আসাদ এই প্রথম তার প্রেমিকা নিপাকে নিয়ে বাইরের বেরুনোর সুযোগ পেয়েছে। এর আগে তাদের দেখা-সাক্ষাত্ যেটুকু হয়েছে—তা হয়েছে বাড়ির ছাদে। কথা হয়েছে আকারে-ইঙ্গিতে। দু-বাড়ির মাঝখানে প্রশস্ত রাস্তা। কিন্তু ছাদে উঠলে দু-বাড়ির দূরত্ব ততটা মনে হয় না। পরিবেশ নীরব থাকলে নিচু গলায় টুকরো টুকরো কথাও বলা যায়। ছাদ থেকেই তারা বাইরে বের হবার কথা চূড়ান্ত করে। সেই মতে আজ দুজনের দেখা হয়েছে।
আসাদের ভেতরে তীব্র অস্থিরতা। নিপাকে কাছে পেতে তার ভেতরে যে উন্মাদনা ছিল—সেটা ছাপিয়ে এখন চেপে ধরেছে অস্থিরতা। কোথায় যাবে। কী বলবে নিপাকে। সারাদিন কী করবে তারা। এই প্রশ্নগুলো তাকে ভাবনার টুটি চেপে ধরেছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না। গলা শুকিয়ে আসছে।
দুজন ঠিক করে, আগে তারা পার্কে একান্তে কিছু সময় কাটাবে। দুপুরে একসঙ্গে খাবে। তারপর সময় থাকলে থিয়েটার অথবা সিনেমায় অথবা...
পার্কে তারা পাশাপাশি হাঁটছে। আসাদ গোছানো কথা ঠিকমতো বলতে পারছে না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে অস্থিরতা। এই সময় আকস্মিক ম্যাড়মেড়ে কণ্ঠে সালাম। অচেনা কণ্ঠে সালাম। সামনে তাকিয়ে আসাদ ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। বিধ্বস্ত চেহারায় কুদ্দুস দাঁড়িয়ে কুটকুটে হাসছে। মুখে ছোবরা-ছোবরা দাড়ি। এতবছর পরও কুদ্দুসকে চিনতে আসাদের অসুবিধে হয় না। চোখ কপালে উঠে যায় আসাদের। সালামের জবাব না দিয়ে না চেনার ভান করে কুদ্দুসের পাশ কাটিয়ে নিপাকে নিয়ে আসাদ এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু কুদ্দুস তার পিছু ছাড়ে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আসাদকে পেয়েছে। আসাদকে তার ভীষণ দরকার। সে আসাদের পিছু পিছু যেতে থাকে।
আসাদ এবং নিপা দূরে গিয়ে একটি বেঞ্চে পাশাপাশি বসে। আসাদ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে চেহারায় রোমান্টিক ভাব আনার চেষ্টা করে। হাসি মুখে নিপার দিকে তাকায়। আর তখনই ম্যাড়মেড়ে কণ্ঠে আবার সালামের আওয়াজ। আসাদ চমকে তাকায়। কুদ্দুস বেঢপভাবে দাঁড়িয়ে আছে। নিপা ভয় পেয়েছে কুদ্দুসকে দেখে। তার উস্কোখুস্কো চুল। মুখে সজারুর কাঁটার মতো খাড়া-খাড়া দাড়ি। সন্দেহজনক চেহারা। খুনি খুনি মনে হয়। নিপা ভয়ার্ত মুখে আসাদের দিকে তাকায়।
আসাদও গম্ভীর মুখে তাকিয়ে। আপনি কে ভাই? অকারণে পেছনে পেছনে ঘুরছেন?
কুদ্দুস হকচকিয়ে তাকায়। সে ভীষণ অবাক। এইটা কী কইতাছেন ভাইজান! টানা ছয়মাস জেলখানায় এক রুমে—এক বিছানায় পাশাপাশি ঘুমাইলাম। রাতবিরাতে কত কথা কছি আমরা। আপনি কইছিলেন, জেল থাইকা বাইর অয়া আমার পরিবারের খবর নিবেন। আর এখন কইতাছেন—আমি কেডা? ভাইজান কি সত্যি আমারে চিনবার পারেন নাই? আমি কুদ্দুস। টাঙ্গাইলের কুদ্দুস। মনে আছে ভাইজান—প্রথম দিন জেলে গিয়া আপনি ফোঁপায়া কানতেছিলেন। আমি আপনারে সাহস দিলাম। আপনি আমারে বন্ধুর মতো জড়াইয়া ধরলেন। এখন আপনি আমারে চিনতে পারতাছেন না! ভীষণ তাজ্জবের ব্যাপার। আসাদ এবার ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়ায়। বলছি তো ভাই আমি আপনাকে চিনি না। তারপরও কেন বিরক্ত করছেন?
নিপাও জোর দিয়ে বলে, সে আপনাকে চেনে না। তারপরও আপনি ডিস্টার্ব করছেন কেন? আপনি যদি এরপরও এখান থেকে না যান—তাহলে আমরা পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো। কী বলছি, শুনছেন?
কুদ্দুস মন খারাপ করে চলে যায়। যেতে যেতে বলে—জেলখানার বন্ধু আসল বন্ধু না। সব স্বার্থের বন্ধু।
কুদ্দুস যাওয়ার পরও গুমোটভাব কাটে না। দুজন মৌনভাবে বসে থাকে। আসাদের মুড অফ হয়ে গেছে। ব্যাটা আর সময় পেলো না। চমত্কার একটা রোমান্টিক মুহূর্ত ব্যাটা তছনছ করে দিল।
নিপা উঠে পড়ে। তাকে বিচলিত মনে হয়। চলো, বাসায় যাব। এখানে আমার ভালো লাগছে না।
আসাদ বিমর্ষ মুখে বলে, কেন? সমস্যা কী। ও তো চলে গেছে।
নিপা বলে, আমি ওকে নিয়ে ভাবছি না। এখানে আমার আর ভালো লাগছে না। বলেই নিপা হাঁটা শুরু করে। আসাদ কী করবে, বুঝতে পারে না। সে পেছন-পেছন এসে নিপাকে বোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু নিপা কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে। পার্কের বাইরে এসে একটি রিকশায় চেপে বসে সে। আসাদ কী করবে বুঝতে না পেরে অগত্যা সেও নিপার পাশে রিকশায় উঠে বসে। রিকশা চলতে থাকে।
বাসায় ফিরে নরক যন্ত্রণা শুরু হয় আসাদের। সারারাত কাটে নির্ঘুম। পরদিন সকাল-সকাল ছাদে গিয়ে বসে থাকে। যদি নিপা ছাদে ওঠে। তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে শান্ত করবে। কিন্তু নিপা ছাদে আসে না। তার মোবাইলও বন্ধ। আসাদের জীবনে হাসি-আনন্দ নিভে যেতে থাকে।
ঘুমের ঘোরে আসাদ জেলখানার চিত্র দেখতে পায়। কুদ্দুস তার পাশে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে। তাকে সাহায্য করছে। অথচ সেই কুদ্দুসকে আজ সে না চেনার ভান করেছে। এক্ষণে সেই কষ্ট লাফিয়ে বাড়ছে। বড় অদ্ভুত জায়গা জেলখানা। বিচিত্র সব মানুষ। কেউ খুনি। কেউ ডাকাত। কেউ দাঙ্গাকারী। এসব খারাপ মানুষদের মধ্যে এসে আসাদের বুক ভেঙে কান্না আসতে থাকে। এবং সে কাঁদতে থাকে। সেই সময় কুদ্দুস নামের একজন ছিনতাই মামলার সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী আসাদের কাছে এগিয়ে আসে। পাশে বসে। বলে—নতুন আইছেন তো, তাই খারাপ লাগতাছে। কয়দিন থাকেন সব ঠিক অয়া যাইব। প্রথম-প্রথম সবারই এমন লাগে।
আসাদ খেয়াল করে—ব্যাপারটাও তাই। কয়েদীদের দেখে জেলে তারা শাস্তি খাটছে—তেমনটা মনে হয় না। মনে হয় নিজ পরিবারের সঙ্গে আনন্দে-ফূর্তিতে আছে।
কুদ্দুস বলে, জেলখানায় কারো চোখের পানির কোনো দাম নাই। চোখ মোছেন। আমিও আপনার মতো প্রথম-প্রথম মনমরা হয়ে থাকতাম। কান্নাকাটি করতাম। পরে ভাইবা দেখলাম, কোনো লাভ নাই। আপনিও কান্নাকাটি বাদ দেন। মনটারে শক্ত করেন। এখন কন—কী করছিলেন, এহানে আইতে অইল ক্যা?
