বাংলাদেশে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দশক ষাট। মাহবুব সাদিক ষাটের দ্বিতীয়ার্ধের কবি।
ষাটের কবিরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নিবিড় প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এঁদের অনেকেই এদেশের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। মাহবুব সাদিক এঁদেরই অন্যতম।
বীজ ছাড়া যেমন অঙ্কুর হয় না, তেমনি চিন্তা ও আবেগ নিরালম্বভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। যদিও অগ্নিপুরাণে বলা হয়েছে, ‘অপার কাব্যের সংসারে কবিই একমাত্র ব্রহ্মা।’ তবু কোনো কবিই বিষয়বিমুখ কিংবা জীবন বিযুক্ত নন। প্রতিবেশ, পরিবেশ কবির কবিতায় ছায়া ফেলে। জীবন-বাস্তবতাকে কবি অঙ্গীকৃত করেন তাঁর শিল্পসুলভ স্বভাবে।
তবে কবির সৃষ্টি তার স্ব-সময়ের ওপরই কেবল নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার সুমহান ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট মনে করতেন, একজন কবি নিজ মহাদেশের সমগ্র অতীত, সমগ্র সৃষ্টি ও সমগ্র ঐতিহ্যকে অঙ্গীকরণ করবেন। আর তা নিজ কর্মে প্রতিফলিত করেই সেই কবি মৌলিকত্বে উদ্ভাসিত হতে পারেন, অন্যথায় তিনি হবেন নিতান্তই গতানুগতিক।
এ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হতে পারে আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক, নান্দনিক কিংবা রক্তাপ্লুত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এক রক্তভেজা ইতিহাস, যা আমাদের অলঙ্ঘনীয় ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। সে উত্তরাধিকারের শৈল্পিক প্রতিনিধিত্বশীল স্মারক কবি মাহবুব সাদিকের ‘যুদ্ধভাসান’ কাব্যগ্রন্থ। এটির প্রকাশকাল ২০১২ সাল।
বইটির মূল বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। সাধারণত ভাবা হয়, যুদ্ধের মতো বস্তুগত বিষয় নিয়ে লেখা কবিতা হবে অনেকটা বিবৃতি কিংবা শ্লোগানধর্মী। ভাষা হবে উচ্চকিত। আবেগ হবে সর্বকূলপ্ল¬াবী। কিন্তু মাহবুব সাদিক এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাঁর যুদ্ধভাসান কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নামও ‘যুদ্ধভাসান’। এক, দুই, তিন করে এ নামে লেখা হয়েছে মোট ১২টি কবিতা। প্রথম কবিতাটি কবির সৃষ্টিশীলতার অনবদ্য স্বাক্ষর।
এতে অতল ঘন আবেগে যুদ্ধের স্মৃতিকাতরতায় তিনি সখীপুর নামক এক রূপকের মাধ্যমে পাঠকের সামনে হাজির করেন যুদ্ধরত এক ভূখণ্ডকে। যে ভূখণ্ডের শরীর তখন রক্তের গঙ্গা। ঘাতক হানাদারের ছোবলে ছিন্নভিন্ন। কবি আশ্চর্য নিপুণতায় চিত্রের পর চিত্র সাজিয়ে প্রাণের সংবেদনা দিয়ে করুণ অথচ দৃঢ়, কোমল অথচ দীপ্তিময় ভাষায় পাঠকের কাছে যুদ্ধভূমি দৃশ্যমান করেন। দৃশ্যমানতার এ কাজে তিনি যে শব্দপুঞ্জ ব্যবহার করেন তা হূদয়তন্ত্রীতে টুং টাং বাজে। মোলায়েম ধ্বনিঝংকারে কানকে উদগ্রীব করে, মনকে করে মোহগ্রস্ত। স্নায়ুতন্ত্র এক অনিয়ন্ত্রিত আবেশে আচ্ছন্ন হয়। বোধের প্রান্তর থাকে উন্মুখ। কবিতাটি কেবল একবার নয়, বারবার পাঠেও অতৃপ্তি রয়ে যায়। অনেকটা ছোটগল্পের সংজ্ঞার মতো। শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
যে মৌল বৈশিষ্ট্য কবিতাকে গদ্য থেকে পৃথক করেছে তা হলো কাব্যের সংগীতধর্মিতা। মাহবুব সাদিকের কবিতাটি অনেকটাই সংগীতধর্মী, মৃন্ময় ও ঘোর জাগানিয়া। কবিতাটি এদেশের যুদ্ধভিত্তিক কবিতায় নবতর সংযোজন।
এছাড়া মাহবুব সাদিকের অন্যান্য কবিতা পাঠেও যে বিষয়টি ধরা পড়ে তা হলো তিনি হূদয়বৃত্তির (faculty of heart) প্রাবল্যের সঙ্গে মিশিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তির (faculty of intellect) প্রাবল্য। অর্থাত্ বুদ্ধি আর আবেগের নিপুণ সমন্বয় রয়েছে তাঁর কবিতায়। শেষ পর্যন্ত কবিতার উত্স কিন্তু মূলত আবেগ আর বুদ্ধি-ই। যুদ্ধভাসান কবিতায় কবি বলছেন,
‘যেখানেই যাই, সখীপুর সঙ্গে সঙ্গে থাকে/ স্বপ্নচৈতন্যের মাঝামাঝি সখীপুর/ মধ্যবর্তী দূরত্বকে স্থান করে নিয়েছিল কালো যুদ্ধরাত।’
মোটামুটি দীর্ঘ কবিতাটি পড়ার পর মনে হয়, যুদ্ধ কি আদতে কোনো শিল্প? অগ্নিময় অভিজ্ঞতার সঙ্গে কোমল ভালোবাসা আর দ্রোহ মিলেমিশে যে চিত্রল উপাখ্যান তৈরি হয়েছে তাতে এ প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। আইরিশ কবি Michael longley বলেছেন, ?`War is the opposite of the civilization’ কথাটির সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই। যুদ্ধভাসান কবিতাটি পড়ার পর মনে হয়, যুদ্ধ সভ্যতার বৈপরিত্যে অবস্থান করে সত্য, কিন্তু কখনো কখনো মুক্তির জন্যে সংগ্রাম ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই কবিকে এমন উপাদানে ঋদ্ধ করে, যাতে আমরা পাই যুদ্ধভাসানের মতো ‘টোটাল’ এক কবিতা।
‘স্বপ্নচৈতন্যের মাঝে সখীপুর’, ‘যেখানেই যাই সখীপুর সঙ্গে সঙ্গে থাকে’—ইত্যাদি পঙিক্তর মাধ্যমে কবি মেটাফিজিক্যাল টার্মে মনোজগত্ ও বস্তুজগেক সমন্বয় করেছেন। একধরনের দ্বান্দ্বিক বোধ জাগিয়েছেন পাঠকের মনে। সখীপুর কোথায় থাকে? কোথায় তার অবস্থান? সে কি বাস্তবে নাকি কবির হূদয়পুরে? স্থান নামকে কেন্দ্র করে লতিয়ে ওঠা কবিতাটিতে আমরা পেয়ে যাই রক্তভেজা এক ক্যানভাস। যেখানে কবি দক্ষ কুশলীর মতো একের পর এক চিত্র আঁকেন। সে চিত্রে ভেসে ওঠে যে ভৌগোলিক বাস্তবতা, তার নাম সখীপুর। তারপরও প্রশ্ন, সখীপুর আসলে কোথায়?
