জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস ২০১৪

বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৬
‘...মানুষের ভাষার বিপুল বৈচিত্র্যের মাঝে একমুখী পুঁজিবাদ ও ছাপার প্রযুক্তি নতুন ধরনের কল্পিত সমপ্রদায় নির্মাণের সম্ভাবনা তৈয়ার করেছে, এই কল্পিত সম্প্রদায়ের মূল কাঠামোর ভেতরেই তৈরী হয় আধুনিক রাষ্ট্রের মঞ্চ।’—বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন১ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বাজার দখলের লড়াই ও মুনাফা অর্জন এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এই বৈশিষ্ট্য স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে চক্ষুগোচর হয়। তো এই দখলকর্মে ‘আমরা’ ও ‘অন্যরা’ তৈরি করা বিশেষ প্রয়োজন। নয় তো লাভের অঙ্ক ‘অন্যের’ ঘরে চলে যাবে আর পণ্য বিক্রিতেও বেকায়দা হবে। সে হোক শিল্পপণ্য বা সাংস্কৃতিক পণ্য। এখানে ‘আপন’ ও ‘অপর’ এই দুইয়ের মাঝে চলে আধিপত্য বিস্তারের খেলা, আন্তর্জাতিকভাবে আবার দেশের ভেতরেও। এই বিভেদের রেখা জাতীয়তাবাদী চেতনারও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইরিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেন, চরম মেসিয়ানিক২ জাতীয়তাবাদীও (messianic nationalist) স্বপ্ন দেখে না মানবজাতির সকল সদস্য কোনো এক কালপর্বে তার বা তাদের জাতিতে যোগ দেবে। বেনেডিক্ট উদাহরণ দিয়ে বলছেন, কোনো খ্রিস্টান যেমন স্বপ্ন দেখেন না পুরো খ্রিস্টান জাহানের।৩ এই জাতি বা রাষ্ট্র ধারণার মধ্যে একটা কল্পিত সার্বভৌমের কথা বলেন অ্যান্ডারসন। সকলেরই জানা এই সার্বভৌম বলতে বোঝায় ‘সমুদয় ভূমির অধীশ্বর বা সম্রাট’, এই ধারণা ব্যবহূত হয় রাষ্ট্র বা জাতিরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। যে মানচিত্র ছবিতে দেখা ছাড়া অনুভব করা অসম্ভব, সেই মানচিত্রকে কল্পনা করেই আমরা বা অন্যরা যার যার সার্বভৌমত্ব রচনা করি। এই মানচিত্রের ভেতর যাদের বসবাস তারা নিজেদের এক সমপ্রদায়ের বলে দাবি করেন, নির্দিষ্ট করে বললে কল্পনা করেন। অ্যান্ডারসন বলছেন, জাতি এক কল্পিত সমপ্রদায় এই কারণে যে এই কল্পনার দৌলতে মানুষে মানুষে অসাম্য ও শোষণকে গৌণ করে মুখ্য হয়ে ওঠে গভীর ও অভিন্ন কাতারের ভ্রাতৃত্ববোধ (comradeship)।৪ এই কল্পনার পালে যেমন হাওয়া দিয়েছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা তেমনি ছাপার প্রযুক্তি। বাল্টার বেনিয়ামিনের বিখ্যাত ‘যান্ত্রিক পুনঃউত্পাদনের কাল’ প্রবন্ধকে স্মরণ করে অ্যান্ডারসন তথ্য দেন, ১৫০০ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বিশ্বের বই ছাপা হয় কমপক্ষে ২০ কোটি।৫ এই ছাপার প্রতি অক্ষরে, প্রতি বাক্যে যে সাহিত্য রচনা হয়েছে তাতে জাতীয়তাবাদের পালে হাওয়া কম লাগেনি। বেশ জোরেসোরেই লেগেছে। আমি বলব চলচ্চিত্র আবিষ্কারের পর এই হাওয়া পালতোলা জাতীয়তাবাদের নৌকাকে যন্ত্রচালিত নৌযানে রূপান্তর করেছে। জাতি ও জাতীয়তাবাদী ধারণা সম্বলিত জাতীয় চলচ্চিত্র নিয়েই আমাদের আজকের নাতিদীর্ঘ আলোচনা। প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ। ২ কানাডার চলচ্চিত্র পণ্ডিত ইয়ান জার্ভি ‘ন্যাশনাল সিনেমা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ১৯১৫ সালের পর থেকেই জাতীয় চলচ্চিত্রের ধারণাটি দানা বাঁধতে থাকে।