কবি ময়ূখ চৌধুরী একবার আফসোসের সুরেই বলেছিলেন, ‘আমার আসতে একটু দেরি হবে’। তার সেই বলার মতোই কৃষ্ণচূড়াও এবছর আসতে একটু দেরি করছে। হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতেই ফোটার কথা ছিল কৃষ্ণচূড়া। ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে মার্চ এলো। মার্চ পেরিয়ে এপ্রিল। বসন্তের শেষবেলাতেও দেখা নেই কৃষ্ণচূড়ার। আজই শেষ হবে চৈত্র। কাল থেকে শুরু বৈশাখ। তবুও ফুলের দেবী ঘুমিয়ে আছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্যই কৃষ্ণচূড়ার এই দেরি করে আসা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও তেমন কোনো ফুল আমার চোখে পড়েনি। বর্তমানে যে হারে তাপমাত্রা বিকিরিত হচ্ছে তাতে মে মাসের আগে কৃষ্ণচূড়া ফোটার সম্ভাবনা নেই।’
রাজধানীর অনেক রাস্তার পাশে আছে কৃষ্ণচূড়া গাছ। কোথাও কৃষ্ণচূড়া ফুলের দেখা মেলেনি। ‘সেই লোহিতেই লাল হয়েছে, কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে’- ভাষা আন্দোলন নিয়ে কবিতার পংক্তি। সেই হিসেবেও ফেব্রুয়ারিতেই ফোটার কথা কৃষ্ণচূড়ার। বাস্তবতা হলো এখনও ফোটেনি।
এই ফুল বড় চারটি পাপড়িযুক্ত। পাপড়িগুলো প্রায় আট থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হয়। প্রতিটি পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা আর ২০ থেকে ৪০টি উপ-পত্রবিশিষ্ট হয়। কৃষ্ণচূড়া একটি বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিক্স রেজিয়া। এটি ফাবাসিয়ি পরিবারের অন্তর্গত একটি বৃক্ষ। গুলমোহর নামেও পরিচিত এই ফুল।শুধু কৃষ্ণচূড়াই প্রকৃতির সঙ্গে অভিমান করেনি, সঙ্গে অভিমান করেছে রাধাচূড়া। ফোটেনি পলাশও। ঢাকার রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সচিবালয়ের দক্ষিণ পাশ, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ, চন্দি মা উদ্যান, বিমানবন্দর রাস্তার দুই পাশ, শাহবাগ ও গুলশানের কৃষ্ণচূড়ার ডালে আগুন লাগেনি। উদ্ভিদবিদরা জানিয়েছেন, কৃষ্ণচূড়া ফুল ফুটতে দেরি হলেও কণকচূড়া, জারুল, মাধবী, রাধাচূড়া, হিজল আর অলকানন্দা প্রস্তুতি নিচ্ছে পত্রপল্লবে বিকশিত হতে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএফএম জামালউদ্দীন বললেন, ‘একটা সময় আমাদের দেশে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তো। তবে এখন হঠাত্ করেই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে ওয়াটার লেভেল নিচে চলে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই ওয়াটার লেভেল উপরে উঠে আসবে। তখন ফুল ফোটা শুরু করবে।’
আজ হোক, কাল হোক বৈরী আবহাওয়া ঠেকিয়ে এ নগরে জ্বলবেই কৃষ্ণচূড়ার আগুন। বিরহ স্মৃতি নিয়ে নিশ্চয়ই কেউ তখন গাইবে- ‘এই সেই কৃষ্ণচূড়া, যার তলে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ হাতে হাত কথা যেত হারিয়ে।’ কিংবা নবপ্রেমে উজ্জীবিত কারও কণ্ঠে ভেসে আসবে- ‘ফুলের বনে যার কাছে যায়, তারেই লাগে ভালো।’ বিশেষজ্ঞদের ভরসায় ফুলদেবীর ভরাযৌবন দেখতে নগরবাসীকে কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরতে হবে।
