সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য কিভাবে অগ্রসর হওয়া যায় তা নির্ধারণ করতে এবার দলের তৃণমূল নেতাদের মতামত নিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের সবগুলো জেলা এবং থানা-পৌর নেতাদের সঙ্গে তিন ধাপে মতবিনিময় করবেন তিনি। প্রথম ধাপে ১৩ জেলা এবং ওই সব জেলার অন্তর্গত সকল থানা ও পৌর নেতাদের ঢাকায় ডেকে তার গুলশানের অফিসে বৈঠক করবেন। এই পর্ব চলবে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। অত:পর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ। জেলাগুলো হলো- পঞ্চগড়, নীলফামারী, নওগাঁ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ (উত্তর), চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, নড়াইল ও সাতক্ষীরা। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে দলের চেয়ারপার্সনের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের কোন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। অথচ তারাই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বেশি আন্দোলনমুখর ছিল। দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ব্যর্থতার পটভূমিতে মাঠ নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের এখন পরোয়া করেন না। সূত্র জানান, খালেদা জিয়া ১/১১-এ তার সেনানিবাসের বাসভবনে যখন অবরুদ্ধ ছিলেন তখন সব জেলা ও থানার নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সেল-ফোনে কথা বলতেন। তাদের মতামত চাইতেন। তারপর থেকে গত ৬ বছর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সেভাবে আর কোন যোগাযোগ নেই চেয়ারপার্সনের। চেয়ারপার্সনের গুলশান অফিসে এসেও তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করার কোন সুযোগ নেই তাদের। দেখা করতে চাইলে অনেক ‘ঘাট’ পেরিয়ে আসতে হয়।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, এই মতবিনিময়ের ভেতর দিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের সখ্যতা আরো দৃঢ় হবে। চেয়ারপার্সনকে তারা মতামত দিতে পারবেন কিভাবে আন্দোলনে দ্রুত সাফল্য আনা যায়। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে যারা ৫ জানুয়ারির আগে আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছেন তাদের বলার আছে অনেক কিছু। যা দলের হাই কমান্ডকে বলতে পারবেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দলকে শক্তিশালী করতে তাদের মতামত নেয়া হবে। আন্দোলনের ব্যাপারে তারা মতামত দিবেন। কিছু কিছু জেলায় কমিটি নিয়ে সমস্যা আছে। সেগুলোতে সংকট সমাধানের জন্য মতামত এবং ব্যবস্থা নেয়া হবে। দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বেগম জিয়া আপাতত দলকে সংগঠিত করার দিকে মনোযোগ দিতে চাচ্ছেন। সংগঠিত করেই আন্দোলনে নামবেন। তবে কিভাবে আবার নতুন করে রাজপথে ফিরবেন তা নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তিনি। তিনি চান মাঠ নেতাদের মতামত।
গতকাল রাতে বেগম জিয়া গুলশানে তার কার্যালয়ে উত্তরাঞ্চলের তিন জেলার নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। চেয়ারপার্সনের সঙ্গে মতবিনিময়ের আগে পঞ্চগড়, নীলফামারী ও সৈয়দপুর জেলার নেতাদের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অন্য যুগ্ম মহাসচিবদের নিয়ে বৈঠক করেন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ।
বিএনপির সঙ্গে পেশাজীবী
নেতাদের বাক-বিতণ্ডা
সরকার বিরোধী আন্দোলনে ধীর গতি ও ব্যর্থতা নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী সমর্থক পেশাজীবী নেতাদের বচসা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ (বিএসপিপি) আয়োজিত এক সমাবেশে এ ঘটনা ঘটে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আমার দেশ প্রকাশ, মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও বাক-স্বাধীনতা রক্ষার’ দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে লেখক ফরহাদ মজহার তার বক্তব্যে সরকার বিরোধী আন্দোলনে ধীর গতি ও ব্যর্থতা নিয়ে বিএনপির প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি নিজেদের অধিকার সম্পর্কেই জানে না। তিনি বলেন, ‘নাগরিকদের এজলাসে দাঁড় করে রেখে আদালত শাস্তি দিতে পারে না। এটা আদালতের অধিকারে নেই।’ একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ‘আদালত অবমাননা সম্পর্কেও বিএনপির কোনো অবস্থান নেই। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় বিএনপি বিলীন হয়ে যাবে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’
ফরহাদ মজহারের এ বক্তব্যের পর আলোচনায় আসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। তিনি তার বক্তব্যের শুরুতে বিএনপির বিলীন হওয়া প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্রই বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বক্তব্য চলাকালেই ফরহাদ মজহার বলে উঠেন, ‘আমাদের কেন ডেকেছেন? আমরা তো বিএনপি করি না। আমাদের উদ্দেশ্যে করে এসব বলছেন কেন?’ তার (ফরহাদ মজহারের) এ জিজ্ঞাসার জবাবে প্রধান অতিথি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আপনাদের কেন ডেকেছি...?’
এসময় পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অনুষ্ঠানের সভাপতি সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমীন গাজী সকলকে শান্ত হতে অনুরোধ জানান।
বাক-বিতণ্ডার শুরু হয় গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যর মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, ‘আপনারা শুধু আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা বলেন। বলেন, ঈদের পর আন্দোলনে যাবেন। এভাবে চললে আপনারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। এর মধ্যে জামায়াত-আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে চলে যাবে। রফিকুল ইসলাম মিয়া ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন, ‘ভারতকে যারা করিডোর দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি বিএনপির আছে।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘কী বলব? এখানে কিছু কথা হয়েছে। তবে এর জবাব আমি দেব না।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলে থাকেন, বিএনপির ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। বিএনপির যে জনপ্রিয়তা ছিলো তাতে তারা সরকার গঠন করতে পারতো। কিন্তু তাদের বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে উপজেলা নির্বাচনে। ফখরুল বলেন, ‘আমরা হতাশ নই। আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করছি। একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।
রুহুল আমীন গাজীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক পিয়াস করিম, প্রকৌশলী আনহ আখতার হোসেন, বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি ডা. এমএ আজীজ, ডা. রফিকুল ইসলাম রাজু প্রমুখ।