৬ ইউরোপে দানা বাঁধার আগে আমেরিকাতে এই ধারণা জোরালো হয়। আমেরিকা বা হলিউডের চলচ্চিত্রকে ‘অপর’ চিন্তা করেই অন্য জাতির জাতীয় চলচ্চিত্র গড়ে উঠতে থাকে। অবশ্য এই ‘অপর’ যে সবসময় হলিউড থেকেছে তা নয়। ‘জাতীয়’ বিষয়টার যদি দুটা দিক বিবেচনা করি—এক রাজনৈতিক আরেক সাংস্কৃতিক—তাহলে হলিউডি ‘অপর’ হলো ‘জাতীয়’ চেতনার সাংস্কৃতিক দিক আর কিউবার গেরিলা চলচ্চিত্রের ‘অপর’ যদি হয় বুর্জোয়া শ্রেণি, তাহলে এই ‘জাতীয়’ চেতনাকে বলা যায় রাজনৈতিক। আমার প্রস্তাবনায় এই দুই ধারাতেই বাংলাদেশে জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। রাজনৈতিক চেতনার জাতীয় চলচ্চিত্রের কথা বললে আমি প্রথমেই বলব, খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’র কথা (১৯৬৭)। কারণ সময় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন ততদিনে জোরালোভাবে দেখতে শুরু করেছে এই ভূখণ্ডের মানুষ। পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব থেকে—পাকিস্তানি শাসকদের ‘অপর’ কল্পনা করেই খান আতা নির্মাণ করেন এই চলচ্চিত্র। যেখানে ব্রিটিশদের সঙ্গে সহজেই তুলনা করা যায় পাকিস্তানি শাসকদের। আর যে স্বাধীনতা সিরাজদ্দৌলা হারিয়েছিলেন পলাশীর প্রান্তরে সেই স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার আকুলতা দেখা যায় খান আতার এই চলচ্চিত্রে। খান আতা কি সেই ’৬৭ সালেই পাকিস্তানি দোসর রাজাকারদের অস্তিত্ব কল্পনা করতে পেরেছিলেন ওইসব মীরজাফর গঙদের মাঝে? না পারলেও ক্ষতি নেই, কারণ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের সার্বভৌম ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে (‘অপর’ জাতি) চলে যাচ্ছে—এই বাস্তবতার যে চড়া ও করুণ সুর খান আতা রচনা করেছেন তা নিঃসন্দেহে ষাটের দশকের অন্য ‘অপর’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই। মনে রাখা জরুরি, ততদিনে এখানকার মানুষ ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, প্রাণও দিয়েছে। ভাষাই তো একটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান সাংস্কৃতিক অস্ত্র। যে অস্ত্র দিয়ে জাতির ভেতর যে ভেদাভেদ সেটা ভুলিয়ে রাখা যায়। সাধে সাধে তো অ্যান্ডারসন মুদ্রণশিল্পের কথা পাড়েননি! যাহোক, ভাষাকে কেন্দ্র করে ততদিনের বাংলা ভাষায় গান-কবিতা রচনা হয়ে গেছে প্রচুর, চলচ্চিত্র যেহেতু সরকারি নিয়ন্ত্রণের ভেতর তাই সরাসরি না বলে খান আতা আশ্রয় নিলেন নামান্তরে। পাকিস্তানের আসনে ব্রিটিশ শাসকদের বসালেন তিনি। আর তাতেই উদ্দেশ্য সাধন হয়েছিল। খান আতা আশ্রয় নিয়েছিলেন নামান্তরে আর জহির রায়হান আশ্রয় নিলেন রূপান্তরে। অর্থাত্ ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে সেই স্বাধিকারের কথাই জহির রায়হান বললেন একটি পরিবারের গল্প দিয়ে। গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিকেও আনলেন রাজনৈতিক চেতনার অংশ হিসেবে, কিন্তু শাসকদের কাঁচি এড়াতে পুরো ছবির গল্প ফাঁদলেন এক আপাত অবলা, নির্দোষ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে। সকলেই জানেন, বাড়ির জাঁদরেল বড় বোনটি আর কেউ নন, পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান আর সেই বড় বোনের বিরুদ্ধে লড়াইরত বাকিরা বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ জনতা। যেকোনো ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতর জাতীয়তাবাদ মুক্তিসংগ্রামের দিকে যেমন চালিত করতে পারে তেমনি পারে ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করিয়ে নিতে। এই ছবিটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছি ভিন্ন প্রবন্ধে। প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে এই দুটি ছবিকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, ছবি দুটির সময়কাল বিবেচনায়। কারণ, লক্ষ করলে দেখা যাবে, ভারতবর্ষ তিন ভাগের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সংসার যে সুখের হচ্ছিল না তা এখানকার মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল পূর্বপাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বছর কয়েক পর থেকেই। বিশেষ করে ’৫২ সাল থেকে। এরপর