প্রত্যেক জাতিরই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান আছে যা তাদের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। সেসব অনুষ্ঠান তারা পালন করে সার্বজনীন উত্সব হিসেবে। শুনতে খটকা লাগলেও সত্যি যে সব জনগোষ্ঠীর যেমন নিজস্ব ভাষা বা বর্ণমালা নেই—তেমনি বহু জনগোষ্ঠীর নেই নিজস্ব বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার। এমন যে প্রভাবশালী বৃটিশ জাতি—যাদের রাজ্যে এককালে সূর্য অস্ত যেতো না বলে প্রচলিত ছিল তাদেরও নিজস্ব বর্ণমালা নেই। তারা রোমান হরফ ধার করেছে বর্ণমালা তৈরিতে। ইংরেজদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি নেই—তারা ব্যবহার করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার।
আমরা গর্ব করে বলতে পারি—আমরা সেই ভাগ্যবান জাতি; আমাদের আছে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি, বাংলা সন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কোনো বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণত তৈরি হয়েছে সন ব্যবস্থাপনা। যেমন ইশা (আ) স্মরণে ঈশায়ী সন আবার হজরত মুহাম্মাদ (স)-এর হিজরত উপলক্ষে হিজরি সন। এর আগে আবিসিনিয়ার আবরাহার হস্তিবাহিনী ধ্বংস হবার পর চালু হয়েছিল হস্তি সন। আবার সাধারণ মানুষ বিশেষ কোনো ঘটনাকে উল্লেখ করেও সন তারিখ বলে থাকেন—যেমন বানের বছর, আকালের বছর, স্বাধীনতার বছর ইত্যাদি।
তবে আমাদের বাংলা সনের রয়েছে ক্রমবির্তনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ঈশায়ী এবং হিজরি দুটি আন্তর্জাতিক সনকে সম্পৃক্ত করে সমৃদ্ধ করা হয়েছে এই সনকে। এবং তা একদিনে হয়নি—হয়েছে যুগ যুগের সাধনায়। ‘সন’ ‘সাল’ বা ‘তারিখ’ স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা সনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পৃক্ততা। কেননা ‘সন’ ‘তারিখ’ আরবি শব্দ আর ‘সাল’ ফার্সি শব্দ।
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর এদেশে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির মতো বাংলা সন বা সালও পায় তাদের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা। তখন অবশ্য বাংলা সন নির্দিষ্ট অবয়ব পায়নি। সমগ্র ভূখণ্ডে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী প্রায় ৩০টির মতো সন ব্যবহার করতো।
স্বাধীন সুলতানী আমলের পর মোঘল আমলে এসে দেখা গেলো যে এসব দিনপঞ্জি ব্যবহারে খাজনা আদায়ে অসুবিধা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলা মুলুকে। এই অসুবিধা দূর করতে মহামতি সম্রাট আকবর নির্দেশ দিলেন বাংলা ভূখণ্ডের জন্য স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জি তৈরির। রাজদরবারের মহাপণ্ডিত আমীর ফতেহ উল্লাহ শিরাজীকে দেওয়া হলো এই গুরুদায়িত্ব। শুধু যে খাজনা আদায়ে কষ্ট হচ্ছিল তাই নয়—চন্দ্রমাস ভিত্তিক সন ব্যবস্থায় বছরে ১০/১১ দিনের হেরফের ঘটে। তাতে প্রতি বছরই সন তারিখের হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়। আমীর ফতেহ উল্লাহ শুধু ফসলি সনের কথাই বিবেচনা করলেন না—তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং রাজা থেকে রাজন্যবর্গ, হিন্দু-মুসলমান প্রজা সবাই যাতে সন্তুষ্ট থাকেন সেদিকটিও স্মরণে রাখলেন। তিনি সম্রাটকে খুশি করার জন্য আকবরের সিংহাসন আরোহনের বছর অর্থাত্ ৯৬৩ হিজরিকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরে সন প্রবর্তনে অগ্রসর হলেন। আমীর ফতেহ উল্লাহ চন্দ্র সনের পরিবর্তে সৌর সনের প্রবর্তন করলেন হিজরি সনকে বাংলা সনে রূপান্তর করে। যেটি রাজদরবারের কাজে ব্যবহূত হলো ফসলি সনে আর পরবর্তী সময়ে এটিকেই আমরা পেলাম বাংলাদেশের বাংলা সন হিসাবে।
