ভোলার শাহবাজপুর সরকারি কলেজ। এখানে শিক্ষকের পদ ২৯টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। শিক্ষার্থীরা রসায়ন পড়ছেন। অথচ ৭ বছর ধরে এ বিষয়ে কোন শিক্ষক নেই। এছাড়া পদার্থ, গণিত, মার্কেটিং ও ইতিহাস বিষয়েও কোনো শিক্ষক নেই। অর্থনীতি ও একাউন্টিংয়ে একজন করে শিক্ষক থাকলেও অতিসমপ্রতি তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ বলে ‘সংযুক্তি’ নিয়ে বরিশাল বি এম কলেজে রয়েছেন। ফলে শিক্ষক না থাকা বিষয়ের তালিকায় এ দুটি বিষয়ও যোগ হলো। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের জোর তদবিরে ইসলামের ইতিহাসের একজন শিক্ষকও বদলি হয়ে চলে গেছেন। এক সময় এ প্রতিষ্ঠানটিতে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক না থাকায় বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ৫২টি। কিন্তু কর্মরত আছেন ১৫ জন। এখানে অর্থনীতি, তথ্য প্রযুক্তি, গণিত বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই।
ফেনীর পরশুরাম সরকারি কলেজে শিক্ষকের পদ ২১টি। কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। একইভাবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সরকারি কলেজে ৪৮ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৪ জন। যারা আছেন তারাও নিয়মিত কলেজে আসছেন না। সমপ্রতি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে একজন শিক্ষক বদলি হয়ে গেছেন। পঞ্চগড় সরকারি কলেজে ৬১ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪০ জন শিক্ষক। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে শিক্ষকের ৪৬ পদের বিপরীতে রয়েছেন ২৫ জন। ইংরেজি বিষয়ে একজন শিক্ষকও নেই। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজে ৪২ শিক্ষকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ২২ জন। বলতে গেলে পুরো বাংলাদেশেরই মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষকের খরার একই চিত্র।
দৃষ্টি দেয়া যাক রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত কলেজগুলোর দিকে। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে মূল পদের বাইরে সংযুক্ত আছেন অতিরিক্ত ২৮ জন শিক্ষক। উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন ৮ জন করে। রাজধানীর সরকারি তিতুমির কলেজে পদের বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন প্রায় একশজন। সরকারি বাঙলা কলেজে ১২৫ সৃষ্ট পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ১৬৭ জন। আর সরকারি কবি নজরুল কলেজে ৮৪ শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ১০৯ জন। এভাবে রাজধানীর সরকারি ১২টি কলেজে অন্তত ৫০০ শিক্ষক অতিরিক্ত রয়েছেন। ঢাকার বাইরে বরিশাল বিএম কলেজে গ্রামের কলেজগুলো থেকে সংযুক্ত আছেন ২০ জন শিক্ষক। অন্য বিভাগীয় শহরগুলোয় অবস্থিত বেশিরভাগ সরকারি কলেজেই কর্মরত রয়েছেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক।
শিক্ষক থাকা না থাকার এই আকাশ-পাতাল ফারাকই বলে দিচ্ছে শহর ও গ্রামের কলেজগুলোর পড়াশোনার মান বা পড়াশোনার সুবিধার ব্যবধানের কথা।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষক না থাকায় গ্রামের সরকারি কলেজগুলোতে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। এমনও দেখা গেছে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয় পড়াচ্ছেন! ফলে ওই সব কলেজে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। শিক্ষক না থাকায় গ্রামের কলেজগুলোতে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও নেই বললেই চলে।
