বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেধাবী শিক্ষার্থী সায়াদ ইবনে মমতাজ নিহত হওয়ার পর তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এ ঘটনায় তিনি মামলা করবেন না। কারণ মামলা করে লাভ নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে খুনের ঘটনার বিচার হয় না। সায়াদের বাবা এমনি এমনি আক্ষেপ করেননি। গত ৪১ বছরে বাকৃবিতে ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর একটি ঘটনারও বিচার হয়নি।
সায়াদের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি মামলা করেছে। কিন্তু মামলায় কারো নাম উল্লেখ করেনি। অথচ তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছয় ছাত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছে। অভিযুক্ত দুই ছাত্রলীগ নেতা সুজয় কুমার কুন্ডু ও রোকনুজ্জামান বর্তমানে জেল হাজতে আছেন। তারাও জবানবন্দিতে ঘটনায় ১৪ জন জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠেছে, সায়াদের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে তো?
ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে বাকৃবি প্রতিষ্ঠা হলেও প্রথম হত্যাকাণ্ড হয় ১৯৭৩ সালে। কর্মচারী-শিক্ষক-ছাত্র সংঘর্ষে নিহত হয় একজন। টানা দশ বছর ক্যাম্পাস শান্ত থাকার পর ১৯৮৩ সালে ছাত্রদল নেতা এটিএম খালেদ নিহত হওয়ার জের ধরে খুন হন ছাত্রলীগ নেতা শওকত, ওয়ালী ও মহসিন। এরপর টেন্ডারবাজি, সিট দখল, বাজেট বন্টন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৯৯৩ সালে খুন হয় রেজাউর রহমান সুবজ। ১৯৯৪ সালে এক কর্মচারীর কলেজ পড়ুয়া ছেলে, ১৯৯৫ সালে আলাউদ্দিন, শওকত, কবির ও হাসান নামে চার শিবিরকর্মী এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুন হয় কামাল ও রঞ্জিত নামের দুই ছাত্রলীগ কর্মী। ২০০১ সালে খুন হয় ছাত্রদল নেতা হাসু। ২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারী বাকৃবি ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় পার্শ্ববর্তী বয়রা গ্রামের ১০ বছর বয়সী শিশু রাব্বী। গত কয়েক বছরে সংঘর্ষে আহত হয়েছে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী।
সর্বশেষ ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে দ্বন্দ্বে সহপাঠী ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের পিটুনিতে পহেলা এপ্রিল মারা যান সায়াদ ইবনে মমতাজ। এ ঘটনায় তার পরিবার কোন মামলা করেনি।
সায়াদের বড় ভাই মোয়াজ ইবনে মমতাজ বলেন ঘটনার সাথে যেহেতু বিশেষ মহল জড়িত তাই এ ঘটনার বিচার হবে না। তিনি আরো বলেন, আমি জানি তার বন্ধুরা তাকে হত্যা করেছে, আর তারা ছাত্রলীগ করে।
বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল হক বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এদিকে সায়াদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকলকে গ্রেফতার এবং আজীবনের জন্য তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবারও নবম দিনের মতো আন্দোলন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকলকে বহিষ্কার না করে মাত্র ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছে। এর মাধ্যমে প্রশাসন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেককেই বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সায়াদ হত্যায় অভিযুক্ত সুজয় ও রোকনের স্বীকারোক্তিতে ১৪ জনের নাম আসলেও শুধুমাত্র ৬ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। তাছাড়া আমাদের দাবি ছিল নাম উল্লেখ করে প্রশাসনকে মামলা করতে হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো তা করে নি। সায়াদ হত্যায় জড়িত অনেকেই এখনো ক্যাম্পাসে প্রক্যাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
