আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য সবকিছু মনোমুগ্ধকর করে সৃজন করেছেন। সকল সৃষ্টিকে মানুষের মুখাপেক্ষী ও অধীন করে দিয়েছেন। কেবল মানুষকেই আল্লাহ উত্তম জ্ঞান দান করেছেন। ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় আলো-আধার ও হালাল-হারাম বোঝার ক্ষমতা দান করেছেন। যার কারণে মানুষই পারে সত্য-সুন্দরের আলোকে সব বিশৃংখলা-নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও প্রহসন বন্ধ করে শান্তির পৃথিবী উপহার দিতে। মানুষই পারে মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ সৃষ্টি করে মানবিতার চরম উত্কর্ষ সাধন করতে। আর তাছাড়া পৃথিবীতে মনুষ্য তৈরিকৃত এমন কিছু দ্রব্যাদি তৈরী হয়েছে যা গ্রহণের ফলে একজন মানুষ তার মানবিক সুকুমার বৃত্তিগুলির বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। মাদক হলো তেমন একটি দ্রব্য যা নিয়মিত গ্রহণে একজন মানুষ স্থায়ীভাবে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। মানসিক বেকারগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। ঘটাতে পারে ভয়ংকর সব ঘটনা। ঘুমন্ত পিতা-মাতাকে আদরের দুলালী মেয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে। পারে স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করতে। স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করতে। ভাই ভাইকে হত্যা করতে। এমন কোন অপরাধ নাই যা একজন মাদকাসক্ত মস্তিস্ক বিকৃত ব্যক্তি না করতে পারে। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বদৌলতে আমরা প্রতিদিন জানতে সক্ষম হচ্ছি মাদক নামক নেশার বিষাক্ত ছোবলে দংশিত ব্যক্তিরা কত ধরনের অপরাধ মূলক ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড করে চলেছেন। ইসলাম ধর্ম কেবল নয় সকল ধর্মই এই মাদকের অবাধ ব্যবহার অবৈধ ঘোষণা করেছে। এমনকি মেডিকেল সাইন্স বা চিকিত্সা বিজ্ঞানও মাদক গ্রহণে উপকারের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে সীমাহীন ক্ষতির কথা জোরেশোরে উচ্চারণ করে আসছেন। ইসলাম পূর্ব জাহেলিয়াতের সমাজে মদের প্রচলন ছিল মাত্রাতিরিক্ত। মদ ছাড়া তাদের কোন দিন কাটতো না। মদ ছাড়া তাদের কোনো অসর-উত্সব, সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো না। মেহমানদের আপ্যায়ন করার সব চেয়ে মোক্ষম উপাদান ছিল মদ। (ইদানিং উচ্চবৃত্ত পরিবারে যেটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে) আমাদের যেমন প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পানির পাত্র রয়েছে। তেমনি তাদের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে কলস ভরা মদ থাকতো। যখন ইসলাম এলো অর্থাত্ মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রসূল মনোনিত হলেন এবং ইসলামের দাওয়াত শুরু করলেন। তখন তাঁর দাওয়াতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকলেন। তখন শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিদিন অহি বা প্রত্যাদেশ অবতীর্ন হচ্ছে। সে অবস্থায়ও মদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি, যার কারণে প্রারম্ভিক অবস্থায় মুসলমানগণও মদ পান করেছেন। এটা মদ পানে উত্সাহিত করার জন্য বলছি না বরং বাস্তবিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতার জন্য বলছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা কয়েকটি ধাপে মদ হারাম ঘোষণা করেছেন। অবস্থাটি ছিল এমন-একদিন মাদকাসক্ত অবস্থায় হযরত আলী (রা.) নামাজের মধ্যে সূরা কাফেরুনের তেলোওয়াত উল্টিয়ে ফেলেন। যেখানে আল্লাহ বলেছেন, হে নবী বল “আমি যার ইবাদত করি তোমরা তাঁর ইবাদত করোনা। আর তোমরা যার ইবাদত করো আমি তার ইবাদত করিনা। এই কথা উল্টিয়ে তিনি বলে ফেলেন, আমি যার ইবাদত করি তোমরাও তার ইবাদত করো। আর তোমরা যার ইবাদত করো আমিও তার ইবাদত করি। নামাজ শেষে সাহাবীরা যখন বিষয়টি আলী (রা.)কে বললেন, তিনি তাতে স্মৃতিবিভ্রমের কথা বলেন। এমতাবস্থায় ঘটনাটি রসূল (স.) এর কাছে গড়ায়। রসূল (স.) চিন্তা করতে থাকলেন। হয়তো আল্লাহ কোনো বিধান জারি করবেন। অতঃপর জিব্রাইল (অ.) এসে আল্লাহর বাণী ঘোষণা দিলেন, - “লা তাকরাবুস সলাত, অআনতুম সুকারা অর্থাত্ তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হবেনা। তখন মুসলমানেরা মদ পান করলেও নামাজের পূর্বে বন্ধ রাখতো। কিন্তু মদের বিষয়ে মুসলমানেরা আশা করছিলেন যে এটা নিষেধের ব্যাপারে হয়তো আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তাই সাহাবীরা রসূল (স.) এর কাছে জিজ্ঞেস করছিলেন এবিষয়ে আরো কিছু অবহিত হওয়ার জন্য। তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করলেন, হে রসূল (স.), মানুষেরা তোমাকে মদ ও জুয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করছে, তুমি বল, এটা মারাত্মক অপরাধ। এতে মানুষের জন্য সামান্য উপকার রয়েছে। কিন্তু উপকারের তুলনায় স্থায়ী ভাবে অপরিসীম ক্ষতি ও মারাত্মক অপরাধ নিহিত। এই আয়াত অবতীর্ন হওয়ার পরে মানুষেরা বুঝতে পারে মদ পান করা অপরাধ জনক কাজ। মদে উপকারের তুলনায় ক্ষতির মাত্রা বেশি। তখনো পর্যন্ত মদ পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। এরপর তৃতীয় পর্যায় এসে সুস্পষ্ট হারাম ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন। যেখানে বলা হয়েছে তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হলো- মদ, জুয়া, লটারী, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারনী বস্তু। আর এগুলো হলো শয়তানের কাজ। শয়তান চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিবাদ বিসম্বাদ তৈরি করে দিতে আর আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে গাফেল করে দিতে। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকবে। আজকের পৃথিবীতে যত বিশৃঙ্খলা, যত অশান্তি ও সন্ত্রাসী কাজ কারবার সংঘটিত হয় তার সবকিছুর মূলে এই সমস্ত নিষিদ্ধ বস্তুগুলোর অবাধ ব্যবহারই দায়ী।
লেখক :সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
