দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেই সাথে পুরনো যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে আসলেও নতুন মেশিনপত্র কেনার কোন উদ্যোগ নেই। যাত্রীবাহী কোচ, পণ্যবাহী ওয়াগন ও ইঞ্জিন মেরামতে এই কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আধুনিকায়নের উদ্যোগ খুব বেশি নেয়া হয়নি। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে এজন্য দুটি প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও সেগুলোর বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। সক্ষমতা বাড়াতে সৈয়দপুর রেল কারখানায় নতুন ক্যারেজ শপ নির্মাণের উদ্যোগও পরিকল্পনাতেই আটকে আছে। ফলে কারখানার কার্যক্ষমতা ক্রমেই কমে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় প্রয়োজনীয় জনবল ও চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অভাবই এ কারখানার ঐতিহ্য হারানোর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতি না কেনা ও অপর্যাপ্ত বাজেটকেও এজন্য দায়ী করছেন তারা। ব্রড ও মিটার গেজ উভয় ধরনের কোচ ও ওয়াগন মেরামতে বাংলাদেশে রেলের প্রধান ভরসা সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত এর কার্যক্ষমতা ক্রমেই কমে আসছে। বছরে ৯০০ কোচ ও ২ হাজার ৫০০ ওয়াগন মেরামতের সক্ষমতা থাকলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ১৪৭টি কোচ ও ১৬৮টি ওয়াগন মেরামত করা হয় কারখানায়। অথচ ২০০৬-০৭ অর্থবছরেও এই কারখানায় মেরামত হয় ৩২০টি কোচ ও ২৫৪টি ওয়াগন।
কার্যক্ষমতা কমতে থাকায় ২০০৯ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেয় রেলওয়ে। ১২২ কোটি ২২ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০১৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী কারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে ২০১৫ সালের জুনে। এতে ব্যয় বাড়বে ১৫৭ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রেলের কোচ, ওয়াগন মেরামতে কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রয়োজন অনুযায়ী এটি সংস্কার করা যায়নি, ফলে এর কার্যক্ষমতা কমে আসছে। তবে অবস্থার উন্নয়নে চেষ্টা চলছে। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ওয়ার্কস ম্যানেজার ওমর ফারুক জানান, কারখানা আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা- কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম চলছে।
এদিকে ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাষ্টের প্রতিনিধি দল গত বছর পরিদর্শন করে রেলওয়ের এই কারখানাটি। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে রেলওয়ের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি। তাতে বলা হয়, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় মেরামত কাজে ব্যবহারের জন্য ৭৪০টি যন্ত্রপাতি থাকলেও অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর আছে মাত্র ৭৪টির। বাকিগুলোর মধ্যে ২৬৫টির বয়স ২০-৫০ বছর আর ৪০১টির ৫০ বছরের উপরে। অথচ গত ২০ বছরে নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগই নেয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় রেলওয়ে মন্ত্রী, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারখানা পরিদর্শনে প্রতিশ্রুতি মিলেছে অনেক কিন্তু কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে অভিযোগ করেন শ্রমিক নেতৃবৃন্দরা। দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় জনবল সংকটও প্রকট। এখানে ৩ হাজার ১৪৫টি কর্মচারীর পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১ হাজার ৫৫০ জন। ২০১৭ সালের মধ্যে অবসরে যাবেন আরো ৫৪৯ জন। এছাড়া ১৫৬ জন কর্মকর্তা পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৭১ জন। অবস্থার উত্তরণে দ্রুত জনবল নিয়োগ, নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোসহ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানাটি আধুনিকায়নের সুপারিশ করে ডব্লিউবিবি ট্রাষ্ট।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপে কারখানার আধুনিকায়নসহ আরো তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এগুলো হলো- চট্টগ্রাম ব্রিজ কারখানা, ডিজেল কারখানা আধুনিকায়ন ও সৈয়দপুর রেল কারখানার অভ্যন্তরে নতুন ক্যারেজ কারখানা স্থাপন। ২০১৫ সালের মধ্যে ৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তিনটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এর বাইরে পরবর্তী তিন ধাপে আরো কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা এ প্রসঙ্গে বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ওয়ার্কশপগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। সেখানে মেরামত ছাড়াও নতুন কোচ ও ওয়াগন তৈরি হয়। অথচ আমাদের কারখানাগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। অবস্থার উন্নয়নে আধুনিকায়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে রেলের কোচ ও ওয়াগন মেরামত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
