অসংসদীয় শব্দের বহুল ব্যবহার, নবীনরা লজ্জিত

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫৩
নানা কারণেই আলোচিত এবারের দশম জাতীয় সংসদ। তবে সব আলোচনাকে ছাড়িয়ে গেছে এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে অসংসদীয় শব্দের নির্বিঘ্ন ব্যবহার। ২৯ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৩৬ কার্য দিবসের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া এই অধিবেশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু অসংসদীয় শব্দের প্রয়োগই নয়, অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ-অশ্রাব্য-আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার হয়েছে অহরহ। ‘তুই’ ‘বেয়াদব’ ‘পাগল’ ‘শয়তান’ ‘খুনি’ ‘চোর’ ‘মীরজাফর’ ‘মধুর নির্যাতন’ ‘অন্য নারীরা তা গুণেও শেষ করতে পারবেন না’ ‘লেডি লাদেন’-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা করতে গিয়ে এরকম শব্দ প্রয়োগ করেছেন সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ। এমনকি সংসদে অনুপস্থিত বড় একটি দলের প্রধানের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ও জীবনাচরণ নিয়েও ব্যঙ্গোক্তি হয়েছে। নবমসহ এর আগের সংসদগুলোতেও কমবেশি অংসদীয় শব্দের ব্যবহার হয়েছে। তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করতেন অপেক্ষাকৃত তরুণ বা নবীণ সদস্যরা। তবে এবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিলেন জ্যেষ্ঠরা। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ২৭০ এর ৬ উপ-বিধিতে বলা আছে ‘কোনো সদস্য সংসদে আক্রমণাত্মক, কটূ বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করিবেন না।’ একাধিকবার কিংবা দীর্ঘদিন যারা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অনেকে জেনেও এই ২৭০ বিধির তোয়াক্কা করেননি। পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে কিংবা সংসদে দেয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর রাখা বক্তব্যে কয়েকজন সদস্য বারবারই অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন। বৃহস্পতিবার অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারি অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেয়া ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর এবার ৫৬ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। অধিবেশনটির প্রথম থেকে শেষদিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণকারী একাধিক সংসদ সদস্য ইত্তেফাকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা হলেও আলোচকরা সিংহভাগ সময় ব্যয় করেছেন দলের শীর্ষ নেতা-নেত্রী ও আদর্শিক নেতার স্তুতি এবং বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনায়। বিশেষ করে, নির্বাচনে না গিয়ে সংসদে না থাকলেও অধিবেশনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন, তার জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং বিএনপি-জামায়াত। কখনও কখনও সমালোচনায় উঠে এসেছে বিদেশি কয়েকটি রাষ্ট্র ও কয়েকজন কূটনীতিকও। ‘বর্তমান সংসদে বিরোধী দল নেই’- এই বক্তব্যের জন্য সংসদে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে টিআইবি। অথচ কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদে অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি, সংসদে যার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে কোনো বক্তব্য রাখা যায় না। কুমিল্লার একটি আসন থেকে পরপর দু’বার নির্বাচিত আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য, যিনি চলতি সংসদের একটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা ছাড়া তো গঠনমূলক কিছু দেখলাম না। আমরা নিজেরাই তো সংসদের ও দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছি।’ অন্য একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য বলেন, কার্যপ্রণালী বিধি ৩০৭ অনুযায়ী ‘স্পিকার যদি মনে করেন - বিতর্কে বা আলোচনায় এমন সকল শব্দ ব্যবহূত হইয়াছে, যাহা অবমাননাকর বা অশোভন বা সংসদ রীতি বিরোধী বা অমর্যাদাকর, তাহা হইলে তিনি নিজ ক্ষমতাবলে অনুরূপ শব্দাবলীকে সংসদের কার্যপ্রবাহ হইতে বাতিল করিতে পারিবেন।’ এই সদস্যের মতে, এবার শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় অসংসদীয় শব্দগুলোকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেননি। যার কারণে এগুলোর অবাধ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে।