The artist is always beginning. Any work of art which is not a beginning, an invention, a discovery is of little worth.
EZRA POUND
রাতের পর রাত, পেরিয়ে গেল সহস্র এক রজনী। গল্প বলে গেলেন এক অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত নারী — শাহেরজাদা। শুধু নিজের জীবন নয়, সম্রাট শাহরিয়ারকে এইভাবে গল্প শুনিয়ে রক্ষা করেছিলেন অসংখ্য নারীর জীবন। বোর্হেসই জানাচ্ছেন আমাদের, হাজার এক রজনী অনির্দিষ্ট সময়কে প্রবহমান রেখে যায়। এভাবেই সাহিত্যের ইতিহাস হয়ে ওঠে মানুষের সাংস্কৃতিক ও মননচর্চার ইতিহাস। কবে কখন কীভাবে এই সাহিত্যের সূত্রপাত ঘটেছিল, আজ আর তার সুলুক সন্ধান খুব সহজ কাজ নয়। তবে বইয়ের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যচর্চা যে দেশে দেশে বিস্তার লাভ করেছিল, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। বিশশতকে পৌঁছুনোর আগেই এই সাহিত্যই হয়ে ওঠে বিশ্বসাহিত্য; আর বিশশতকে পৌঁছেই মানবিক অভিজ্ঞানের, বিশেষ করে ভাবুকতা আর মননের স্পর্শে সাহিত্য ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। কবিতায় প্রধানত থাকে আবেগের উত্সারণ, কিন্তু জীবনানন্দ দাশকেও বলতে শুনি, প্রত্যেক মনীষিরই একটি বিশেষ প্রতিভা থাকে, কবিরও রয়েছে সেই প্রতিভা। যেহেতু কবিও “মনীষী, কাজেই অর্থনীতি সম্বন্ধে — সমাজনীতি, রাজনীতি সম্বন্ধে মননরাজ্যের নানা বিভাগেই, কবির চিন্তার দ্বারা সিদ্ধ।” সাহিত্য এভাবেই আমাদের ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। মানব সভ্যতাকে শিখরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে। পৃথিবীর প্রতিটি বই, প্রতিটি রচনা তাই আমাদের উত্তরাধিকার। এভাবেই গড়ে উঠেছে সাহিত্যবিশ্ব; আর সাহিত্যবিশ্বই হচ্ছে পৃথিবীর সমগ্র সাহিত্য। দেশে দেশে তাই যে সাহিত্যচর্চা প্রবাহিত হয়ে চলেছে, তার প্রতিটি রচনা তাই বৈশ্বিক, বিশ্বভাবুকতার অংশ, আমাদের চিন্তনবিশ্ব। বিস্ময়কর হচ্ছে, কোনো একটি দেশে নয়, কয়েকজন লেখকের দ্বারাও নয়, দেশে দেশে অসংখ্য লেখক গড়ে তুলেছেন এই ভাববিশ্ব। ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা, এশিয়া থেকে আফ্রিকা, এমন কোনো দেশ বা অঞ্চল নেই যেখানে সাহিত্যচর্চা হয়নি। এই সাহিত্যবিশ্ব রূপবৈচিত্র্যের দিক থেকে যেমন বহুমুখি, তেমনি স্থানিক পরিসরের দিক থেকে অনেক ছড়ানো। একইসঙ্গে সাহিত্যবিশ্ব আবার পরস্পরের প্রতিস্পর্শী, প্রতিদ্বন্দ্বী।
একারণেই অভাবনীয় নয়, রবীন্দ্রনাথ ও গ্যোয়েটে, বিশ্বসাহিত্য নিয়ে এই দুই সর্বান্বয়ী মনীষার আগ্রহ ছিল অনিঃশেষ। গ্যোয়েটে ১৮২৭ সালে এক শিক্ষার্থীকে বলেছিলেন, “বিশ্বসাহিত্যের কালান্তর প্রায় এসে গিয়েছে এবং প্রত্যেকেরই কর্তব্য সেদিকে নজর রেখে তার অগ্রসৃতি ত্বরান্বিত করে তোলা।” তিনি ভেবেছিলেন সময়টা এমন যে, এখনি একটা ‘সমগ্রধর্মী বিশ্বসাহিত্য’ নির্মিত হওয়া উচিত। এর ঠিক আশি বছর পরে ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার জাতীয় শিক্ষাপরিষদে ‘বিশ্বসাহিত্য’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। ওই প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, “গ্রাম্য সংকীর্ণতা হইতে নিজেকে মুক্তি দিয়া বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে বিশ্বমানবকে দেখিবার লক্ষ্য আমরা স্থির করিব, প্রত্যেক লেখকের রচনার মধ্যে একটি সমগ্রতাকে গ্রহণ করিব এবং সমগ্রতার মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রকাশচেষ্টার সম্বন্ধ দেখিব এই সংকল্প স্থির করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে।” রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষ তার ভাবনাকে কীভাবে প্রকাশ করে, নিজের কোন নিত্যরূপ সে দেখতে চায়, অস্তিত্বকে কীভাবে আভাসিত