বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় ট্রাজেডি হিলসব্রোর ঘটনার ২৫ বছর পূর্তিতে ইংলিশ ফুটবল বিপুল শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেইসব নিহতদের। ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিলে শেফিল্ড ওয়েডনেসডে ক্লাবের হিলসব্রো স্টেডিয়ামে ৯৬ জন লিভারপুল সমর্থক প্রাণ হারিয়েছিল। আহত হয়েছিল ৭৬৬ জন।
লিভারপুল আজ ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামবে হিলসব্রো ট্রাজেডির শিকার ভক্তদের কথা মাথায় রেখেই। গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত প্রিমিয়ার খেলাগুলোতেও নিহত ফুটবলামোদীদের স্মরণ করা হয়েছে শ্রদ্ধাভরে। অ্যানফিল্ডে আজকের লিভারপুলের ম্যাচটিতে তাদের স্মরণে বাজানো হবে রেডসদের থিম সং ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন।’ দু’দলের সাবেক খেলোয়াড়রা ফুলের তোড়া বিনিময় করবেন। এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে সেই ভক্তদের কথা স্মরণ করে।
পয়েন্ট টেবিল বিবেচনায় সিটি-লিভারপুলের এই ম্যাচকে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা নির্ধারণী বলেই বিবেচনা করা যায়। কিন্তু, স্বাগতিক কোচ ব্রেন্ডন রজার্স জানিয়ে দিলেন ফলাফল নয়, আজকের ম্যাচের পুরোটা জুড়েই আছেন সেই সব রেডস ভক্তরা, ‘কোন সাফল্যই সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগাতে যথেষ্ট নয়। যেদিন আমি এই দলে ম্যানেজার হিসাবে যোগ দিলাম সেদিন থেকেই জানতাম, দূর আকাশে ৯৬ জন মানুষ সবসময়ই এই দলটাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা যদি কোন সাফল্য পাই, সেই সময়েও তারা আমাদের মনেই থাকবেন।’
আসলে কি ঘটেছিল সেদিন? কেন ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল লিভারপুল ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের এফএ কাপ সেমিফাইনালের নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসাবে বেছে নেয়া হিলসব্রো স্টেডিয়ামে এতগুলো মানুষকে বলি দিতে হয়েছিল। ইতিহাসের পাতা ঘেটে জানা যায়, দু’দলের বিপুল সমর্থক এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে স্টেডিয়ামকে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল দুটো আলাদা অংশে। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই লিভারপুল সমর্থকরা দল বেঁধে এগোতে শুরু করেন তাদের জন্য নির্ধারিত লেপলিংস লেন স্ট্যান্ডের দিকে। কিন্তু, এই স্ট্যান্ডে প্রবেশের একটি মাত্র পথ থাকায় ক্রমেই বাড়ছে ভিড়। ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। প্রিয় দলের ম্যাচ দেখতে প্রচুর মানুষ তখনও দাঁড়িয়ে বাইরে। ভিড় আর সামাল দিতে না পেরে ম্যাচের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা তার এক সহকর্মীকে নির্দেশ দিলেন আর একটি প্রবেশ পথ খুলে দিতে। অন্য সময় গুলোতে বন্ধই থাকতো এটা। তবে সমস্যা হলো, এই পথ দিয়ে স্টেডিয়ামের যে অংশে যাওয়া যেত, গ্যালারির ঐ অংশগুলো পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল আগেই। কিন্তু, ঐ পথ দিয়ে যারা ভিতরে ঢুকছেন তাদের তো আর সেটা জানার কথা নয়!
পেছনের মানুষের চাপে ভিড়ের সামনের অংশ দ্রুূতই এগিয়ে গেলো আরো সামনে। আর মানুষের এই স্রোত পেছন থেকে ধাক্কা দিতে থাকলো লিভারপুলের সমর্থকে ভর্তি গ্যালারির ঐ অংশকে। ফলাফলটা হলো ভয়াবহ। নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকায় পেছনের চাপে চিড়ে-চ্যাপ্টা হতে থাকলো সামনের মানুষগুলো। একপর্যায়ে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু মানুষ উঠে যেতে চাইলেন উপরের গ্যালারিতে। কিন্তু, সেটাও যে মানুষে পরিপূর্ণ!
ব্যর্থ হয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনীর সাথে সেটিয়ে যেতে হলো তাদের। কিন্তু, পেছনে মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপ থামার কোন লক্ষণ নেই। মানুষের এই প্রবল স্রোত সইতে না পেরে একপর্যায়ে ভেঙ্গেই গেল সামনের নিরাপত্তা বেষ্টনী। ম্যাচের তখন চলছে সাত মিনিট। পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ার মতোই একের পর এক রেডস সমর্থক পড়তে শুরু করলেন নিচে। পতনের ধাক্কা সইতে না পেরে কেউ কেউ মারা গেলেন সাথে সাথেই। অন্যদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরো যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। নিজ দলের সমর্থকদের পদদলিত হয়ে মারা গেলেন তারা। যারা বেঁচে গেলেন তাদেরও দীর্ঘদিন ভুগতে হলো অসহ্য যন্ত্রণায়। কয়েকদিন পরে জানা গেল, মোট ৯৬ জন লিভারপুল সমর্থককে প্রাণ হারাতে হয়েছে সেদিন। আর আহতের সংখ্যাটা ছিল ৭৬৬।
ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে অন্যতম বেদনাদায়ক দিনটির ঘটনাগুলো ছিল এমনই। যেটি পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় ‘হিলসব্রো ট্রাজেডি’ নামে। সেই ঘটনার পঁচিশতম বার্ষিকী পালন করা হচ্ছে এবছর। সেদিনের সেই ফুটবল ভক্তদের স্মরণে এ সপ্তাহে ইংলিশ লিগের প্রতিটি ম্যাচ শুরু হচ্ছে সাত মিনিট পরে। কারণ সেদিন সাত মিনিটের মাথায় এই ট্রাজেডির কারণে খেলাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