আসাদ চোখ মুছে তার দিকে তাকায়। কুদ্দুসের সহানুভূতি জড়ানো কথায় আসাদের বুকটা হালকা হয়। আপন মনে হয় কুদ্দসকে। নিজের কষ্টের কথা সব তাকে খুলে বলে। কুদ্দুসও নিজের কথা অকপটে বলে। তারা ঘনিষ্ঠ হয়। জেলখানার কিছু নিয়ম আছে। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। না করলে নিজেরই সমস্যা। সেখানে সব দায় নিজের। সকালে লাইন দিয়ে টয়লেটে ঢোকার অপেক্ষা। লাইন দিয়ে খাবার সংগ্রহ। এ সবই কুদ্দুস তাকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেয়। সেই কুদ্দসকে আজ সে না-চেনার ভান করেছে। কাজটা ঠিক হয়নি। কুদ্দুসকে সে অপমান করেছে—কষ্ট দিয়েছে। সেই কষ্ট এখন আসাদের বুকে চেপে ধরছে। তার বুক ভেঙে যাচ্ছে। কুদ্দুসকে খুঁজে বের করতে হবে। তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আসাদ পার্কের সেই জায়গায় এসে বসে থাকে। যেখানে কুদ্দুসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কুদ্দুসের দেখা মেলে না। আসাদের কষ্টের সীমা থাকে না। সে পার্কের বেঞ্চে বসে কাঁদতে থাকে।
কুদ্দুসকে না পেলেও নিপাকে পেয়ে যায় আসাদ। তার জন্য অবশ্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় তাকে। মুখোমুখি দেখা হয় না। কথা হয় মোবাইলে। আসাদ সব সত্য স্বীকার করবে। এই দিব্যি দেওয়ার পরই নিপা মোবাইলের লাইন কেটে না দিয়ে মোবাইল কানে ধরে থাকে। আসাদ বলে, কুদ্দুসকে সে চেনে। কান্না গলায় বলে, আমি মিথ্যে বলেছি নিপা। কুদ্দুস ঠিকই বলেছে—তার সঙ্গে আমার জেলখানায় পরিচয়। জেলখানায় কুদ্দুস আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। তার সাহায্য না পেলে আমার জেলজীবন হতো ভয়াবহ দুর্বিসহ। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার সেই প্রাপ্য কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে তাকে আমি অপমান করেছি। কষ্ট দিয়েছি। আমি ভীষণ অনুতপ্ত নিপা—আমি ভীষণ মর্মাহত। আমি সেই উপকারী বন্ধুকে খুঁজছি। তার কাছে ক্ষমা চাইব। পাশাপাশি তোমার কাছেও ক্ষমা চাই নিপা। তোমাকেও কষ্ট দিয়েছি। মিথ্যে বলেছি তোমার কাছে।
কলেজে পড়ার সময় একটি মেয়েকে আসাদের ভালো লেগে যায়। মুগ্ধ করার মতো রূপবতী সে। গুটি-গুটি পায়ে হেঁটে কলেজে যেত। হাঁটত না যেন সূচ দিয়ে নকশিকাঁথা বুনছে। আসাদ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকত। তারপর শুরু হয় তাকে অনুসরণ। মেয়েটি ছন্দ তুলে যখন হেঁটে যেত, আসাদ তখন মোটরসাইকেল নিয়ে তাকে ফলো করত। মাঝে-মধ্যে ভালোবাসার আগুন ঠেলে বের হয়ে আসত। দু-চারটে প্রেমমাখা মন্তব্য ছুড়ে দিত। মেয়েটি কোনো জবাব দিত না। আসাদের উত্সাহে ভাটা পড়ত।
মেয়েটি একদিন ভ্রাম্যমাণ আদালতে আসাদের নামে অভিযোগ করে। কলেজ মোড়ে সেদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসেছিল। আদালত আসাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রায় ঘোষণা করে। ছয় মাসের জেল। আসাদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঠাঁই হয় জেলখানায়।
—তারমানে তুমি একজন ইভটিজার? নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে নিপা। আসাদ অস্বীকার করে না। বলে, আমি যা করেছি তাকে ইভটিজিং বলা ঠিক হবে না। আমি যা করেছি—তা স্রেফ পাগলামি। ভালোবাসার পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল আমাকে। কিশোর বয়সের পাগলামি বড় লাগামহীন পাগলামি। সে সময় কোনো বোধ-বিবেচনা কাজ করে না। কিন্তু ব্যাপারটা যে ঠিক না—আসাদ বুঝতে পারে পরে। আসাদ বলে, আমি আমার সেই নোংরা মানসিকতা বদলে ফেলেছি। ছয় মাসের জেলজীবন আমাকে তা বদলে ফেলতে বাধ্য করেছে। জেলে না গেলে হয়তো এমনটি হতো না। সত্যি বলছি নিপা, আমি আমার সেই কদর্য অতীত ভুলে যেতে চাই। তুমি কি আমাকে সে সুযোগ দেবে না?
কথা বলে না নিপা। আসাদ হ্যালো-হ্যালো করে থেমে পড়ে। নিপা লাইন কেটে দিয়েছে। তারমানে—নিপা তাকে মাফ করবে না। সবই গেল। দু-কূলই হারাল সে। আসাদ নিজের বুক চাপড়াতে থাকে। কিছুতেই নিপার মন গলাতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তার মরে যেতে ইচ্ছে করে। একটি চলন্ত বাসের দিকে এগিয়ে যায় আসাদ। ঝাঁপিয়ে পড়বে চলন্ত বাসের সামনে—নির্ঘাত প্রাণ দেবে। এ জীবন রাখার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক সুখের। বাসটা অনেক কাছে এসে পড়েছে। আসাদ ঝাঁপ দেবে—ঠিক তখনই তার মোবাইলে ম্যাসেজ আসার শব্দ হয়। আসাদ ম্যাসেজ অন করে দেখে নিপার ম্যাসেজ। লিখেছে—সত্যি কথা স্বীকার করার জন্য ধন্যবাদ।
আসাদের শরীরে বিদ্যুত্ খেলে যায়। এ কথার মানে কী? নিপা কি তাকে মাফ করেছে? হয়তো করেছে। নইলে ধন্যবাদ দেবে কেন? এক লাফে রাস্তা ছেড়ে আইল্যান্ডে উঠে আসে। একটু আগের মৃত্যুচিন্তা মুহূর্তেই হাওয়া। ভেতরটা টগবগ করে আনন্দে ফুটছে। চিত্কার করে বলতে ইচ্ছে করছে—তোমরা সবাই শোনো—নিপা আমাকে ভালোবাসে। নিপা আমাকে মাফ করেছে। আমার চেয়ে সুখী মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আসাদ গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে ছটফট করে হাঁটছে।
ছাদে উঠে নিপাকে পেয়ে তার মন আনন্দে নেচে ওঠে। নিশ্চয়ই নিপা তাকে মাফ করেছে। কিন্তু তাকে দেখে নিপা চলে গেলে আসাদ হতাশভাবে বসে পড়ে। সে অস্থিরভাবে মোবাইলের ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে লিখতে থাকে—নিপা, তুমি কি আমাকে... লিখতে গিয়ে আবার থেমে পড়ে। ভাবতে থাকে—কী লিখবে সে? কী লেখা যায়? কী লিখলে নিপার ভালোবাসা পাওয়া যাবে?
আসাদের এই ভাবনার মধ্যে হঠাত্ তার মোবাইলে একটি ম্যাসেজ আসে। সে আর কিছু ভাবতে পারে না। ঝড়ের গতিতে ম্যাসেজ অপশনে ঢুকে পড়ে।