করে, এসবই হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের মর্মকথা। শুধু এই একটি প্রবন্ধ নয়, বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে নিজের ধারণাকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করবার জন্য এর আগে ও পরে আরও দু’টি পরিপূরক প্রবন্ধ পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; এর একটি ‘সৌন্দর্যবোধ’, অন্যটি ‘সৌন্দর্য ও সাহিত্য’। গ্যোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথ, বোঝা যায়, দু’জনেই ছিলেন সাহিত্যবিশ্বের সমর্থক। জার্মানি বা ভারতবর্ষকে ছাড়িয়ে গিয়ে সমগ্র সাহিত্যবিশ্বের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত হতে চেয়েছিলেন।
গ্যোয়েটের কাছে সাহিত্যবিশ্ব বলতে কী বোঝায়, বিষয়টি খুব পরিচ্ছন্ন ছিল না। সাহিত্যবিশ্বে স্থানীয় সাহিত্যের স্থান কী হবে, তিনি সে-সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারেননি; তাঁর ভাবনা ছিল অনেকটাই ইউরোকেন্দ্রিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অংশ বা স্থানীয় সাহিত্যকে সমগ্র বা সাহিত্যবিশ্বের ভিত্তি বলে বিবেচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গ্যোয়েটের তুলনায় তাই ছিলেন প্রাগ্রসর মানুষ, এটাই ছিল তাঁর আধুনিকতা। এই আধুনিকতায় সমগ্রকে স্বীকরণ করে নিয়ে নিজস্ব সাহিত্যকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যবিশ্ব সংক্রান্ত ভাবনা তাই ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল না কোনো বিশেষ দেশ কাল বা লেখককেন্দ্রিকও। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য, দেশজ ও আন্তর্জাতিকতার নিবিড় সংযোগ ও সাজুয্যই ছিল রবীন্দ্রভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু এতকিছুর পরও অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের’ কথা কী এখন আর বলবার কোনো প্রয়োজন আছে? আর যদিও বিশ্বসাহিত্যের কথা তুলি, তাহলে দেশে দেশে রচিত এই যে বিপুল সাহিত্য, একে কীভাবে ব্যাখ্যা করবো আমরা? কীভাবে এ সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করা যাবে? বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে কীভাবে নিজেদের সাহিত্যকে মিলিয়ে দেখবো? বিশ্বসাহিত্যকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবার মতো তাত্ত্বিক রীতিপদ্ধতি কী জানা আছে আমাদের? তুলনামূলক সমালোচনার সূত্র অনুসরণ করেও কী বিশ্বসাহিত্যের বিপুলতা আর বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা সম্ভব? আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে বিশ্ব জুড়ে ভোগৌলিকভাবে কী পরিমাণ লেখালেখি হয়েছে, অথবা ভুবনীকরণের অর্থনৈতিক তত্ত্বকে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বিশ্বসাহিত্যের সৃষ্টিশীল অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য আর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যকে বোঝা সম্ভব হবে না। বিশ্বসাহিত্যকে বুঝতে হলে আমাদের সাহিত্যকে দেখার সাধারণ আটপৌরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।
উনিশ শতকেই প্রথম ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করেছিল। এইসময় থেকে ‘রাজনৈতিক রাষ্ট্র’কে কেন্দ্র করে সাহিত্য আর সাহিত্যের ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে দেখার সূত্রপাত ঘটে। অবচেতনভাবে সাহিত্য বলতে তাই জাতীয় সাহিত্যকে বোঝানো হতো, এখনও তাই হয়। আমরা সাহিত্যকে বিচার বিবেচনাও করি এই দৃষ্টিকোণ থেকে। পৃথিবীর সর্বত্র সাহিত্য বিশ্লেষণের এই হচ্ছে সাধারণ রীতি। অর্থাত্ সাহিত্য বলতে বোঝানো হয় জাতীয় সাহিত্যকে। একারণেই অবচেতনভাবে হলেও আমরা সাহিত্যকে জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে