বা ং লা দে শে র যা ত্রা গা ন

পারিবারিক নাট্যচর্চার ঐতিহ্য

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৮
সেই ছোটবেলা থেকে ‘যাত্রা’ নিয়ে আগ্রহের অন্ত নেই। যাত্রার প্রতি এই অন্তহীন আগ্রহের প্রধান যে কারণ, তা হচ্ছে—চোখ মেলে দেখেছি, বাংলাদেশের অন্য সকল ঐতিহ্যবাহী নাট্যাঙ্গিকের মধ্যে একমাত্র যাত্রার আসরেই সর্বাধিক সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি ঘটে। একসঙ্গে কয়েক হাজার দর্শক কীভাবে, কেমন করে, কোন সে আনন্দময় ইন্ধনে চারদিক খোলা নিরাভরণ যাত্রামঞ্চকে কেন্দ্র করে অনেকটা মাটিতে বসে, বড়জোর খড়-বিছালি বা পাটির আসনে বসে সীমাহীন মুগ্ধতায় একেকটি যাত্রাপালা দেখে রাত কাবার করেন—তা এক পরম বিস্ময়ের ব্যাপার! এই বিস্ময়বোধের ভেতরে পাঠ করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র প্রবন্ধ গ্রন্থভুক্ত ‘রঙ্গমঞ্চ’, এবার শহুরে বিদ্যাশিক্ষার কালিমা মনে ধারণ করেও আমার চেতনালোকে নবজাগরণ ঘটে। আবিষ্কার করি, যাত্রার আসরে সংঘটিত অভিনয়কুশলীর কাব্যশক্তি প্রদর্শনের দক্ষতা। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের ইশারা নিয়ে সুগভীরভাবে প্রত্যক্ষ করি, যাত্রার অভিনয়শিল্পী ও দর্শকদের কল্পনাশক্তির যৌথ-সংমিশ্রণে সৃজিত অপূর্ব নাট্যাভিনয়, নাট্যশিল্প হিসেবে যাত্রার এই শক্তিকে আমরা শহুরে নাট্যকর্মীরা হয়তো আজও ঠিক ঠিক অনুভব করতে পারিনি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে তা সুগভীর চিত্তে অনুভব করেছিলেন, তা না হলে তিনি কীভাবে বলেন—“আমাদের দেশের যাত্রা আমার ওইজন্য ভালো লাগে। যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটা গুরুতর ব্যবধান নাই। পরস্পরের বিশ্বাস ও আনুকূল্যের প্রতি নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহূদয়তার সহিত সুসম্পন্ন হইয়া উঠে। কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস, সেইটেই অভিনয়ের সাহায্যে ফোয়ারার মতো চারিদিকে দর্শকদের পুলকিত চিত্তের উপর ছড়াইয়া পড়ে।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : “রঙ্গমঞ্চ”] মধ্যযুগের বাংলায় পরিবেশিত নাট্যাভিনয় তথা নাট্যাঙ্গিক হিসেবে যাত্রার উন্মেষের প্রমাণ রয়েছে কবি বৃন্দাবন দাস রচিত চৈতন্যভাগবত-এর অষ্টাদশ অধ্যায়ে। উক্ত অধ্যায় হতে জানা যায়, চন্দ্রশেখরের গৃহে চৈতন্যদেব সাপরিষদ যে অভিনয় করেছিলেন তা ছিল মূলত নৃত্যপ্রধান, তবে তাতে হাস্যরসাত্মক চরিত্রের কৌতুকাভিনয় এবং পরপর অন্যান্য চরিত্রের চমকপ্রদ আগমনের মধ্য দিয়ে নাট্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের টুকরো টুকরো কথোপথনের যে বর্ণনা কবি বৃন্দাবন দাস দিয়েছেন তাতে বোঝা যায়, নাট্য পরিবেশনাটি নৃত্যপ্রধান হলেও উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হয়েছিল। খোলা আসরে অভিনয়, রাধাকৃষ্ণ অথবা চৈতন্যদেবের লীলা অবলম্বনে পালা রচনা, নৃত্যগীত এবং মাঝে মাঝে কিছু সংলাপের প্রয়োগ, মুখ্যরস ভক্তিরস হলেও জনমনোরঞ্জনের জন্য কৌতুকরস সঞ্চার করা ইত্যাদি পরবর্তীতে যাত্রাভিনয়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে রূপ নেয়, গবেষকের ধারণা যাত্রার এই বৈশিষ্ট্যগুলো চৈতন্য-অভিনয়ের দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। চৈতন্যদেব নির্দেশিত ও অভিনীত নাট্যকে পারিবারিক নাট্যচর্চার ঐতিহ্য বলেও শনাক্ত করা যায়। কারণ, কবি বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতে উল্লেখ রয়েছে— সর্ব্বগণ সহিত ঠাকুর বিশ্বম্ভর। চলিলা আচার্য্য চন্দ্রশেখরের ঘর\ আই চলিলেন নিজ বধূর সহিতে। লক্ষ্মীরূপে নৃত্য বড় অদ্ভুত দেখিতে\ যত আপ্ত বৈষ্ণবগণের পরিবার। চলিলা আইর অঙ্গে নৃত্য দেখিবার\ [বৃন্দাবন দাস :চৈতন্য-ভাগবত] অর্থাত্ সপরিবারে নৃত্য তথা নাট্য দর্শনের জন্য বৈষ্ণবগণ চন্দ্রশেখর আচার্যের গৃহে গমন করছেন। এরপর চাদোয়া টানানো উঠানে চৈতন্যদেব নির্দেশিত নাট্যাভিনয় শুরু হয়। প্রথমে মঞ্চে প্রবেশ করেন হরিহাস। তার অভিনয় ও সংলাপের এক পর্যায়ে নারদ-বেশে মঞ্চে প্রবেশ করেন শ্রীবাস। শ্রীবাসের সংলাপ উচ্চারণ ও সুনিপুণ চরিত্রাভিনয় দেখে মূর্ছিতা হন বিশ্বম্ভর মাতা শচীদেবী। এবার আসি, বাংলাদেশের সাম্প্র্রতিককালের যাত্রাশিল্পে পারিবারিক নাট্যচর্চার ঐতিহ্য কীরূপে বর্তমান সে সম্পর্কিত আলোচনায়। আসলে, গত কয়েক বছর ধরে এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু যাত্রার আসরে গিয়ে প্রথম লক্ষ করা যায়, এদেশের সাম্প্রতিককালের যাত্রাশিল্পে পারিবারিক নাট্যচর্চার ঐতিহ্য প্রবহমান রয়েছে। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের যাত্রাগানে পারিবারিক নাট্যচর্চা কীভাবে বহমান তা বর্ণনা করা হচ্ছে। অত্র প্রবন্ধে সর্বমোট তিনটি অর্থে বাংলাদেশের যাত্রাগানকে পারিবারিক নাট্যচর্চার ঐতিহ্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। যথা—১. কিছু যাত্রাশিল্পী পারিবারিকভাবে (স্বামী-স্ত্রী মিলে বা বাবা-মা-ভাই-বোন ও সন্তান-নাতি মিলে) যাত্রাগানের আসরে অভিনয়ে অংশগ্রহণ কিংবা পালা পরিচালনা বা বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেন; ২. মালিকানাসূত্রে কোনো কোনো পরিবার যাত্রাদল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন; ৩. দর্শক হিসেবে পরিবারের সদস্যবর্গ মিলে যাত্রাগানের আসর উপভোগ করেন। যাত্রাশিল্পের অশ্লীলতা নিয়ে সাম্প্রতিককালের যে সকল অভিযোগ উত্থাপন করা হয় তার বিপরীতে কেন যে যাত্রাশিল্পের এই নির্মল পারিবারিক অভিনয়রীতির কথাটি উচ্চারিত হয় না তা আমাদের বোধগম্য নয়। যাত্রাশিল্পের সঙ্গে নৃত্যকেই প্রধানত অশ্লীলতার মোক্ষম অজুহাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়, অথচ কী আশ্চার্য মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের নৃত্যকুশলতা ও অন্যান্য অভিনেতাদের অভিনয় নিপুণতার ক্রমপরম্পরার ভেতর দিয়েই অষ্টাদশ শতকে শেষপাদে জন্ম লাভ করেছে আজকে প্রচলিত আধুনিক যাত্রাশিল্প। যাত্রাশিল্পের সঙ্গে অশ্লীলতার সংশ্লেষকে অনেকটা স্বীকার করে নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রাপালা রচয়িতা ও যাত্রা পালাকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. মজিদ বলেন,— “যারা যাত্রা অন্তঃপ্রাণ তারা যাত্রাকে পেশা হিসেবে নিতে পারেননি, আজ যারা যাত্রাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে তারা আসলে ব্যবসায়ী, তারা যাত্রা অন্তঃপ্রাণ ব্যক্তি নন। তাই যাত্রা অন্তঃপ্রাণ মানুষগুলো সৌখিন যাত্রাশিল্পী হয়ে পড়েছেন।” অর্থাত্ বাংলাদেশের যাত্রাশিল্প যাত্রা অন্তঃপ্রাণ মানুষের দখলে থাকলে এ শিল্পধারার সঙ্গে অশ্লীলতার সংশ্লেষ ঘটার কথা নয়। কিন্তু যাত্রাশিল্প আজ কতিপয় ব্যবসায়ীর হাতে পড়েই তার চিরায়ত স্বভাব বা ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তারপরও যে সকল যাত্রাদলে পারিবারিক নাট্যচর্চার চল রয়েছে সে সকল যাত্রাদলে অশ্লীলতার তেমন কোনো প্রাধান্য নেই বললেই চলে। এবারে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই, ২০০৪-২০০৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে জয়পুরহাট বিনধারা-সোনাপাড়া গ্রামে বন্ধু ছড়াকার-কবি ও শিক্ষক মাসুদার রহমানের বাড়ি গিয়েছিলাম, শুনলাম পাশেই দিনাজপুর জেলার গোপালপুর চৌধুরী মেলায় যাত্রা হচ্ছে। বন্ধুকে রাজি করিয়ে তাঁর মোটরবাইকে চেপে গেলাম গোপালপুর চৌধুরী মেলাতে, গিয়ে দেখি সুন্দর একটি যাত্রা প্যান্ডেল করা হয়েছে, ভীষণ আগ্রহ নিয়ে প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকলাম, দেখলাম সুন্দর একটি যাত্রামঞ্চ তৈরি করা আছে, দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে, কিন্তু এখনও যাত্রাদল আসেনি। ব্যাপার কী? আমি যাত্রাশিল্পী পরিষদের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে এম.