ভারতে চলছে লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রধান দুই দল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি। কিন্তু ভোট শেষ হবার আগেই যেন রেজাল্ট ‘ফাঁস’ হয়ে গেছে। যেন জিতে বসে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। যেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসে আছেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদী। গত কয়েক মাস ধরেই ভারতে শুরু হয়েছে মোদীকে নিয়ে মাতামাতি। বাস্তব দুনিয়াতে মোদী যেমন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার শীর্ষে, তেমনি সাইবার দুনিয়াও যেন চলে গেছে তার দখলে। ইন্টারনেটে বসলেই মোদী, মোদী, আর মোদী! গুগল সার্চে তো অনেক আগেই ভারতীয় রাজনীতিকদের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করেছেন মোদী। এখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোও চলে গেছে তার পদতলে।
এ যেন এক যাদুকরের গল্প। সেই যাদুকর মন্ত্রবলে মোহিত করে ফেলেছেন ভারতের কোটি কোটি মানুষকে। তা সংক্রামিত হয়েছে সাইবার স্পেসেও। ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেট থেকে সাধারণ টেক্সট অথবা হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ— কোথায় নেই মোদী? সবখানে একই শ্লোগান, অব কি বার, মোদী কি সরকার। সাইবার দুনিয়াতে নরেন্দ্র মোদী নতুন সাংকেতিক নাম পেয়েছেন নমো (নরেন্দ্র মোদীর সংক্ষিপ্ত রূপ)। গত ৬ মার্চ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের দু’দিন আগে থেকেই ফেসবুকে চার ছক্কা হৈ হৈ থিম সংয়ের সাথে প্রচার হতে থাকে, ভারতে এবার মোদীর সরকার। বিপুল সাড়া পড়ে যায় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে। ‘নমো বন্দনার’ লাখ লাখ শেয়ার ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল মার্কেটিং-এর সঙ্গে যুক্ত অভিষেক বসু বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী ঋতিকা চৌধুরী ফেসবুকে কী স্ট্যাটাস আপডেট দিয়েছিলেন দেখা যাক।
অভিষেক লেখেন: টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ ঘর লানে কা মওকা আয়া এক অওর বার/অব কি বার মোদী সরকার (টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘরে আনার সুযোগ এসেছে আরেক বার/ভারতে এবার মোদীর সরকার। ঋতিকা: জায়ে ইন্ডিয়া ফাইনাল মে বারবার/অব কি বার মোদী সরকার (ভারত ফাইনালে যাবে বার বার/এবার মোদীর সরকার)।
টি টোয়েন্টি জ্বরের সাথে মোদী জ্বর যুক্ত হওয়ায় এজাতীয় স্ট্যাটাসে পড়তে থাকে অগণিত লাইক আর কমেন্ট। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সাথে মোদীর কি সম্পর্ক সে প্রশ্ন কেউ না তুলেই মোদীজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে! অনেকে মন্তব্য করেন, রজনিকান্ত, রবিন্দর জাদেজা, অলোকনাথের পর এবার মোদী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রজনীর মতে, এক-এক সময় এক-একটি চরিত্র নিয়ে যেমন অকারণে আলোচনা সমালোচনা চলে, এটাও ঠিক তেমনই। তাই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে কোনওই লাভ নেই। টিভি থেকে শুরু করে রেডিও, খবরের কাগজ, বিল বোর্ড, ওয়েবসাইট— মোদীর সমর্থনে সর্বত্র যে প্রচার চলছে, তার একটা মনোস্তাত্বিক প্রভাব রয়েইছে। তাই এক্ষেত্রে প্রশ্নটা মোদী বা বিজেপিকে সমর্থন বা অসমর্থনের নয়, অনেকটা সংক্রামক জ্বরের মতো। যে প্রভাবের জেরে আমার, আপনার দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো মজার অনুভূতিতেই প্রতিফলিত হচ্ছে ‘অব কি বার....’। অনেকের কাছে এটা হুজুগে মাতার মতো। কারো কাছে স্রেফ, হালের জনপ্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে টাইমপাস, সিরিয়াস কিছু নয়।
অনেকে আবার বিষয়টি নিয়ে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপেও মেতেছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মোদীকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা যেমন দেখা যাচ্ছে, তাকে হাস্যকর প্রমাণ করার চেষ্টাও কম হচ্ছে না। অনেকে মোদীকে টাইটানিক-এর নায়কের সাথে তুলনা করেছেন। যার কূলে পৌছানোর সৌভাগ্য কখনো হবে না। যতক্ষণ স্বপ্নভ্রমণে আছেন ততক্ষন টাইটানিকের নায়কের মতো সুন্দর সুন্দর মুহুর্ত কাটাচ্ছেন। অনেকে জনপ্রিয় হিন্দি গানের সাথে কৌতুক করে মোদীর নির্বাচনী শ্লোগান যুক্ত করে দিচ্ছে। মোদী সংক্রান্ত কোনো পোস্ট দিলে তাতে লাইক কিংবা কমেন্টের ঝড় শুরু হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ-এর অধ্যাপক মৈনাক বিশ্বাস বলেন, মোদী আসলে একটা ‘ব্রান্ড নেম’ এ পরিণত হয়েছে। নামটা তুললেই অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবেন। তাই তাকে নিয়ে দুই ধরনের প্রচার চলছে। এক দল সচেতনভাবে বিজেপি-মোদীর সমর্থনে এটা করছেন। আরেকদল হুজুগে পড়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অজ্ঞাতসারেই মোদীর প্রচারণায় সাহায্য করছেন। কিন্তু যারা সচেতনভাবে এটা করছেন না, তারাও আসলে মোদীর সপক্ষে রাজনৈতিক প্রচারেরই অঙ্গ হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে, মোদীকে কেন্দ্র করে যে ‘ঢেউ’ তৈরি হয়েছে, তা মূলত সংবাদমাধ্যম সৃষ্ট বলেই মনে করেন মৈনাক নামের আরেকজন বিশ্লেষক। কিন্তু ‘মোদীজ্বর’ নামের এই নতুন অসুখের স্রষ্টা কে বা কারা তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না।