থাকি; আর এই রীতিটি প্রায় অন্ধত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এখন এই রীতিকে এতটাই অনিবার্য ভাবা হয় যে নিজেদের দেখার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাহিত্যকেই শেষ অব্দি ছোট ছোট বিভিন্ন খোপের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছি, যা প্রায় সব দেশেই অনুসৃত হচ্ছে। গত প্রায় চার শতক ধরে এভাবেই সাহিত্য সম্পর্কিত ভাবনা গড়ে উঠেছে। গত দু’টি শতকে ঘটেছে সাহিত্যের সার্বিক ‘জাতীয়করণ’। সাহিত্য এবং সাহিত্যের ইতিহাসকে রাজনৈতিক আর ভাষাতাত্ত্বিক সীমার মধ্যে আটকে ফেলে এভাবেই আরও সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু বলা প্রয়োজন, সাহিত্য তো এরকম সংকীর্ণ কিছু নয়। আমার এই ধারাবাহিক লেখাটির লক্ষ্য হবে সাহিত্যের যে দেশকাল অতিরিক্ত একটা চরিত্র আছে, দেশের মাটিতে শিকড়িত হয়েও যা দেশকে অতিক্রম করে যায়, ছুঁয়ে দেয় এক সর্বমানবিক বোধকে — কী ভাবনায়, কী মানবিক সংবেদনা সৃষ্টিতে, কী নান্দনিক কলাপ্রকরণে, সাহিত্যের সেই চরিত্রকে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে পুনরুদ্ধার করা। বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের সাহিত্য কীভাবে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠলো, হয়ে উঠলো বিশ্বভাবনার অংশ, সেসবও বিশ্লেষণ করে দেখা হবে এই রচনায়। তবে এজন্যে প্রথমেই যা প্রয়োজন, আমাদের দেখার চোখটাকে বদলে ফেলে অন্যরকমভাবে দেখা। এই লেখাটিতে সেই বিষয়টির ওপরই আলোকপাত করা হবে।
ফরাসি ইতিহাসবিদ ফার্নান্দ ব্রোদেল কোনো রচনাকে ব্যাখ্যা করা, প্রশংসা করা, অনুধাবন করা আর তুলনা করার যে প্রচলিত দৃষ্টিকোণ আছে, সেই দৃষ্টিকোণটাকে বদলে ফেলার কথা বলেছিলেন। সাহিত্যকে দেখার চোখটাকে যদি এভাবে বদলে ফেলতে হয়, তাহলে সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ইতিহাসের প্রান্তগুলোকে সমানভাবে ছুঁয়ে দিতে হবে। সরে আসতে হবে জাতীয়তাবাদী আলোচনার বৃত্ত থেকে। উন্মোচিত করে দেখাতে হবে কোন ধরনের ঘটনা কীভাবে বিশ্বসাহিত্যের গতিপথকে বদলে দিয়েছে। বুঝে নিতে হবে, শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দেশে দেশে লেখকদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার টানাপোড়েন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, দ্রোহ আর বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছিল। ফলে, ধারাবাহিক এই লেখায় আমি প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণ করে বিশ্বসাহিত্য নিয়ে কোনো আলোচনা করিনি। আমার লক্ষ্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সাহিত্যপরিসরকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে দেখা। সাহিত্য তো শুধু সৃজনশীল রচনামাত্র নয়, যা পাঠ করে পাঠক শুধু আনন্দ পেতে চায়। সাহিত্যিক রচনা একইসঙ্গে আনন্দ আর মানবিক চিত্প্রকর্ষের পরিশীলিত প্রকাশ। ফলে, কেবলি সমকালীন সাহিত্যভাবনা বা পরিস্থিতির বিবরণ নয়, বরং সাহিত্যের দীর্ঘকালের ইতিহাস, যে-ইতিহাসের মধ্য দিয়ে সাহিত্য হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক — এর সৃজনী বৈশিষ্ট্য, কীভাবে তা রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে ক্রমোন্নতির রেখা ধরে নিজে-নিজেই উত্কর্ষের শিখরে পৌঁছে গেছে — সে-সবই বিবেচনায় আনা হবে।
