ভারতে চলছে বহুল আলোচিত লোকসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। এর আগেও লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচন ভারতে একটি ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে। কারণ সামপ্রদায়িকতার দায়ে অভিযুক্ত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হঠাত্ জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া এবং বছরের পর বছর ভারত শাসন করা কংগ্রেসের হঠাত্ করে ডুবন্ত তরীতে পরিণত হওয়ার ঘটনা দেশ-বিদেশের সবার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বিজেপি জোট এবার ভারতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। আর শোচনীয় পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে কংগ্রেস। সোনিয়া গান্ধী কিংবা রাহুল গান্ধী কিংবা মনমোহন সিংয়ের কোনো জারিজুরি এবার কাজে আসছে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।
গত ৭ এপ্রিল ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে এ পর্যন্ত কয়েকটি ধাপের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ মে পর্যন্ত মোট নয় ধাপে ভোট গ্রহণ হবে। ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ করা হবে ১৬ মে। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, অন্যবারের চেয়ে এবার ভোটারদের মধ্যে এক অজানা কারণে দেখা গেছে বিপুল উত্সাহ। সদ্য ভোটার হওয়া তরুণ-তরুণী থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও লাঠি ভর করে কিংবা সন্তানের কাঁধে চড়ে যাচ্ছেন ভোট কেন্দে । ভোট দিয়ে বাইরে এসে অমোচনীয় কালি মাখানো আঙুল দেখানো যেন এক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তারা আঙুলের কালি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টাইলে বলছেন, ভোট দিয়েছি (আই ভোটেড)।
নয় দফার নির্বাচনের প্রথম দফায় ৭ এপ্রিল আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের ছয়টি আসনে ভোট হয়। আসামে ভোট চলাকালে দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু মোটের উপর ভোট উত্সব ছিল শান্তিপূর্ণ। পত্র-পত্রিকার ভাষ্যমতে, বেশিরভাগ এলাকায় ভোটারদের মুখ দেখে মনে হয় তারা যেন কোনো মহোত্সবে যোগ দিতে এসেছে। আসামে তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি নারীদেরও বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা যায়। সেখানে ভোটার উপস্থিতি ৭৫ শতাংশের উপরে পৌঁছায়। আর এবার রেকর্ড গড়েছে ত্রিপুরার ভোটাররা। সেখানে ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানান। ত্রিপুরা রাজ্যের যে আসনে প্রথমদিন ভোট গ্রহণ হয় সেখানে ১৩ জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা করেন। এদের মধ্যে সিপিআই-এমের শঙ্কর প্রসাদ দত্ত, কংগ্রেসের অরুন্ধতী সাহা, বিজেপি’র সুধীন্দ প্রমুখ আলোচিত মুখ আছেন। অপরদিকে, আসামে বর্তমানে বিধানসভায় কংগ্রেস ক্ষমতায় রয়েছে। প্রথম দিন এই রাজ্যের পাঁচটি আসনের ভোটেও ছিল মহা উত্সবের আমেজ। দিব্রুগড়, জোড়হাট, কালিয়াবর, লখিমপুর ও তেজপুর আসনের নির্বাচনে ‘অবিশ্বাস্য’ ভোটার উপস্থিতি দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, এবার ভোট যেন এক ভোটবিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে। অনেক ভোটার বর্ণিল পোশাকে বিভিন্ন ভোট কেন্দে হাজির হচ্ছেন। ভোটের পর দূরের কোনো একটি স্থানে গিয়ে তারা গান-বাজনায় পার করে দিচ্ছেন ভোটের পুরোটা সময়। আসামের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন, কেন্দ ীয় সরকারের মন্ত্রী পবন সিং ঘাটোয়ার ও রানী নারাথ (লখিমপুর) এবং সাবেক কেন্দ ীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেসের বর্তমান এমপি বিজয় কৃষ্ণ। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈর ছেলে গৌরবও লড়ছেন এবার।