হিসেব করে দেখা গেছে আকবরের ফসলি সন যখন চালু হয় তখন সুবে বাংলায় মহররমে ছিল বৈশাখ মাস। সে কারণে এখানে নতুন সনের প্রথম মাস ধরা হলো বৈশাখকে। প্রচলিত শকাব্দ সনে নববর্ষ হতো চৈত্র মাসে—বৈশাখ ছিল শকাব্দের দ্বিতীয় মাস। রাজার আদেশে পহেলা বৈশাখ হলো নববর্ষ। এতেও দেখা দিলো কিছু ক্রুটি-বিচ্যুতি—ব্যবহারের জটিলতা। আবার প্রয়োজন পড়লো সংস্কারের।
এবার সংস্কার বা সংশোধনীর দায়িত্ব নিলো দেশ ও জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমী। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে সভাপতি করে গঠিত হলো বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি। ড. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা পঞ্জিকার কিছু কিছু সংস্কার করা হয়। অবশ্য কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল যে মোঘল আমলে বাদশা আকবরের সময় হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে যে বঙ্গাব্দ প্রচলন করা হয়েছিল তা থেকে বছর গণনা করতে হবে।
বাংলা সনের মাসগুলো যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের হিসাবে গোনা যায় সে লক্ষ্যে প্রথম মাস বৈশাখ থেকে পঞ্চম মাস ভাদ্র পর্যন্ত প্রত্যেক মাস ৩১ দিনে হবে এবং ষষ্ঠ মাস আশ্বিন থেকে দ্বাদশ মাস চৈত্র পর্যন্ত প্রত্যেক মাস ৩০ দিনে হবার কথা বলা হয়। লিপইয়ার বা ‘অধিবর্ষ’-এ চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে। এটাও সিদ্ধান্ত হয় যে ৪ দিয়ে যে সন বিভাজ্য সেই সনকে গণ্য করতে হবে লিপইয়ার বা অধিবর্ষ রূপে। এতেও কিন্তু সমস্যার সমাধান পুরোপুরি হয়নি।
আমাদের অতি গর্বের অতি অহংকারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাংলা মাসের ৮ ফাল্গুন হিসাবে পালন করা যাচ্ছে না। কখনো একুশে ফেব্রুয়ারি পড়ে ৮ ফাল্গুন, কখনো বা ৯ ফাল্গুন। এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই আমাদের বের করতে হবে। আমরা কিন্তু থেমে নেই—প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যদি ফাল্গুনকে ২৯ দিনে গণনা করা যায় তা হলে একুশের ভাষা দিবস ৮ ফাল্গুন হবে বরাবর। এ ব্যাপারে আরো চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক তারিখ নির্ধারিত হোক—এ কামনা সবার। কেননা এক একটি দিন—এক একটি সন—এক এক জাতির জন্য বিশেষ তাত্পর্যবহ। এই যে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত নববর্ষ এটা কি শুধুই একটা দিন মাত্র? নিশ্চয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। প্রাণের আনন্দ স্রোত।
দুর্ভাগ্যই বলতে হয় আমরা আমাদের বর্ষপঞ্জি ব্যবহারে সচেতন নই। এটা ইংরেজ আমলের প্রভাবে শিক্ষিত সমাজ থেকে একটু সরে গেছে। আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য আজো এটি স্বাভাবিক ব্যবহারে আসছে না। তবে যে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা সেই গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনাচার, কৃষিকাজ, বিয়ে-শাদি, সামাজিক ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান বাংলা সনের তারিখ অনুসরণ করেই পালন করেন। শহরবাসী যে একেবারে ভুলে থাকে তা বলা ঠিক হবে না। শিক্ষিত বাঙালির বাংলা সনের সব তারিখ মনে না রাখলেও পহেলা বৈশাখ, ৮ ফাল্গুন, পহেলা আষাঢ়, পৌষ উত্সব, বসন্ত উত্সবের তারিখ ঠিকই স্মরণ করেন।
আমাদের বাংলা সন—আমাদের ঐতিহ্য—এটা আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবো সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে—এটাই প্রত্যাশা। শুভ নববর্ষ।
ঢাকা