আমার এই লেখার মূল দৃষ্টিবিন্দুটি নিবদ্ধ থাকবে সেই দিকটির ওপর, ফরাসি দার্শনিক পিয়েরে বরদিউ যাকে ‘সাহিত্যবিশ্ব’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সাহিত্যের ওই যে বিশ্ব, বরদিউ ভেবেছিলেন, আমাদের প্রতিদিনের বিশ্বের তুলনায় নিরপেক্ষ। এই সাহিত্যবিশ্বের সীমা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ছড়িয়ে পড়ার পরিসর সাধারণ রাজনীতির দ্বারা কখনই নিয়ন্ত্রিত হয় না, হতে পারে না। একারণেই ষোল শতকের একজন শেক্সপীয়র ঐতিহাসিক পুরাতাত্ত্বিক ঘটনা নিয়ে নাটক লিখে বিশ্বপাঠকের কাছে সমাদৃত হন, একইভাবে সমাদৃত হয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত কৃষ্ণাঙ্গ ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে কিংবা ঈষত্ পূর্বকালের বাদামি বর্ণের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমার এই লেখায় এই আন্তর্জাতিক সাহিত্যবিশ্বের কথাই স্থান পাবে।
লেখকদের আসলে কোনো দেশকাল নেই, এই আপ্তবাক্যটি এভাবেই যথার্থতা পায়। আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরের কথা বললে সেই সঙ্গে আরেকটি কথা আমাদের মনে পড়ে যায়, সেটা হলো সাহিত্য-প্রাধান্যের কথা। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যে আধিপত্যবাদ কাজ করে, আন্তর্জাতিক সাহিত্যের কথা ভাবলে সেই প্রসঙ্গটিও এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। তবে এই প্রাধান্য বা আধিপত্যের বিষয়টি কখনই রাজনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না; কেননা পাঠকের রুচি আর হূদয়ের কাছেই এর যত আবেদন। নিজের লেখার উত্কর্ষ ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে পাঠককে পদানত করার ক্ষমতা কোনো লেখকের নেই। কখনও কখনও কোনো কোনো দেশে রাজনীতি লেখকদের নিয়ন্ত্রণ করেছে বটে, কিন্তু তা ছিল নিতান্তই সাময়িক। আন্তর্জাতিক সাহিত্যবিশ্ব তাই মুক্ত, স্বাধীন জীবনানন্দেরই প্রকাশ।
সাহিত্যের এই মুক্ততা, পরিসরের স্বাধীনতা, দেশকালকে অতিক্রম করে যাবার বিশিষ্টতাই সাহিত্যকে পড়বার এবং বিশ্লেষণ করে দেখাবার নতুন নতুন কৌশলের সূচনা ঘটিয়েছে। এই পাঠ ও বিশ্লেষণ কোনো দ্বন্দ্ব ছাড়াই একইসঙ্গে অন্তর্গতভাবে রচনাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাইরের দিক থেকে ঐতিহাসিক। অর্থাত্ সাহিত্যকে যেমন পড়তে বা ব্যাখ্যা করতে হয় নিজস্ব রচনা হিসেবে, তেমনি আবার পড়তে হয় ঐতিহাসিকভাবে। এভাবেই ঘুচে যায় সেই পার্থক্য, এর একদিকে আছেন শুধু রচনাটাকে যারা গভীরভাবে পড়তে চান সেই পাঠকেরা, আরেক দিকে সাহিত্যের ইতিহাসকে বাইরে থেকে যারা দেখে থাকেন, তারা। এই লেখায় কোনো বিশেষ রচনা কীভাবে বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছিল, সেটা বুঝবার চেষ্টা করা হবে। তবে এজন্যে যে-রচনাগুলো শুধু ঔপনিবেশিক অথবা সাম্রাজ্যবাদী বিষয়কে ছুঁয়ে দিয়েছিল সেই লেখাগুলোর বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে দেখানো হবে না; বরং সেই সব রচনার কথাও বলা হবে যাদের রচয়িতা ছিলেন বেকেট অথবা কাফকার মতো লেখক। আর একথা তো সহজেই বলা যায়, তাদের লেখাগুলো ছিল আপাত অর্থে ইতিহাসবিমুক্ত, রাজনীতিবর্জিত। প্রাধান্যসূচক সাহিত্য কখনও কখনও এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে এইসব রচনা বিশ্লেষণের সূত্রেই আমরা বুঝে নিতে পারি, ঐতিহাসিকভাবে সাহিত্য কীভাবে, কত বিচিত্র পথে এগিয়েছে। বিশ্বের কোন অঞ্চল বা মহাদেশ অনন্য সৃজনশীল সাহিত্য রচনার পীঠস্থান হিসেবে আমাদের সমীহ আদায় করে নিয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে সাহিত্য সমালোচনার দু’টি রীতি এখনও অব্দি প্রায় পরস্পরবিরোধী কিন্তু প্রাধান্যসূচক জরুরি ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর একটি হলো উত্তর-উপনিবেশবাদী সমীক্ষণ; এই তত্ত্বসূত্রটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের পুনর্মূল্যায়ন করছে। এই তত্ত্বের প্রবল রাজনৈতিক মাত্রা আছে। দ্বিতীয় যে সমালোচনা রীতিটি অনুসৃত হচ্ছে সেটি হলো ফরাসি ঐতিহ্যবাহী সমালোচনা-রীতি। এই রীতিতে শুধু নির্দিষ্ট রচনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। রচনার নিজস্ব অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য, শৈলী, অর্থাত্ লেখাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ, লেখাটাই একমাত্র লক্ষ্য। লেখার বাইরের কোনোকিছু এই তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় না। ইতিহাস বা রাজনৈতিক অনুষঙ্গকে এই তত্ত্বে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সাহিত্যবিশ্বকে ফরাসি সমালোচনা-রীতি অনুসারে মনে করা হয় ‘বিশুদ্ধ’। রাজনীতি বা ইতিহাসের মধ্যে একে টেনে আনা হলে এই বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ন হয়। এই তত্ত্বসূত্রটি, বলা নিষ্প্রয়োজন, খণ্ডিত। সাহিত্যকে এরকম একক কোনো সূত্র দিয়ে সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ধারাবাহিক এই রচনাতে আমি তাই উল্লিখিত দৃষ্টিকোণ অনুসরণ করিনি। বরং ইতিহাসের পর্বে পর্বে সাহিত্যের মধ্যে কী ধরনের রূপান্তর ঘটেছে, রাজনীতি সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করতে পেরেছে, রাজনীতি ও ইতিহাসের ওপর সাহিত্য কতটা নির্ভরশীল ছিল অথবা স্বাধীনতা গ্রহণ করে অগ্রসর হয়েছে, এই লেখার পরবর্তী অংশগুলোতে পাওয়া যাবে সে-সবের উল্লেখ ও বিশ্লেষণ। আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি যে মহত্ সৃষ্টিশীল লেখকেরা ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁদের কাছে সাহিত্যের নিজস্ব শক্তি ও সম্ভাবনাই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সাহিত্যের স্বাধীনতাকেই তাঁরা আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার করে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা, অনন্যতাই হচ্ছে তাঁদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধীরে ধীরে এই লেখকেরা ঐতিহাসিক এবং প্রথাবদ্ধ সাহিত্যের পথ থেকে সরে এসে এভাবেই সাহিত্যিক স্বাধীনতার ওপর ভর করে সাহিত্য রচনা করেছেন।
অনুবাদের কথাটিও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমেই তাঁদের লেখা সাহিত্যবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অনুবাদের প্রসঙ্গ ও তাত্পর্যের কথাটিও তাই এই ধারাবাহিক রচনায় উল্লিখিত হবে। এই ধারাবাহিক লেখাটি, স্পষ্ট করে বললে, ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সমালোচনা’র প্রথম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কেননা, এখন পর্যন্ত সাহিত্য সমালোচনার যে দেশকেন্দ্রিক রীতি প্রচলিত আছে —যেমন বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য একান্তভাবেই বাংলাদেশের; ফরাসি সমালোচনা ফরাসিদের; এর কোনোটিই আন্তর্জাতিক নয়। তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনারও চল আছে। কিন্তু এখনও অব্দি বিশ্বসাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে, অর্থাত্ বৈশ্বিক পটভূমিতে কেউ সাহিত্য সমালোচনা করেননি। সাহিত্য, বিশেষ করে বিশ্বসাহিত্য কীভাবে আমাদের সাহিত্যবোধ ও প্রত্যয়কে নির্মাণ করে দিয়েছে, আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক বৃদ্ধিবৃত্তির সীমাকে বাড়িয়ে দিয়েছে, এই লেখায় পাওয়া যাবে তার বিবরণ ও বিশ্লেষণ — ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও নান্দনিক নানা দিক থেকে। সাহিত্যবিশ্বের বৈশ্বিক ইতিহাস, আবিষ্কার, পরিসর, সর্বজনীনতা, ভুবনীকরণ, অনুবাদের কার্যকারিতা ও প্রভাব, জাতীয়তা ও ঐতিহ্যের উদ্ভাস, সৃজনী দ্রোহ, সংগতি, সমন্বয়, সার্বিকভাবে সাহিত্যের বহুমাত্রিকতার কথাই বিবৃত হবে এই লেখায়। সাহিত্য যে আাামদের চিত্প্রকর্ষের বয়ান, এতে পাওয়া যাবে তার বিবরণ। পাঠকদের দীর্ঘ কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষক এই অভিযাত্রায় লেখকের সহযাত্রী হবার আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।