নানাভাবেই পাকিস্তান বিরোধিতা দানা বাঁধতে থাকলেও ষাটের দশকে এসে এই বিরোধিতা জাতীয় মুক্তির আন্দোলন হিসেবে মূর্ত হতে থাকে—রাজনীতিতে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সে হিসেবে ষাটের দশক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সর্বোচ্চ উত্থানের সময় এবং একাত্তর সালে বাংলাদেশের জন্মকে পরিণতি বললে ভুল হয় না। যুদ্ধ চলাকালে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’কে জাতীয় চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ধারায় ফেলা যায় সহজেই। এছাড়া স্বাধীনতার পর ‘ওরা এগার জন’ থেকে শুরু করে হালের ‘গেরিলা’ সবগুলো ছবিকেই একই জঁরার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ৩ দ্বিতীয় ধরনের জাতীয় চলচ্চিত্রের মধ্যে সাংস্কৃতিক উপাদানের হাজির থাকার কথা বলেছি। বিশেষ করে বললে লোককাহিনি। আর এক্ষেত্রেও ষাটের দশককেই বেছে নিতে চাই। কারণ ওই একই। আর ষাটের দশকে লোককাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু যে উর্দু ছবি থেকে বাঙালি দর্শক টানতে, তা আজকের দিনে সকলেই জানেন। উদ্দেশ্য রাজনৈতিক হলেও এসব ছবির মূল ভিত্তি ছিল লোককাহিনি। আর লোককাহিনি একেক জাতিগোষ্ঠীর একেক রকম হয়ে থাকে। সেটাই ওই জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির একটি সূচক, অনেকটা ভাষার মতো। আর লোককাহিনিকে ভাষা ছাড়া তো চিন্তাই করা যায় না। পাকিস্তানের লোককাহিনি আর বাংলাদেশের লোককাহিনি এক হবে না। এখানকার কাহিনিতে অবধারিতভাবেই নদী ঘুরেফিরে আসবে। পীর মুরশিদ আউলিয়া সম্পর্কিত কাহিনি মিলে মিশে যাবে। মৈমনসিংহ গীতিকার দিকে তাকালেও এই অঞ্চলের লোককাহিনির একটা ধারণা পাওয়া যায়। লক্ষ করলেই দেখা যাবে, এই মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে কাহিনি নিয়ে বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে এদেশে। আর বলা বাহুল্য হবে না যদি বেদের মেয়ের প্রেম নিয়ে নির্মিত তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ (১৯৮৯) চলচ্চিত্রের কথা বলি। ‘সাতভাই চম্পা’(১৯৭৬, দিলীপ সোম), ‘কাজলরেখা’ (১৯৭৬, সফদর আলী ভূঁইয়া), ‘গুনাইবিবি’ (১৯৮৫, হারুনুর রশীদ) থেকে শুরু করে এই জামানার ‘খায়রুন সুন্দরী’ পর্যন্ত বহু ছবির নাম আপনি করতে পারবেন যেগুলোতে লোকজ কাহিনি ও উপাদান রয়েছে। তো এসব ছবিকে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র বলা যায়। কিন্তু আমরা চোখ ফেরাব ষাটের দশকে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানপর্বে, যে সময়টায় সার্বভৌম দেশ গঠনে, জাতিরাষ্ট্র নির্মাণে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল এখানকার মানুষ। যেসময় উর্দুর (‘অপরের’ ভাষা) দাপটে বাংলা ভাষা (‘আমার’ ভাষা) অপমানের মুখে পড়েছিল। ঠিক সেই সময় বাঙালি দর্শকদের জন্য প্রথম লোককাহিনি-নির্ভর চলচ্চিত্র ‘রূপবান’ (১৯৬৫) নির্মাণ করেন সালাহ্উদ্দিন। ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে—পুঁজিবাদী সমাজে যা নিয়ম, যেখানে মুনাফা সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং ছোট পুঁজিকে হটিয়ে দাও, নিজে লাভ করো—পরের বছরই, ১৯৬৬ সালে মুক্তি দেয়া হয় ১০টি লোককাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্র। ওই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবির সংখ্যাই ছিল মাত্র ১৪টি। রূপবান গ্রামবাংলার এক জনপ্রিয় যাত্রাপালা, এই যাত্রাপালাকেই হাতিয়ার করেছিলেন সালাহ্উদ্দিন, তাঁর দেখাদেখি রূপবান নিয়ে পরের বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় আরো দুটি—‘রহিম বাদশা ও রূপবান’ (১৯৬৬) ও ‘আবার বনবাসে রূপবান’ (১৯৬৬)। একই বছর মুক্তি পায় জহির রায়হানের লোককাহিনি-নির্ভর ছবি ‘বেহুলা’ ও খান আতাউর রহমানের ‘রাজা সন্ন্যাসী’। মজার বিষয়, পঞ্চাশের দশকে একটিও লোকজকাহিনি-নির্ভর কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি। কিন্তু ষাটের দশকে ১৫৫টি সাধারণ ছবির মধ্যে লোককাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে ৩৮টি! এরপর আশির দশকে এসে আবারও লোককাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্রের আধিক্য চোখে পড়ে—৫৩০টির মধ্যে ৫৬টি।