সখীপুর আসলে এক টুকরো সবুজ বাংলাদেশ। রক্তে ভাসা প্রাণের স্বদেশ।
কবিতাটিতে কবি আরো বলছেন, ‘মাথায় ব্যান্ডেজ পরে কিশোর কুদ্দুস যখন সটান দাঁড়াল/ তার উঁচু মাথা বেজন্মা পাঞ্জাবিদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলো/ তার সুদূর চোখে জ্বলছিলো বাংলাদেশ,/ কী করে ভুলবো তাকে?/ যেখানেই যাই সখীপুর সঙ্গে সঙ্গে থাকে।’
এর মানে কবি সখীপুরকে বিযুক্ত করতে পারেন না। কবি মূলত পারেন না তাঁর স্বদেশ- স্বভূমিকে উপেক্ষা করতে। পারেন না মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে যেতে। কারণ, এ মুক্তিযুদ্ধ তাঁর অহংকার, তাঁর অনতিক্রম্য উত্তরাধিকার।
২.
কবি মুিক্তযুদ্ধকে ভুলে যেতে পারছেন না সত্য, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্যে কবির মতন অগণন যোদ্ধা সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিল, তারা যুদ্ধ শেষে কী পেল? স্বাধীনতা! সে স্বাধীনতার স্বাদ-ই বা কেমন হলো? এ স্বাধীনতা কি সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, যার জন্য রক্ত দিল তিরিশ লাখ লোক। কবির ভাষায়, ‘কে না জানি ঐ মহার্ঘ স্বপ্নের জন্যে/ এদেশের জনগণ খুচরো পয়সার মতো/ বিলিয়েছে তরতাজা প্রাণ—/ মানবরক্তে সিক্ত এরকম রাঙামাটি/ পৃথিবীর অন্য কোথাও কখনো দেখেনি কেউ;’
কিন্তু তারপর? তারপর কী হলো? অনেক ত্যাগ আর রক্ত ঝরানোর মধ্যদিয়ে স্বপ্নের রূপায়ণ হলো, এল স্বাধীনতা। কিন্তু অচিরেই সে স্বপ্ন ধূলিস্যাত্ হলো। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে একের পর এক ঘটতে লাগল পরিহাসময় রাজনৈতিক ঘটনা। হত্যা, ক্যু রাজনীতিকে করল বিষাক্ত। সে-সঙ্গে ধ্বংস হলো জনমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সামরিকতন্ত্রের আড়ালে হারালো গণতন্ত্রের মানবিক চেতনা।
লোপাট হলো নৈতিকতাবোধ, সামগ্রিকতার সূত্র ভেঙে খান খান হলো। বিচ্ছিন্নতায় শক্তিহীন হলো ভবিষ্যত্ অগ্রযাত্রা। ফলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হলো জাতির হূদয়। ক্রান্তিকালীন এ সময়ে কবি-সাহিত্যিক, শিল্পীকুলও এ বেদনার কথা, এ আশাহতের কথাকে ভাষা দিতে এগিয়ে এলেন—কেউ কবিতায়, কেউ গানে, কেউবা চিত্রপটে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ-পরর্বতী শিল্প-সাহিত্যে এল এক নতুন বাঁক। কারণ, সময়ের নিজস্ব একটা ভাষা থাকে। সময়ে সে ভাষাও বদলে যায়। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী কবিতায় যে আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, ভালোবাসা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, ক্লান্তি আর দ্রোহের কথা বলা হয়েছে, পরবর্তীকালে তা-ই রূপ নিয়েছে অভিমান মিশ্রিত বেদনায়, স্বপ্নভঙ্গজনিত ক্ষোভে।