এ. মজিদকে ফোন করলাম, তিনি আমাকে গোপালপুর চৌধুরী মেলাতে যে দলটির যাত্রা পরিবেশন করার কথা তার দলমালিকের ফোন নাম্বার দিলেন, আমি দলমালিকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলাম, তিনি জানালেন, প্রশাসনিক অনুমতি মেলেনি, দু’একদিনের মধ্যে অনুমতি পেলে তারা দল নিয়ে আসবেন, যাত্রা করবেন। আমি দু’চারদিন অপেক্ষা করি, কিন্তু দলটি আর অনুমতি পায়নি যাত্রা পরিবেশনার, অগত্যা সুযোগ হলো না গোপালপুর চৌধুরী মেলার যাত্রাপালা দেখা। কিন্তু মেলার একপ্রান্তে সার্কাস, পুতুলনাচের প্যান্ডেলের পাশে ভ্যারাইটি শোর কয়েকটি প্যান্ডেল দেখে ব্যাপারটা কী দেখার জন্য টিকেট কেটে আসরে ঢুকলাম। দেখি একদল মাংশালো মানুষের উদম নৃত্য, আর তা দেখে ভাবতে থাকি, যে অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে যাত্রা পরিবেশনার অনুমতি দেওয়া হয় না সেই অশ্লীল কাজটি ভ্যারাইটি শোর আসরে কী সাবলীলভাবেই না দিন-দুপুরের প্রদর্শিত হয়। তবে, যাত্রাপালা পরিবেশনার অনুমতি দেবার ক্ষেত্রে যে অশ্লীলতার অভিযোগ তোলা হয়, তা কেবল বৃহত্তর দর্শক সংশ্লিষ্ট শক্তিশালী ও সমাজসচেতন পরিবেশনাশিল্প যাত্রাকে চিরতরে বন্ধ করে দেবার একটি অজুহাত মাত্র। শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ‘জাতীয় যাত্রা উত্সব’ শুধু পালা পরিবেশনা কর্মসূচির মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাশাপাশি ছিল শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ পালা, শ্রেষ্ঠ দলসহ আরও অন্যান্য বিষয়ে পুরস্কারের ব্যবস্থা। কোনো কোনো যাত্রা উত্সবের সঙ্গে সেমিনার ও কর্মশালার ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায়। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত সর্বশেষ ও পঞ্চম ‘জাতীয় যাত্রা উত্সব’। অবাক করা ব্যাপার এই যে,—একই বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী অপর একটি ‘যাত্রা উত্সব’-এর আয়োজন করে ‘লোকনাট্যোত্সব’ নামে। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন থেকে ৬ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সেই ‘লোকনাট্যোত্সব’-এ গাজীপুরের ‘সোনালী অপেরা’, ফরিদপুরের ‘আদি বলাকা অপেরা’, নারায়ণগঞ্জের ‘আজাদ অপেরা’, কুমিল্লার ‘রূপালী অপেরা’, নোয়াখালীর ‘ভাগ্যলিপি অপেরা’ এবং মানিকগঞ্জের ‘নবরূপা অপেরা’ ও ‘কোহিনূর অপেরা’র অংশগ্রহণ করে। উক্ত উত্সব উপলক্ষে প্রকাশিত স্যুভেন্যিয়রে একাডেমীর তত্কালীন মহাপরিচালক মোবারক হোসেন খান এবং নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভাগের পরিচালক এস, এম, মহসীন-এর বাণী লিপিবদ্ধ আছে, দু’জনার দুটিবাণীর কোথাও ‘যাত্রা’ শব্দটি ভুল করেও উচ্চারিত হয়নি। অথচ, উত্সবে অংশগ্রহণকারী সকল দলই ছিল ‘যাত্রাদল’, তাদের পরিবেশিত পালাগুলোও ছিল পূর্ণরূপে ‘যাত্রাপালা’। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আর কোনো জাতীয় যাত্রা উত্সব-এর আয়োজন করেনি। আর এই ফাঁকে বাংলাদেশের যাত্রাশিল্প তার প্রতি সরকারের সমর্থনবাচক পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা ও নৈতিবাচকতার স্বীকার হয়ে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে, এমনকি মুমূর্ষু, মৃত্যুমুখী বা বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকর্ম হয়ে গেছে। তাই শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত জাতীয় যাত্রা উত্সবের পুনর্প্রবর্তন খুবই প্রয়োজন।