৭ আমরা এসব চলচ্চিত্রকে জাতীয় চলচ্চিত্রের কাতারভুক্ত করতে চাই। কারণ এই জনপদের নিজস্ব জীবন, ভাষা ও বয়ানরীতির মধ্য থেকে জন্মানো ও বেড়ে ওঠা লোককাহিনি এই জনপদ তথা এই জাতির পরিচয় ও জীবনচর্চাকে প্রতিফলিত করে। ফলে এই বস্তু যখন চলচ্চিত্রায়িত হয় তখন সেই চলচ্চিত্রকে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ বললে ভুল হয় না। ৪ এখন এই দুই ধারার জাতীয় চলচ্চিত্রের বাইরে একটি রূপকের কথা না বললেই নয়—সেটি হলো—মা ও সন্তানের সম্পর্ক। মানে দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে দেশের জনগণকে সন্তান বলার রেওয়াজ চলচ্চিত্রে প্রচলিত। কোন সন্তান অন্য কোন সন্তানের হক মেরে দিচ্ছে বা কোন সন্তান সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো মায়ের কাছে সব সন্তান অর্থাত্ দেশের কাছে সব নাগরিক সমান। এই রূপকল্পটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বেশ সাহায্য করে। কারা ঐক্যবদ্ধ করছে? অবশ্যই সমাজের আধিপত্য বিস্তারকারী গোষ্ঠী। যারা কালচারাল হেজিমনি তৈয়ার করতে পেরেছে। তো এই সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবধারার জাতীয় চলচ্চিত্র এবং একক জাতি কল্পনায় (কল্পনায় শুদ্ধ বাঙালি জাতি আছে, খাসিয়া, সাঁওতাল এরা উধাও!) ‘মাতৃরূপ’ ব্যবহার করা চলচ্চিত্রের বাইরেও বহু চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে এদেশে। সেসবকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র বলা চলে, বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র নয়। প্রত্যেক দেশেরই জাতীয় সংগীত থাকে, থাকে জাতীয় ফুল, জাতীয় পশু ইত্যাদি। সব ফুল পাখি ও গান যেমন জাতীয় নয় তেমনি সব চলচ্চিত্রই জাতীয় নয়। আমার প্রস্তাবে ‘জাতীয়’ হয়ে উঠতে হলে চলচ্চিত্রের থাকতে হবে কমপক্ষে একটি চেতনার প্রতিফলন—হয় রাজনৈতিক নয় সাংস্কৃতিক। বাঙালি জাতির বা বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত চেতনাকে আমরা ফেলতে পারি রাজনৈতিক ধারার জাতীয় চলচ্চিত্রে। আর বাঙালি বা অবাঙালি—চাকমা, মারমা, গারো ইতি আদি জাতিগোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থান করে—তাদের সকলের বা যেকোনো একজনের সংস্কৃতি বহন করে এমন চলচ্চিত্রকে বিবেচনা করা উচিত সাংস্কৃতিক ধারার জাতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে। আমার এই কথা প্রস্তাব মাত্র। ভিন্ন আওয়াজ পেলে সমৃদ্ধ হব। টীকা ও পাঠসূত্র :Benedict Anderson, Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Verso 2006, p-46 এই শব্দের উত্পত্তি হজরত মুসা (আ:) থেকে। তিনি যেমন উদ্ধার করেছিলেন ইহুদি জাতিকে তেমনি কোনো জাতি যদি নিজেদের উদ্ধারকর্তা ভাবে তখন তাকে ‘মেসিয়ানিক’ বলা হয়। এর অবশ্য অনেক রকমফের আছে। Benedict Anderson, ঐ, পৃষ্ঠা-৭ ঐ ঐ, পৃষ্ঠা-৩৭ Ian Jarvie, National Cinema: A theoretical assessment, Cinema & Nation, edited by Mette Hjort & Scott Mackenzie, Routledge 2010, পৃষ্ঠা ৭৭ তপন বাগচী, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পঞ্চাশ বছর : লোকজীবনের উপস্থাপনা, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, তথ্য মন্ত্রণালয় ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৮-৩৯।