গ্রামের কলেজে শিক্ষক না থাকার জন্য অধ্যক্ষরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই দায়ী করছেন। তারা বলছেন, কলেজে শিক্ষক কতজন আছে বা আদৌ আছে কিনা—তা না জেনেই এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে শিক্ষকদের বদলি করে মন্ত্রণালয়। অধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, একজন শিক্ষকের যখন কোনো কলেজে থাকতে অনীহা তৈরি হয়, তখন তিনি তদ্বির করে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনে ওএসডি হন। একই সঙ্গে এই শিক্ষককে একটি কলেজে ‘সংযুক্ত’ রাখা হয়। তিনি বেতন নেন মাউশি থেকে, সংযুক্ত থাকেন তার পছন্দের কোন কলেজে। মন্ত্রণালয় থেকে সেভাবেই আদেশটি করিয়ে নেন তিনি। কোন কলেজে শিক্ষক সংকট থাকলে অন্য কলেজ থেকে সংযুক্তি করে নিয়ে সেই কলেজে আসার এই ভাল উদ্যোগটির এখন অপব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে এই ‘সংযুক্তি’ কলেজ শিক্ষায় বড় বিপর্যয় নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন কলেজ অধ্যক্ষরা। বর্তমানে সরকারি কলেজগুলোতে তিন হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য। বিভাগীয় শহরে পদের বেশি শিক্ষক থাকায় গ্রামের কলেজে শিক্ষক সংকট আরো বেশি। প্রভাষক পদের ক্ষেত্রে সংকট সবচেয়ে বেশি।
ভোলার শাহবাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রব বলেন, অনেক কষ্ট করেও শিক্ষকদের ধরে রাখতে পারি না। শিক্ষকরা গ্রামের কলেজগুলোতে থাকতে চান না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অযুহাত তুলে ঢাকা বা বিভাগীয় শহরগুলোতে চলে যাচ্ছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার মান ধরে রাখা যাচ্ছে না। আর উপাধ্যক্ষ গোলাম জাকারিয়া একই সুরে বলেছেন, ‘বিষয়টি আমরা শিক্ষা সচিবকে জানিয়েছি। তিনি বিস্মিত হয়েছেন।’
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবব্রত দাসগুপ্ত বলেন, ‘শুধু শিক্ষক নয়, অফিসের কর্মচারীও নেই। শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম কষ্ট করে চালাতে হয়।’ সাতকানিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বদি রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, কর্তৃপক্ষই তো এখান থেকে শিক্ষক নিয়ে যান। ফলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চালাতে হয় শিক্ষা কার্যক্রম।
পঞ্চগড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কানাই লাল কুণ্ড বলেন, শিক্ষক না থাকায় নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। শিক্ষকরা কেউ গ্রামে থাকতে চায় না। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (পিআরএল) সমীর চন্দ্র সাহা বলেন, ‘দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। কখনো ঢাকা শহরে চাকরি করার সুযোগ হয়নি। অথচ অনেকে চাকরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় থাকেন।’ তিনি বলেন, ‘এই কলেজে ইংরেজি ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ১ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষক নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’ তিনি জানান, ঢাকায় একটি বিষয়ে কোনো কোনো কলেজে ১২ থেকে ২০ জন পর্যন্ত শিক্ষক থাকার নজির আছে। অথচ গ্রামের কলেজে কোন কোন বিভাগে একজনও শিক্ষক নেই।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক রামদুলাল রায় বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ‘সংযুক্তি’ নিয়ে ২৮ জন শিক্ষক এসেছেন। তারা ঠিকমতো ক্লাস করেন কিনা তারও জবাব নেয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, গ্রামের কলেজগুলো খালি করে শিক্ষকরা ঢাকায় এসেছেন। এটা ঠিক হয়নি। গ্রামের শিক্ষকরা বিভাগীয় শহরে আসার কারণে গ্রামের শিক্ষার মান নিচে নেমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বরিশাল বিএম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফজলুল হক বলেন, শিক্ষকদের গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রবনতা কমানো দরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সূত্রমতে, সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে ২৭০টি কলেজ, চারটি আলিয়া মাদ্রাসা, ১৬টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট ও ১৪টি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ (টিটিসি) আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সৃষ্ট পদ আছে ১৪ হাজার ৮৭৬টি। এর মধ্যে প্রভাষকের সাত হাজার ৫৩৯টি পদের মধ্যে দুই হাজার ২৮৯টি শূন্য। এছাড়া সহকারী অধ্যাপকের চার হাজার ১২৭টি পদের মধ্যে ৪৮৯টি, সহযোগী অধ্যাপকের দুই হাজার ৩৯৪টি পদের মধ্যে ২৯১টি এবং অধ্যাপকের ৮১৬টি পদের মধ্যে ৭৬টি পদ শূন্য।
