পেটের পীড়া আমাশয়

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২০:২৫
একজন শিক্ষক, বয়স পঞ্চাশ, উদ্বিগ্ন মনে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছেন। কয়েকদিন যাবত্ তার পেটটা ভাল যাচ্ছে না। এর আগেও তার পাতলা পায়খানার সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এবার তিনি লক্ষ্য করেছেন- পায়খানার সাথে লাল লাল রক্ত যাচ্ছে। তাই তিনি চিন্তিত মনে তার সমস্যা নির্ণয়ের চেষ্টায় চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয়েছেন। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বয়স চব্বিসের কাছাকাছি হবে। কয়েক মাস ধরে তার পেটে সমস্যা হচ্ছে। দিনে দুই থেকে তিনবার পায়খানা হয়, প্রত্যেকবার পায়খানার আগে পেটটা মোচড় দিয়ে ব্যথা হয়, পায়খানা হয়ে গেলে ব্যথা কমে যায়। পেটে শব্দ হয় এবং পায়খানা কিছুদিন পাতলা হয়, আবার কিছুদিন ভাল থাকে। পায়খানার সাথে আম যায়। এমতাবস্থায় দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হওয়ায় একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নিকট পরামর্শের জন্য এসেছেন। দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহের সমস্যায় ভুগছেন চল্লিশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। নিয়মিত চিকিত্সকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করে যাচ্ছেন। কয়েক মাস হল তার পায়খানা পাতলা হতে শুরু করেছে। কিছুদিন ভাল থাকে, কিছুদিন পাতলা হয়, কিছুদিন কষা হয়। পায়খানার সাথে আম যায়। পেটে খুবই সমস্যা মনে হতে থাকে। তাই উদ্বিগ্ন মন নিয়ে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের অপেক্ষায় আছেন। একজন শিল্পপতি। বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই করছে। তিন মাসের বেশী সময় ধরে তার পায়খানার সাথে রক্ত যাচ্ছে। প্রথমবার যখন পায়খানা লালচে হতে শুরু করলো ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সা নিয়ে ভালো হয়ে গিয়েছিল। গত কয়েকদিন যাবত্ তার পায়খানার সাথে আবারও রক্ত যেতে শুরু করেছে, সাথে আম যাচ্ছে। এবার তার গায়ে জ্বর, খাওয়ার রুচিও কমে গেছে। তিনি লক্ষ্য করছেন গত কয়েকমাস ধরে তার ওজনও কমে যাচ্ছে। তদুপরি এর আগে তার ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ধরা পড়েছে। তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সার উদ্দেশ্যে। আমাশয় উপরের যে চিত্রগুলো দেয়া হয়েছে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছবি হয়তো। পেটের অসুখ তথা পাতলা পায়খানা হয়নি এরকম একজন ব্যক্তি পুরো পৃথিবীতে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। পুরো পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ পাতলা পায়খানার সমস্যা নিয়ে চিকিত্সা গ্রহণ করেন। পায়খানার ধরনের উপর ভিত্তি করে পাতলা পায়খানার সমস্যা কয়েক রকম হতে পারে। পানির মত পাতলা, আমযুক্ত পাতলা এবং রক্তসহ পাতলা। আমযুক্ত যে পাতলা পায়খানার সমস্যা হয় তাকে আমাশয় বলে। বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবীর মানুষের একটি সাধারণ সমস্যা হলো আমাশয়। আক্রান্ত রোগীরা ডাক্তারের কাছে যে সকল সমস্যা নিয়ে হাজির হয়, তার মধ্যে আছে আমযুক্ত পায়খানা, কারও আবার পায়খানার সাথে রক্ত আসে। অধিকাংশই পেটে ব্যথা বা খারাপ লাগার কথা