাজ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলো পর্যন্ত। গত ৩ এপ্রিল ২০১৪ পূর্ণ অবসরে আসি। এখন থেকে সময় পাব। পরিকল্পনা করে নিজের মতো কিছু কাজ করব। অনেকদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ওপরে দুই বাংলার রচিত বই সংগ্রহ করছি। পড়ছি সেই বইগুলো। কাজ করব মুক্তিযুদ্ধের ওপরে। লিখব সিরিয়াস ধারার সাহিত্য। প্রিয় পাঠকদের কাছে দোয়া কামনা করছি—যেন আমার মাথা, চোখ, হাত সুস্থ থাকে। লিখতে পারি হূদয়কথা।
গ্রন্থনা : ইমরান মাহফুজ
