রাহুল সাংকৃত্যায়ন

জ্ঞানরাজ্যের পরিব্রাজক

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৭
‘রাহুল সাংকৃত্যায়ন শুধু পৃথিবী পরিব্রাজকই ছিলেন না, বিশ্বের জ্ঞানরাজ্যে পরিব্রাজনাতেও ছিলেন একান্ত নিষ্ঠাবান ও নিরলস’—যতীন সরকারের এমন মন্তব্যের সঙ্গে দুটো বইয়ের উদাহরণ দেওয়া দরকার। এর একটি হলো—বহুল পঠিত ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ ও ‘মানব সমাজ’। ভোলগা থেকে গঙ্গায় তিনি বিশ শতকের বিশের দশক পর্যন্ত মানব সমাজের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে পদ্ধতিগতভাবে অগ্রসরমাণ হতে পাঠকদের জন্য মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবসমাজের ইতিহাস বিবৃত করেন। এছাড়াও তিনি ভাষা ও জাতি নিয়ে বিভিন্ন মঞ্চে কয়েকটি প্রবন্ধ পাঠ করেছেন, যা ‘আজকের সমস্যাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৪৪ সালে। সেখানে হিন্দি ও উর্দুর সমস্যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ’৪৭-এর দেশভাগের মধ্য দিয়ে সত্য হয়ে ওঠে, যার মধ্যে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে পৃথক জাতিসত্তার পরিচয়ে বাংলাদেশের জন্ম। একজন দূরদর্শী দার্শনিক-রাজনীতিক-সমাজতাত্ত্বিকের পক্ষেই এমন গভীর ধারণা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। বহুভাষাবিদ রাহুল সাংকৃত্যায়ন লিখতেন মূলত হিন্দি ভাষায়। পাশাপাশি তিনি সংস্কৃতি, পালি, তিব্বতি, ভোজপুরী ভাষাতেও লিখেছেন। কলকাতায় রাহুল বেশ সমাদৃত, তবে বাংলাদেশে তাঁর প্রয়োজন অনুভূত দেখি প্রগতিশীল চেতনা শাণিত করতে। অথচ রাহুল সবার জন্য পঠিত হতে পারে। তাঁর রচিত গ্রন্থ সে কথাই বলে। রাহুলজির ৭০ বছরের জীবনের ৪৫ বছর ভ্রমণে কাটিয়েছেন। ৪৫ বছরের লব্ধজ্ঞান ভারতীয় উপমহাদেশীয় পাঠকসমাজের কাছে রেখে গেছেন, যদিও তিনি বাংলাদেশে জ্ঞানে-অজ্ঞানে উপেক্ষিত অথবা নির্বাসিত নীতিনির্ধারকদের মূর্খ ধারণাপ্রসূত হয়ে। তবে প্রতিকূল চিত্রে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে রাহুলের ত্রিশটি অনূদিত গ্রন্থ প্রকাশ করে রুক্কুশাহ ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স রীতিমতো পাঠকসমাজকে ঋণী করেছেন! এরমধ্যে কয়েকটি বইয়ের সম্পাদনা ও ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক যতীন সরকার। রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর ৪৫ বছরের সঞ্চিত পরিব্রাজনজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়ে দেড়শো ঢাউস গ্রন্থের প্রণেতা। এরমধ্যে ‘দর্শন-দিগদর্শন’ বিশেষ স্বতন্ত্র স্থান লাভ করেছে পাঠকমহলে। দর্শন-দিগদর্শনকে বলা হয় প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দর্শনের ইতিহাস। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন যুগের দর্শনের মূলভাবনাগুলো যেভাবে উঠে এসেছে, তেমনটি আর কোথাও উঠে আসেনি। এই গ্রন্থটির মাধ্যমে রাহুল ইসলামের প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক ভূমিকার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেন—‘ইসলাম বোঝাপড়া করতে চেয়েছিল, সামন্ত-পুরোহিতদের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গেই যার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ছিল সামন্তবাদী শোষণ ও দাসপ্রথা।... এই কাজে আরবের উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রচলিত সাম্য ও সৌভ্রাত্র্যের নীতিকে অবশ্যই ব্যবহার করেছিলেন।’ ১৮৯৩ সালের ৯ এপ্রিল উত্তর প্রদেশের পন্দাহা ঝেরার আজমগড় গ্রামে কেদারনাথ পান্ডের জন্ম। দশ বছর (১৯০৭) বয়সে বাড়ি থেকে পলায়ন করে অ্যাডভেঞ্চারের জন্ম দেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে এহেন কোনো কাজ নেই যা তিনি করেননি। ছিলেন একজন প্রকৃত ঈশ্বরপ্রেমিক। পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী। ২০ বছর (১৯১৩) বয়সে বৌদ্ধ মঠের মাহন্তের শিষ্যত্ব লাভ করে বাবাজি রামোদার দাস নাম ধারণ করেন। পরবর্তীকালে বৌদ্ধভিক্ষু হয়ে রাহুল সাংকৃত্যায়ন নাম ধারণ করেন। বিশ্বসভায় এটি আজ একটি সুপরিচিত নাম। যাঁকে বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিব্রাজক বলে পশ্চিমা-রাশিয়ানরা শ্রদ্ধা করেন। বার বার এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন এভাবে—‘আমি কোনো এক সময় বৈরাগী ছিলাম, পরে আর্যসমাজী হয়েছিলাম, বৌদ্ধ হই, আবার বুদ্ধের ওপর অপার শ্রদ্ধা রেখেও মার্কসের শিষ্য হই।’ দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিকের রোগী রাহুল সাংকৃত্যায়ন ১৯৬১ সালে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকে চিকিত্সা করাতে রাশিয়ায় নেয়া হয়, কিন্তু উন্নতি না হওয়ায় ৬৩ সালের ২৩ মার্চ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ৫১ বছর আগে ১৪ এপ্রিল এই মহামানবের দেহজ মৃত্যু হয়। একজন পরধর্মের প্রতি সহিষ্ণু আর শ্রদ্ধাশীলের অন্যতম উদাহরণ রাহুল। ‘দর্শন-দিগদর্শন’ রচনার পর তিনি সংস্কৃতি ভাষায় কোরান অনুবাদেও আগ্রহী হয়েছিলেন। পরে তিনি ‘ইসলামের রূপরেখা’ নামক একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইসলামের মহান দর্শনকে তিনি সেখানে দার্শনিকভাবে বিশ্লে¬ষণ করেছেন। রাহুলের জ্ঞানের গভীরতা আর তাঁর বিশ্লেষণের অপূর্ব সমন্বয় দেখি ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’-তে। তিনি ভবঘুরে শাস্ত্রকে মানবজীবনের জন্য বিশেষ করে একটা জাতির চূড়ান্ত জয়ের দিকে কিভাবে নিতে পারে, তা ব্যাখ্যা করেছন—নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। তিনি এও বলেছেন, আজ ভারতীয়দের মধ্যে ভবঘুরে কমে যাওয়ার কারণে তারা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত, যারা আজও পর্যন্ত ভারত দেখেনি তারা বাইরে গিয়ে কতটুকুই বা অর্জন করতে সমর্থ? দেশকে-জাতিকে সমৃদ্ধ করতে ভবঘুরেদের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেছেন। সেজন্য কোন বয়স থেকে কিভাবে এ যাত্রায় বের হতে হবে, তা-ও বর্ণনা করেছেন। সম্ভবত তিনি খ্রিস্টপূর্ব বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল-প্লেটো, পরবর্তীকালে রাসুল (সা.) দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকবেন। প্রচলিত সামাজিক সম্পর্ক ও শোষণ-ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে না পারলে ‘নতুন মানব সমাজ’ গড়ে তোলা সম্তব নয়। রাহুল বইটির মধ্য দিয়ে গভীর ক্ষোভের সঙ্গে জ্বলন্ত ভাষায় দেশাচারের নামে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে তীব্র কষাঘাতে জর্জরিত করেছেন, এবং সেই সঙ্গে এর ধ্বংস কামনা করেছেন।