সহিংসতায় নাইজেরিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:২৯
নাইজেরিয়ার লাগোস বিমানবন্দরে নামলেই একটি বিলবোর্ডে সবার চোখ আটকে যায়। এতে লেখা রয়েছে— পৃথিবীর সবচে’ সুখের স্থানে আপনাকে স্বাগতম। দুনিয়া সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা যাত্রীদের মনে প্রশ্ন জাগে, এখনো এই বিলবোর্ডটি টানিয়ে রাখার কোনোরকম যৌক্তিকতা কি আছে? এটিই স্বাভাবিক। ধর্মীয় সহিংসতায় নাইজেরিয়া ক্ষতবিক্ষত। হানাহানিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। আতংকে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে ওখানে সাবধানে চলাফেরা করার। মধ্যম আয়ের দেশ নাইজেরিয়া উপরে উঠে যাচ্ছিল তরতর করে। সে জায়গায় এখন ভাটার টান। বিশ্লেষকদের অভিমত, সাম্প্রদায়িক সংঘাত বন্ধ না করা গেলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নের সম্ভাবনা নেই। উত্তর নাইজেরিয়ার সর্ববৃহত্ শহর কানো। শিল্পের জন্য এ শহরটি বিশেষভাবে পরিচিত। আর এখানেই ধর্ম প্রচার করেন শেখ ইব্রাহিম খলিল। এ কাজে বিশেষ পারদর্শী তিনি। তবে ইসলাম প্রচারক হওয়া সত্ত্বেও কট্টরপন্থি তিনি নন। শান্তির ধর্মের নামে চলমান বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহকে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। নিজ সভাকক্ষে বসে প্রায়ই তিনি বিলাপের সুরে হানাহানির কুফল বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, ক্রমেই বেড়ে চলেছে মুসলিম-খ্রিস্টান সংঘাত। ৫৭ বছর বয়সী শেখ ইব্রাহিম খলিল স্মৃতিচারণ করেন এভাবে— এই পরিবর্তন কেন ঘটলো তা আমি জানি না। ২০ বছর আগেও মুসলমান ও খ্রিস্টানরা মিলেমিশে একত্রে বসবাস করতো। কিন্তু এখন এই দুই ধর্মের লোক প্রতিবেশী হওয়ার আগে হাজারবার ভাবে।’ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে কানো শহরের লোকজন বেশ সচ্ছল ছিল। কিন্তু সে অবস্থা হারিয়ে যেতে বসেছে; গ্রাস করছে দারিদ্র্য। ফলশ্রুতিতে শক্তিশালী হচ্ছে উগ্রপন্থি নেতাদের হাত। নাইজেরিয়া সম্পর্কে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। তাদের ধারণা বোকো হারাম নামক সংগঠনটির মাধ্যমে আল-কায়েদা নাইজেরিয়া থেকে প্রচুর সদস্য সংগ্রহ করছে। এমনিতেই জিহাদি গ্রুপগুলো উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় সক্রিয়, তার ওপর আফ্রিকার সবচে’ জনবহুল দেশটিও যদি ওই লাইনে ভিড়ে, তবে তা আমেরিকার জন্য অবশ্যই মাথাব্যথার কারণ। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিস্টান। মুসলিম বিদ্রোহের ইতিহাস অবশ্য দেশটিতে পুরনো। ১৯৮০’র দশকে মাইতাসিন আন্দোলনের নামে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো কানোসহ দেশের সর্বত্র। বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতায় চাকরি হারিয়ে কিংবা চাকরি না পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম। যে কারণে হতাশায় পড়ে তারা যোগ দিচ্ছে মুসলিম বিদ্রোহী গ্রুপে এবং হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র। দারিদ্র্যের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। অসচেতন মুসলমানরা এজন্য দায়ী করে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ খ্রিস্টানদের হাতে চলে যাওয়াকে। ১৯৮৭ সালে কানো শহরে নিবন্ধনকৃত ফ্যাক্টরির সংখ্যা ছিল ৩৫০টি। ২০১৩ সালে তা নেমে আসে ৬৫-তে। তথ্যটি জানিয়েছে নাইজেরিয়ার ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যাসোসিয়েশন। কানোর কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রভাষক বলছিলেন, ‘কাজ না পেয়ে তরুণরা রাস্তায় ঘুরে, গ্রাজুয়েটরাও কাজ খুঁজে পাচ্ছে না। যার পরিণতিতে তারা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে। সেই সুযোগটাই গ্রহণ করছে বিদ্রোহী নেতারা। বোকো হারাম নামক বিদ্রোহী গ্রুপ পশ্চিমা শিক্ষাকে বর্জন করে পুরো নাইজেরিয়ায় শরীয়া আইন চালু করতে চায়। তারা প্রায় প্রতিদিনই ঘটায় কোনো না কোনো সহিংস ঘটনা। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোয় অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছিলো ১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। সেখানে তখন চামড়ার স্যান্ডেল থেকে শুরু করে গাড়ির যন্ত্রাংশ পর্যন্ত উত্পন্ন হতো। কিন্তু অপকৃষ্ট পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখন উত্পাদন খরচ বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকহারে। এশিয়া থেকে আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে তাদের পণ্য কিছুতেই প্রতিযোগিতা করে পারছে না। উপরন্তু তেলের ওপর নির্ভরতা অন্যান্য ক্ষেত্রকে করে তুলেছে অবহেলিত। কানোর এক মহিলা জানান, নাইজেরিয়ায় তৈরি একটি সুতি র্যাপ (মহিলাদের ঢিলা বহির্বাস বিশেষ) কিনতে হলে গুনতে হয় ১৫০০ নাইরা (নাইজেরিয়ার মুদ্রা, ১৫০ নাইরা সমান ১ মার্কিন ডলার)। অথচ চীন থেকে আমদানি করা র্যাপ কেনা যায় মাত্র ৫৫০ নাইরা দিয়ে। স্বাভাবিক কারণেই নারীরা চীনা র্যাপ বেশি কিনে। সস্তার প্রতি সবার আকর্ষণ চিরন্তন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকায় ইয়েমেন ও সোমালিয়ার পাশাপাশি নাইজেরিয়ার নামটি যুক্ত করেছে। যদিও মুসলিম বিদ্রোহীরা বলছে যে, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদরাই তাদের একমাত্র টার্গেট, যারা সরকারি অর্থে চাকরি সৃষ্টি না করে নিজেরাই সে অর্থ বাগিয়ে নিচ্ছে। নাইজেরিয়ার ৩৬টি রাজ্যের মধ্যে উত্তরের ১২টি রাজ্যে শরীয়া আইন চালু করা হয় ২০০০ সালে। এর আসল উদ্দেশ্য ভোটের ব্যাপারে সুবিধা নেয়া, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নয়। কানোর ধূলিময় রাস্তায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রায়ই মিছিল হয়; মিছিল শেষে মার্কিন-বিরোধী জ্বালাময়ী বক্তৃতাও দেয়া হয়। কিন্তু কেউই নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যা দূরীকরণের উপায় নিয়ে কোনো কথা বলেন না। নাইজেরিয়ার উঠে দাঁড়ানোর রাস্তাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সংঘাতের লাগাম টেনে না ধরলে ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। সম্ভবত সেদিকেই এগুচ্ছে তেলসমৃদ্ধ নাইজেরিয়া। ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস অনুসরণে