তবে এ পরিস্থিতি জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখারও নতুন তাড়না তৈরি করেছে। সংকট যে সবসময় মানুষকে নেতির দিকে ঠেলে দেবে, তা কিন্তু নয়। সংগ্রামী মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও শেষ পর্যন্ত নিরাশ হন না, আশা হারান না। মাহবুব সাদিকের কবিমানস পর্যালোচনায় এবং যুদ্ধভাসানের নিবিড় পাঠে নেতির চেয়ে ইতির আভাই ফুটে উঠেছে বেশি। হতাশা তিনি ব্যক্ত করছেন সত্য, বেদনার সংক্ষোভেও তাড়িত হয়েছেন, কিন্তু আশা জিইয়ে রেখেছেন। তবে তা একেবারে সংশয়হীন নয়।
কবি সম্ভবত রাজনীতির কোনো ধারাতেই আস্থা রাখতে পারেননি। যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতিতে আস্থা রাখার কোনো কারণও ঘটেনি। ভৌগোলিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান যত ক্ষুদ্রই হোক, বিশ্বরাজনীতির আবহ থেকে সে মুক্ত নয়। শ্রেণিসচেতন কবি উপলদ্ধি করেছেন পুরো বিশ্বই পুঁঁজির দৌরাত্মে ধুকপুক করছে। সে ধুকপুকানি থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশও। এখানেও কিছু লোক পুঁজির পাহাড় জমিয়ে আকাশপাড়ে অবস্থান নিয়েছে। সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষ পড়ে আছে আকাশতলে। এজন্যে সমাজতন্ত্রবাদীদের তিনি একহাত নিতেও ভুললেন না। একইসঙ্গে পুঁজির ধ্বজাধারীদের সমালোচনা করতেও পিছপা হলেন না। আসলে রাজনীতির কোনো তত্ত্বই বড়ো কথা নয়, বড়ো বিষয় দেশপ্রেম। দেশের প্রতি মমত্ব। অথচ এটারই বড়ো অভাব। আর এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশ অনায়াসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধূর্ত শিকারে পরিণত হয়েছে। তারই আভাস ‘কেন ডাক দিলি’ কবিতায়—‘কর্পোরেট পুঁজির তলায় ধুঁকছে এখানে ইতিহাস মানবতা।/ মুক্তিযোদ্ধা কাশেম-কলিরা এ শহরে ঘুমায় পথপাশে আকাশতলায়-/ তাদের দেখছে সবাই, তবু কেউ কি চেতনার তলে টের পায় কিছু’
যুদ্ধভাসান বইটির কিছু কবিতায় মাহবুব সাদিক ছবির পর ছবি সাজিয়ে যুদ্ধ-চিত্র যেমন এঁকেছেন তেমনি কিছু কবিতায় রয়েছে যুদ্ধপরর্বতী পরিস্থিতির কথা, স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যূব্জ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা। এসেছে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ, ধর্মের মুখোশধারীরা রাজনীতিকে ব্যবহার করে কিভাবে সমাজকে কলুষিত করে, সে প্রসঙ্গ।
সর্বোপরি বইটিতে সত্ ও মানবিক চেতনায় ঋদ্ধ কবি সংযমী ভাষায় আপন সামাজিক বাস্তবতা ও সুষম সংবেদকে তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে নিসর্গ এসেছে অনায়াস বাস্তবতায়। বিশেষ করে কবিতাকে রূপকাশ্রয়ী করতে তিনি প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছেন অকৃপণভাবে। ফলে যুদ্ধভাসানে যুদ্ধের বিশাল প্রেক্ষাপট থাকলেও নিসর্গ, নগর, সমাজ ও রাজনীতি এবং অর্থনীতি হয়ে উঠেছে এক চলমান মুর্হূর্ত। যেখানে সময় সজাগ এক যোদ্ধা দায়বদ্ধ চেতনা নিয়ে কবিতাকে স্বতন্ত্র করেন, শিল্পচৈতন্য দ্বারা মুহূর্তকে করেন বিস্তারিত। কালচেতনার মধ্যদিয়ে ব্যক্তি ভাবনাকে করেন সামষ্টিক। তাই যুদ্ধভাসান এ দেশের কোটি জনতার ইতিহাস, ঐতিহ্য, আশা, স্বপ্ন, বেদনা ও দুঃখের এক প্রতিচিত্র হয়ে ওঠে।