বলে। কেউ কেউ সাথে বমি বমি ভাব, বমি, খাওয়ার অরুচি কমে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার কথা বলেন। কারও সমস্যা এক সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় না আবার কারও সমস্যা মাস পেরিয়ে যায়। কারও কয়েক বছরে হঠাত্ দু’একবার এ সমস্যা হয়, কারও মাসে একবার পেট খারাপ হয়। পেট খারাপ থাকার সময়কালের উপর ভিত্তি করে আমাশয়কে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন- ১. স্বল্পমেয়াদী ২. দীর্ঘমেয়াদী। স্বল্পমেয়াদী আমাশয় বলতে বুঝায়, এক সপ্তাহের কম সময় ধরে আমাশয় থাকা। স্বল্পমেয়াদী আমাশয়ের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি কারণ হলো: ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয় এবং অ্যামিবা জনিত আমাশয়। এছাড়াও কিছু কিছু দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের কারণ আছে যেগুলো মাঝে মাঝে স্বল্পমেয়াদী সমস্যা নিয়ে উপস্থিত হয়। দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় হল-যে আমাশয় চার সপ্তাহের বেশী সময় ধরে হচ্ছে। এ ধরনের আমাশয়ের অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো: ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) এবং ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল ডিজিজ (আই বিডি)। আইবিডি-র মধ্যে আবার আছে ক্রনস ডিজিজ এবং আলসারেটিভ কোলাইটিস। স্বল্পমেয়াদী আমাশয় অল্প সময়ের চিকিত্সা নিয়ে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় হলে দীর্ঘদিন চিকিত্সা নিতে হয় এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, পুরোপুরি ভালো হয় না। ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয় সাধারণত যে ব্যাকটেরিয়া দ্ব্বারা আমাশয় বেশী হয় তার নাম Shigella (সিগেলা)। সিগেলার চারটি প্রজাতির মধ্যে Shigella flexneri দিয়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আমাশয় বেশী হয়। এটি আধোয়া হাত দিয়ে সবচেয়ে বেশী ছড়ায়, তবে দূষিত মাছি ও খাবারের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির পেট খারাপ হওয়ার পাশাপাশি পেটে ব্যথা হয়, পায়খানার রাস্তায় ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও রোগীর জ্বর হয়, পানিশূন্যতা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। প্রথমে পায়খানার সাথে রক্ত ও আম যায়, পরে শুধু রক্ত ও আম যেতে থাকে। অনেক সময় সিগেলার আমাশয়ের পাশাপাশি চোখের আইরিস ও গিরায় প্রদাহ হয়ে ‘রিটারস সিনড্রোম’ নামক রোগ হতে পারে। যে কোন আমাশয় ও ডায়রিয়া জনিত রোগের প্রথম চিকিত্সা হলো স্যালাইন সেবন করা। প্রতিবার পায়খানার পর এক গ্লাস মুখে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়া উচিত্। তবে অনেক সময় শরীরের পানি বেশী বেরিয়ে গেলে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় স্যালাইন দেয়া লাগতে পারে। সিগেলা প্রজাতির আমাশয়তে ডাক্তারের পরামর্শমত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ পুরোপুরি সেরে যায়। তবে আমাদের জন্য উদ্ব্বেগের বিষয় হল, অনেক রোগী নিয়মমত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার না করায় সিগেলা ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন এন্টিবায়োটিকের বিপরীতে রেজিস্টেন্স তৈরী করে ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে সিগেলা আমাশয় আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা করা দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই রোগীদের উচিত্ এন্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধ ঠিকভাবে সেবন করা। সিগেলা ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও আরো যে ব্যাকটেরিয়া দ্ব্বারা আমাশয় হয় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: Campylobacter jejuni, Escherichia coli(entero-invasive) এবং Salmonella. প্রতিটি ক্ষেত্রেই রোগের লক্ষণগুলো সিগেলা আমাশয়ের মত এবং চিকিত্সাও কাছাকাছি। অ্যামিবাজনিত আমাশয় অ্যামিবাজনিত আমাশয় হয় অ্যান্টামিবা হিসট্রোলাইটিকা নামক এককোষী জীব দিয়ে। এটির জীবনচক্রে দুটো দশা আছে: ট্রফোজয়েট এবং সিস্ট। ট্রফোজয়েট মূল রোগের কার্যকারণগুলো ঘটায়, তবে এটি ছড়ায় সিস্ট দিয়ে। মানুষের মল দ্ব্বারা দূষিত পানি এবং কাঁচা (অর্থাত্ রান্না করা হয়নি এমন) অপরিস্কার শাকসবজি ও অন্যান্য খাবার দিয়ে এটি মানুষের অন্ত্রে প্রবেশ করে। এছাড়াও শারীরিক মিলনের মাধ্যমেও এক দেহ থেকে আরেক দেহে ছড়াতে পারে। অ্যান্টামিবা আমাদের বৃহদান্ত্রে প্রবেশের পর সিস্ট ভেঙ্গে ট্রফোজয়েটে পরিণত হয়। আমাদের অন্ত্রনালী পেয়াজের লেয়ারের মত চারটি লেয়ার দিয়ে গঠিত নালী। এর মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের দিকে সারিবদ্ধ কোষগুলো যে লেয়ার বা স্তর গঠন করে তার নাম মিউকসা। অ্যান্টামিবার ট্রফোজয়েট এই মিউকসাকে আক্রান্ত করে। ফলে পাতলা পায়খানা হয়। পায়খানার সাথে রক্ত ও মিউকাস তথা আমও যেতে পারে। এ রোগেও পেটে ব্যথা হয়। বিশেষ করে তলপেটের ডানদিকে ব্যথা হতে পারে। ফলে এপেনডিসাইটিসের ব্যথা মনে হতে পারে। অ্যান্টামিবার একটি খারাপ প্রকৃতি হল এটি সিস্ট থেকে মুক্ত হয়ে ট্রফোজয়েট আকারে মানুষের অন্ত্র থেকে ‘পোর্টাল ভেইন’ নামক শিরার মাধ্যমে লিভারে প্রবেশ করতে পারে। লিভারে প্রবেশ করে এটি লিভারের কোষগুলোকে খেয়ে ফেলতে থাকে। এমতবস্থায় এর বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোষগুলোর যুদ্ধ করতে নামলে, লিভারে পুঁজ তৈরী হয়। একে বলে লিভার অ্যাবসেস। লিভারের অ্যাবসেস হলে লিভারে প্রদাহ হয়ে লিভার বড় হয়ে যায়, উপরের পেটে ডানদিকে ব্যথা হতে পারে এবং সাথে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর হয়। লিভারের ঠিক উপরেই যেহেতু আমাদের ফুসফুস থাকে, লিভার এবসেস বার্স্ট হয়ে ফুসফুসে ঢুকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কাশি হয় এবং বক্ষপিঞ্জের ডানদিকের নিচে ব্যথা হতে পারে। এছাড়া ফুসফুস যে থলি দিয়ে ঘেরা থাকে অর্থাত্ প্লুরাল ক্যাভিটিতেও এই পূঁজ জমা হতে পারে। লিভারের এবসেস বার্স্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা একটি ইমার্জেন্সি সমস্যা এবং হাসপাতালে দ্রুত নেয়ার দরকার পড়ে। অ্যামিবাজনিত আমাশয় মেট্রোনিডাজল দিয়ে পাঁচ থেকে দশ দিনের চিকিত্সায় ভালো হয়ে যায়। কিন্তু অ্যামিবাজনিত আমাশয় থেকে লিভার অ্যাবসেস হয়ে গেলে সুঁ্ই দিয়ে পূঁজ বের করাসহ, দুই থেকে তিন প্রকারের ওষুধ সেবন করে ভালো করতে হয়। এতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে। (চলবে) লেখক:পরিচালক দি লিভার সেন্টার, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