গানের বৈশাখ

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৩
মাত্র কিছুদিন আগে কলকাতার বোলপুরের শান্তি নিকেতনে গিয়েছিলাম। সেখানে বিশ্বভারতীর প্রফেসর প্রখ্যাত এসরাজ বাদক সুভায়ূ সেন মজুমদারের সাথে কথা হলো। তার সাথে লাল রঙা মেঠো পথ দিয়ে যাচ্ছি খোয়াই মেলা। এটাই সেই রাঙামাটির পথ। যে পথে হেঁটে হেঁটে ভাবনায় এসেছিল, সেই বিখ্যাত গান ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ’। বাঙালি সংস্কৃতির রংরূপ তৈরি করে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। বৈশাখকে অনবদ্য আহ্বানে টানার এই যে আকুলতা। এ গান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে কি সম্ভব। সুভায়ূ সেনের সাথে খোয়াই মেলা দেখে আবারও রিকশা ঘুরিয়ে যাওয়া হলো কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের আবাসস্থানে। আমাদের দেশের সাদী মহম্মদ, রেজওয়ানা চৌধুরী থেকে শুরু করে সবার কাছে যিনি প্রিয় মোহরদি নামে পরিচিত। তারই ছাত্র সাদী মহম্মদের কণ্ঠেই আজ ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গান আজ অধিকাংশ অনুষ্ঠানে বা আয়োজনে, নৃত্যে পরিবেশিত হয়। কয়েক প্রজন্মের কণ্ঠে লালিত এসো হে বৈশাখ... সাদী মহম্মদ গত কয়েক দশক থেকেই তার সংগীত সাধনার প্রতিষ্ঠান রবিরাগ নিয়ে সারাদেশে একাধিক ছাত্র-ছাত্রীদের গান শিখিয়ে আসছেন। পহেলা বৈশাখের গান প্রসঙ্গে জানতে চাই তার কাছে। সাদী ভাই বলেন, ‘এই গান মোহরদির কাছে যেদিন শিখি শান্তিনিকেতনে, সেদিন তিনি এক ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। মোহরদি বলেছিলেন, বৈশাখের মেলা, চারুকলা থেকে শুরু করে যাবতীয় বিবর্তনের ভেতরে যে বিষয়টি সর্বকালের অমরত্ব পাবে তা হলো বৈশাখের এই গান। সত্যিকার অর্থেই এই গান ছাড়া আজকের পহেলা বৈশাখকে কি আমরা আজ ভাবতে পারি?’ সাদী মহম্মদের কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটির রেকর্ডিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রেকর্ডটি খুব একটা আয়োজন করে করা তা নয়। প্রতিবছরই বৈশাখের আগে আমার কণ্ঠে বিভিন্নভাবে একটা অর্কেস্ট্রা তৈরি করে তবেই বৈশাখ উদযাপন করতাম। রবিরাগের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে যেমন আমরা ধানমন্ডির লেকের পাশেই ছোট্ট আয়োজন দিয়ে শুরু করেছিলাম। তো এই প্রস্তুতি দেখেই সাউন্ডটেকের বাবুল ভাই বললেন, আপনি একটা এই গানের রেকর্ড করেন। যাতে সবাই এটা বাজিয়ে শুনতে পারে। সেই থেকেই গানটি রেকর্ড হয়। এটা আশির দশকের কথা বলছি। তো প্রথম রেকর্ড বাজানোর একটা অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা হলো রবিরাগের হয়ে আমরা গানটি রিহার্সেল করেছি। তো আমরা শুরুর আগেই সাউন্ড সিস্টেমের ইঞ্জিনিয়ার আমার রেকর্ড করা গানটি বাজিয়ে দেন। অমনি সকল অংশগ্রহণকারীরা আমার গানের সাথে সাথেই গাইতে শুরু করে। পুরো রেকর্ডটি এতটাই লাইভ ছিল যে, দর্শকেরা বুঝতেই পারেনি সেটা লাইভ ছিল না রেকর্ডেড ছিল।’ সাদী মহম্মদের মতো রেজওয়ানা চৌধুরী তার সুরের ধারাতেও একইভাবে এই গানটি লালন করে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার মতে, ‘আমি পুরো গীতবিতান রেকর্ড করার সময়ই আমার কাছে মনে হলো আমরা এখন নানান ধরনের রেকর্ড গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছি। অথচ বাঙালির প্রাণের টানের এই বৈশাখের গানের রেকর্ড আমরা কত না আগেই তৈরি করে ফেলেছি। ‘ঝাপট লাগে মাথার উপর ধুলোয় লুটোই মাথা। দুরন্ত ঠেলায় নিষেধের পাহারা কাত করে ফেলি নেই এমন বুকের পাটা।’ শহরে আমরা মার খেতে খেতে নানা বিকারের জ্বরে কাতর হয়ে এক একসময় হাতড়ে খুঁজে মরি—কোথায় আছে আমাদের ভেতরের আমি, আমাদের আসল আমি। এসব সময়ে এই দেশীয় উত্সব প্রাণ দেয় সবাইকে। তাই পহেলা বৈশাখ এখন শহরের মানুষের নিজেকে ফিরে পাওয়ার দিন। এ দিনে ঢাকা শহরে আমরা রমনার সবুজ খোলা আকাশের নিচে মিলিত হয়ে আপন জাতীয়তাকে অঙ্গীকার করি। পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় চেতনায় মিলিত হয়ে জেগে ওঠার দিন। সংস্কৃতির ব্যাপারটাই আসলে আলাদা। ললিতরূপে, মোহন সুরে এটি এমনভাবে কাজ করে চলে যে, বোঝা যায় না কাজটা কী হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান এমনি অলক্ষ্যে ঢাকার মানুষকে জাতীয়তার চেতনায় প্রাণিত করেছিল। সেসব দিনে, যখন নিষেধের বেড়াজালে ঘিরে বাঙালি সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে, তখন আমাদের সে-ই ‘বাঁশিওয়ালা’।’ এবারে একটু পেছনের দিকে ফেরা যাক ইংরেজি ১৯৬৩, বাংলা ১৩৭০-এর পহেলা বৈশাখে উদ্বোধন হলো ‘ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তন’-এর। না হলে শ্রোতার আসরের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক শিল্পী আমরা পাব না—এই ছিল ভাবনা। ইংরেজি চৌষট্টি, বাংলা একাত্তর সালের পহেলা বৈশাখে বিদ্যায়তনের বার্ষিক অনুষ্ঠান করে বুঝতে পারলাম, বিদ্যালয়ের উন্নতির পরিচয় নিতে অনুষ্ঠানে আসেনি মানুষ। সবাই চায় নববষের আবাহনী উত্সবে যোগ দিতে। মানুষের দাবি—বাঙালির নববর্ষকে বরণ করা হোক উপযুক্তভাবে। উনিশশো সাতষট্টি অর্থাত্ বাংলা তেরশ চুয়াত্তরের পয়লা বৈশাখের জন্য নতুন করে ভাবতে হলো। বন্ধু নওয়াজেশ আহমেদ খবর দিলেন রমনা রেস্তোরাঁর জায়গাটা ঘুরেফিরে দেখে সেই হাতার ভেতরেই লেকের ধারের পাকুড় গাছের তলাটি মনে ধরল। তলাটা ঘিরে বাঁধানোও আছে। ভোর ৬টায় রাগের আলাপ শুরু হলো। বাজিয়েছিলেন আবিদ হোসেন খান। পুরো হূদয় যেন কমলের মতো বিকশিত হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য আলোর আকাঙ্ক্ষা জানানোটা এই দিনের বিশেষ কথা। এরপর থেকেই শুরু হলো এদেশের ঐতিহ্যের বৈশাখী গানের ক্রমানুসার। লেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে... এদেশের তারুণ্যের জোয়ারে বা উচ্ছ্বাসে যে গানটি, নতুন এক স্পন্দন তৈরি করেছিল সেই গানটি ফিডব্যাকের তৈরি। ফিডব্যাকের এই কালজয়ী গান প্রসঙ্গে ব্যান্ডের দলনেতা ফুয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘১৯৮৯ সালের শেষ দিক। নতুন গান নিয়ে বসেছি ব্যান্ডের সবাই। মাকসুদ গানটির ভাবনা শেয়ার করেন। কি-বোর্ড বাজিয়ে আমি একটা সুর করি। তার ওপর রিদমে পিয়ারু ভাই এবং গিটারে লাবু রহমান। মুখের কথার ওপরই পুরো কাজটি চলছিল। সুর ও সংগীতটা দাঁড়িয়ে গেলে বাকি অন্তরাগুলো লেখা হয়। রেকর্ডিংয়ের আগেই কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমরা গানটি করি। ১৯৯০-এর ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বিটিভি গানটি চালানো শুরু করে। দ্রুত গানটি সারা দেশে ছড়িয়ে যায়। ‘মেলা’ অ্যালবামে প্রকাশের পর জনপ্রিয়তা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিবছর বৈশাখ এলেই যখন চারপাশে গানটা শুনি, গর্বে বুকটা ভরে যায়।’ গানটি লিখেছেন মাকসুদুল হক। বৈশাখের সাথে তাই তার এক অদম্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এই গান দিয়েই। এ গান প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি এই গানটিতে বৈশাখী চেতনার কথা তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি কতটা সফল তা জানি না। এর উত্তর দেবে কালস্রোত। তবে আমাদের পুরো টিমের চেষ্টাটা সফল হয়েছিল।’ এদিকে মঞ্চে বৈশাখী গানের একাধিক বিন্যাস রয়েছে। তবে প্রায় সকল গীতিকবি দেশমাতৃকা বা বাঙালি ঐতিহ্য নিয়ে গান বাধলেও মূলত ঘুরে ফিরে দু একটা গানই উঠে এসেছে আলোচনায়। বা জনশ্রুতির তালিকায়। সময়ের কণ্ঠে বৈশাখ কালের খেয়ায় সময় বদলালেও এ সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠেও বারবার উঠে এসেছে বৈশাখের গান। এক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার আঙিনায় নতুনদের গান খুব একটা সাফল্যের রোদ ফেলতে না পারলেও এর ভেতরে কণ্ঠশিল্পী আসিফের গাওয়া ‘বাঙালীর ঘরে ঘরে’ গানটি চলতি দশকের শ্রোতাদের ভেতরে নতুন এক উন্মাদনা তৈরী করেছে। এ প্রসঙ্গে আসিফ বলেন,‘বৈশাখ নিয়ে গান গাইবার আইডিয়াটা আমারই ছিল কারণ দীর্ঘদিন স্টেজে গান গেয়ে আসছি। সেই স্টেজে গাইবার তাড়না থেকেই নিজের একটি বৈশাখী গান গাইবার ইচ্ছে হলো। সেই থেকেই রাজেশকে বৈশাখ নিয়ে একটি গান তৈরী করার কথা বলি। কবির বকুল ভাই এই গানটি লিখেছিলেন। বৈশাখে মূলত বাংলা গান গাইতে হলে দুই তিনটি গান গাইবার পরই অন্য বিষয়ে গাইতে হয়। আমার মতে আরো জনশ্রুত বৈশাখের গান প্রয়োজন।’ এর পাশাপাশি শওকত আলী ইমনের সুরে ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সোনিয়ার কণ্ঠে রয়েছে আরো একটি গান। ‘বাজেরে ঢোল’ নামর এই গানটি পরবর্তীতে একটি চলচ্চিত্রেও ব্যবহার করা হয়। এ প্রসঙ্গে সুরকার শওকত আলী ইমন বলেন,‘বাংলা গানের একজন কর্মী হিসেবে বৈশাখ নিয়ে একটি গান বাধার তাগিদ অসেক দিন ধরেই। সোনিয়া’র সলো অ্যালবামের দায়িত্ব যখন পেলাম। তখনই ইচ্ছে ছিল প্রেমের গানের পাশাপাশি একটি দেশের গানসহ বৈশাখ নিয়ে একটি গান থাকবে। সেই চিন্তা থেকেই সোনিয়ার কণ্ঠে বৈশাখ রাখা হলো। এরপর আমি যেহেতু অডিও অ্যালবামের কাজ একেবারেই কম করে থাকি। চলচ্চিত্রের কাজের প্রতিই আমার বরাবরের আগ্রহ। সেই থেকে একটি ছবি নিয়ে যখন আলাপ হলো, তখন ছবির গানে এই গানটি অন্তর্ভূক্ত করার কথা বলতাম। কারন আমার মতে বাংলা চলচ্চিত্রে একাধিক গান রয়েছে যেখানে পহেলা বৈশাখ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেখানে হয়তো রোমান্টি কোনো মুডের গান ব্যবহার করা হয়। সেই বিষয়টিকেই আমি ভাঙতে চেয়েছিলাম। সোনিয়ার এই গানটি এখন দেশের অনেক জায়গায় নাচের অন্যতম আবহ গান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে নবাগত অনেকের কণ্ঠেই উঠে এসেছে বৈশাখের গান। তবে দেশের গানের তুলনায় আমাদের বৈশাখের গান অনেক কম। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেন,‘ আমরা বৈশাখকে শুধু একটি দিনের ইভেন্টে বন্ধ রেখেছি। অথচ এত বড় ঐতিহ্যের সংস্কৃতি নিয়ে আমরা চলচ্চিত্র বা অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। আমরা সেগুলো করছি না। আর নতুন গান তৈরীর জন্য এর ব্যবহারটা জরুরী। বৈশাখ নিয়ে একটি দুটি অডিও অ্যালবামে গান করে কোনো বিস্তার লাভ করা যাবে। বরং পূর্ব প্রজন্মের কাছে একটা পরাজয় হবে তাতে।’ তবু ইদানিংকালে পাচকবির গানের পাশাপাশি আধুনিক সময়ের গীতিকবিরাও বৈশাখ নিয়ে গান বাধছেন। নতুন ভাবে নিজেদের বৈশাখের অনুভূতিকে তুলে ধরছেন ক্রমশ। আবৃত্তিশিল্পী অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় তার নিয়মিত অভিনয় জীবনের পাশাপাশি একাধিক দেশি ও বিদেশি বৈশাখী মেলাতে পারফর্ম করেছেন। বৈশাখী গান ও মেলা উদযাপন প্রসঙ্গে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় বৈশাখটাই আমাদের বাঙালিত্বকে সর্বোতভাবে রাঙিয়ে রেখেছে। কারণ আমি লন্ডনের বৈশাখী অনুষ্ঠান যেমন করেছি তেমনি সাতক্ষীরাতে যখন উপজাতিদের সাথে বৈশাখী উত্সব আয়োজন করা হয়। তখন গানটিই মুখ্য হয়ে ওঠে। আমার মনে হয় না গান ছাড়া অন্য কোনো অনুষঙ্গ বৈশাখকে এতটা রাঙাতে পারত।