স্বাগত বাংলা নববর্ষ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৪২
বাংলার প্রাণ ও প্রকৃতির চিরায়ত উত্সব পহেলা বৈশাখ। লোকায়ত এ উত্সবে আনন্দের দোলা লাগে গ্রাম-গ্রামান্তর, মাঠ-মাঠান্তর পেরিয়ে শহুরে ব্যস্ত বিপণী বিতান ও আধুনিক মননে। আমাদের লোকভাবনা সম্মৃদ্ধ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় বাংলা নববর্ষের আবাহণ ধ্বনিত হয়েছে—“বৈশাখ মাসেতে গাছে আমের কুড়ি / পুষ্প ফুটে পুষ্প ডালে ভ্রমর গুঞ্জরি” (কমলা পালা)। মুসলমানদের ‘ফসলি কর’ (ওশর) ও অমুসলিমদের ‘ভূমি কর’ (খারাজ) আদায়ের সুবিধার জন্য সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিঃ ১০ মার্চ এর সূচনা হলেও তা গণনার কার্যকারীতা ১৫৫৬ সাল বা ৯৯২ হিজরি থেকে । উল্লেখ্য আরবি ‘সন’ ফারসি ‘সাল’ শব্দের অর্থ বছর। এজন্য ‘বাংলা সন’কে বলা হয় বঙ্গাব্দ। বাংলা নববর্ষ পালনের সঙ্গে ইরান ও আরবের বিভিন্ন দেশের নববর্ষ উদ্যাপন—‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের যোগসূত্র লক্ষণীয়। অন্যদিকে বর্ষ পরিক্রমা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বলা হয়েছে—“তিনি সূর্যকে প্রচন্ড দিপ্তি দিয়ে, চাঁদ বানিয়ে দিলেন স্নিগ্ধতা ভরে/ বছর গণনা ও হিসাবের তরে” (কাব্যানুবাদ, সূরা ইউনুস:০৫)। আবার পবিত্র কুরআনেই বার মাসে এক বছর এবং মহান আল্লাহ্র অনুপম সৃষ্টি কৌশল প্রসঙ্গে আছে “নভোমন্ডল-ভূমন্ডল সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই আল্লাহ্ বারটি মাস নির্ধারণ করেছেন....”(সূরা তওবা:৩৬)। মুসলিম ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের আগে অগ্রাহায়ণ থেকে বছর গণনা করা হতো। ‘অগ্র’ অর্থ শুরু ‘হায়ণ’ অর্থ বছর। অন্য মতে ‘অগ্র’ অর্থ শ্রেষ্ট ‘হায়ণ’ অর্থ ধান। কেননা, এসময় প্রধান ফসল আমন বা শ্রেষ্ট ‘হৈমন্তিক’ ধান কৃষকের ঘরে উঠতো। তবে বর্ষা শেষে সম্রাটের খাজনা আদায়কারী কর্মচারীদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে তা শুষ্ক মৌসুমে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে চান্দ্র ও সৌরবর্ষের গণনা রীতিতে পার্থক্যের কারণে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দেয়। যেমন হিজরি সন ৩৫৪ দিনে এবং খ্রিষ্টাব্দ হয় ৩৬৫ দিনে। আবার বঙ্গাব্দ ও প্রচলিত ভারতীয় শকাব্দ গণনা রীতিতে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। বঙ্গাব্দের সূচনা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ঠিক রাখবার জন্য ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বছরের শুরুর পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং শেষ মাসগুলো ৩০ দিন নির্ধারণ করেন এবং আশির দশকে বাংলা একাডেমি ৮ ফাল্গুন ( ২১ ফেব্রুয়ারি) ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) ঠিক রাখবার জন্য খ্রিষ্টাব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অধিবর্ষ নির্ধারণ করে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন প্রচলন করে। তবে ১৯৫৪ সালে ‘যুক্তফ্রন্ট সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙ্গালীর জনপ্রিয় নেতা এ, কে, ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। ইসলাম নির্দোষ বিনোদন, উত্পাদনমুখী, ইবাদতমুখী তত্পরতাকে সমর্থন করে। ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতায় ভুমিকর বা ফসলি কর প্রদান এবং দৈনন্দিন লেনদেন, ব্যয়-বিনিময়ের সব ক্ষেত্রে ‘হিসাব হাল নাগাদ’ বা UP TO DATE থাক এটা ইসলামের শিক্ষা। কেননা, তা অপূর্ব আমানতদারীতা তৈরি করে। তাই রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে কর পরিশোধের উদ্দীপক হতে পারে পহেলা বৈশাখ। অথচ বর্তমানে তা হয়ে গেছে একদিনের সস্তা বিনোদন সর্বস্ব বিষয় মাত্র এবং বাংলা নববর্ষ তার গর্বিত অতীত ভুলে পালিত হয় শহুরে ঘরানায়, এতে নেই কৃষক ও ফসলের মাঠের ‘সোনা ছোঁয়া মাটির’ সৌরভ। বরং ব্যান্ড ও ব্রান্ডিং এর কল্যাণে বসছে বানিজ্যিক পশরা। মেহনতি কৃষক খাজনা আদায়ের আগ্রহে বলতো ‘আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি...’ কিন্তু বর্তমানে তা হারিয়ে যাচ্ছে এবং হাড়ভাঙ্গা শ্রমে ক্লান্ত যে কৃষক ঋণে জর্জড়িত তার কাছে বাংলা নববর্ষের আবেদন কতটুকু? আবার একজন মুসলমানকে জীবনের ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে ইসলামের আলোকে। ইসলামের দৃষ্টিতে নবোদ্ভাবনকে বলে ‘বিদ’আত’ বা ধর্মীয় নতুনত্ব। প্রিয়নবী (স.) বলেন “যে ব্যক্তি আমার দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন কথা সৃষ্টি করে, যা আসলে এর মধ্যে নেই, তবে তা প্রত্যাখ্যাত বা বাতিল” (বুখারি, মুসলিম)। তিনি (স.) আরো বলেন “প্রত্যেক বিদ’আত বা নতুনত্বই পথভ্রষ্টতা” (মুসলিম)। প্রিয়নবী (স.) আরো বলেন “যে ‘বিদ’আতি’কে সম্মান দেখিয়েছে সে নিশ্চয়ই ইসলামের ধ্বংস সাধনে সাহায্য করেছে” (বায়হাকি)। তবুও সত্য কথা হলো মুসলিম শাসকদের অবদান, প্রাণ ও প্রকৃতির উত্সব বাংলা নববর্ষের প্রচলন । শুভ হোক পহেলা বৈশাখ— স্বাগত বাংলা নববর্ষ।