প্রথম দিন ভোট গ্রহণ ‘উদ্বোধন’ শেষে একদিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ হয়। সেদিনও ছিল রীতিমতো ভোট উত্সব। কোথাও কোথাও ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে। সামান্য কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর পাওয়া গেছে এদিন। তবে সার্বিকভাবে ভোট উত্সব ছিল শান্তিপূর্ণ। ভোট গ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন ব্যাপক তত্পরতা চালাচ্ছে। মেঘালয়ে কয়েকটি বুথে বন্য হাতির তাণ্ডবে ভোট গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের কয়েকটি কেন্দে ইভিএমে সমস্যা দেখা দেয়ায় ভোট গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
তৃতীয় পর্বে রাজধানী দিল্লীসহ ১১টি রাজ্যের ৯১টি আসনে ভোট গ্রহণের দিনও দেখা গেছে একই পরিবেশ। এদিন ১১টি রাজ্যের পাশাপাশি তিনটি কেন্দ শাসিত অঞ্চলেও চলেছে ভোট গ্রহণ। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ভোট গ্রহণ শুরু হলেও বিহারে মাওবাদীদের বোমায় ২ জন পুলিশ নিহত এবং ৪ জন আহত হয়। ছত্তিশগড়সহ মাওবাদী প্রভাবিত অঞ্চলে ভোট গ্রহণকে কেন্দ করে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি উড়িষ্যায় বিধানসভা নির্বাচনও হয়। তৃতীয় দফায় এই ভোটে অংশ নেয় প্রায় ১১ কোটি ভোটার। এদিন ছিল ভারতের অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের দিন। এবার কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এবং বিজেপি’র মধ্যে ত্রিমুখি লড়াই হচ্ছে রাজধানী নয়াদিল্লিতে।
ভোটের দিন দিল্লিতেও ছিল সাজ সাজ রব। বিশেষ করে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ভোটারদের হাতে ছিল নিজ নিজ পরিচয়পত্র। ভোট উত্সবে সামিল হতে সকালে গিয়েই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। এছাড়া দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সবাই ভোট দেয়ার পর মিডিয়ার সামনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এবারের ভোট সত্যিকার অর্থে ভোট উত্সবে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় দফার এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী ছিলেন বহু তারকা প্রার্থীও। গাজিয়াবাদে কংগ্রেসের হয়ে লড়ছেন রাজ বব্বর। উত্তর প্রদেশের মিরাটে কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়িয়েছেন অভিনেত্রী নাগমা। চন্ডীগড় কেন্দে র বিজেপি প্রার্থী অনুপম খেরের স্ত্রী কিরণ খের। এছাড়া বিজনৌর কেন্দে প্রার্থী হয়েছেন সদ্য আরএলডিতে যোগ দেয়া এক সময়কার জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী জয়া প্রদা।
মাওবাদী হামলার জেরে তৃতীয় দফায় ছত্তিশগড়ে বাস্তারে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে। এখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ। কিন্তু তারপরেও ২০০৯-এর তুলনায় তা প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। চতুর্থ পর্বেও ভোটার উপস্থিতি ছিল গত লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ভোট গ্রহণের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে এই উত্সবের আবহ। শনিবারে পশ্চমপর্বে চারটি রাজ্যে ভোটের দিন ছত্তিশগড়ে ফের মাওবাদী হামলায় ৬ জন নির্বাচন কর্মকর্তাসহ ১৫ জন নিহত হয়। তবে এই হামলার খবর ভোটারদের ভোটকেন্দে যেতে নিরুত্সাহিত করতে পারেনি।
এদিকে ভোটারদের এই উপস্থিতির হার দেখে বেজায় খুশি বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ মোদী। টুইটারে এর জন্য মানুষকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি। তিনি আশা করেছেন, ১২ মে ভোট গ্রহণের শেষ দিন পর্যন্ত এই রেকর্ড বজায় থাকবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নরেন্দ মোদীর এই উচ্ছ্বাসের কারণ কারো অজানা নয়। মোদীর ধারণা, যত বেশি ভোটার উপস্থিত হবে, বিজেপি’র তত বেশি লাভ হবে। বিভিন্ন জরিপ থেকে বিজেপি নেতাদের কাছে এটা স্পষ্ট যে ভোটারদের বেশিরভাগ এবার কেন্দে যাচ্ছে মোদীর দলের প্রতীকেই ভোট দিতে। তাই এই ভোট উত্সবে যত বেশি অংশগ্রহণ হবে, বিজেপি’র বড় ব্যবধানে জয়লাভের তত বেশি সম্ভাবনা বাড়বে।
নির্বাচন কমিশন আশা করছে, ১২ মে পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং নির্বিঘ্নেই ভোট গ্রহণ করতে পারবে। ভারতের গন্ডি ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের নজর এখন লোকসভা নির্বাচনের দিকে। ১৬ মে কোন দল শেষ হাসি হাসতে যাচ্ছে তা দেখার অপেক্ষায় সবাই।
