লেনদেনে সম্প্রীতির মেলবন্ধন

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৩৯
‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা’—কবিগুরুর মতো করে এভাবে না ভাবলেও নতুন বছরে পুরোনো দিনের হিসাব শেষ করতে চান ব্যবসায়ীরা। গত বছরের সকল দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন বছর থেকে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন তারা। পুরোনো হিসাবের খাতা বন্ধ ও নতুন খাতা খোলার আনন্দ-আয়োজন; আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকতার নামই হালখাতা। হালখাতার হালহকিকত নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ১৪২১ সালের নতুন ঘণ্টা বেজে উঠেছে চারপাশে। আর সে কারণে ব্যবসায়ীরা শুরু করেছেন হালখাতা বা গদিসাইত অনুষ্ঠানের। ‘হালখাতা’ ব্যবসায়ীদের প্রাচীন বৈশাখী উত্সব। আগে বৈশাখের প্রথম দিন গ্রাম বাংলা-শহরে ছোট-মাঝারি-বৃহত্ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতার আয়োজন করা হতো। এ উপলক্ষে ছাপানো হতো নিমন্ত্রণপত্র। মুসলমানদের নিমন্ত্রণপত্রে থাকত মসজিদের মিনারের ছবি, আর হিন্দুদের কার্ডে মাটির পাত্রে কলাগাছের পাতা, ডাব এবংদনটিতে হালখাতার আয়োজন এখন তেমন চোখে পড়ে না, তবুও পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা হালখাতার এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বকাল থেকেই ‘হালখাতা’ পহেলা বৈশাখের আচারালঙ্কার হিসেবে বিবেচিত। হালখাতার পাশাপাশি জমিদারকে খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ প্রচলিত ছিল। নববর্ষের প্রথম দিন প্রজাকুল সাধ্যমতো ধোপদুরস্ত পোশাকে সজ্জিত হয়ে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টিতে আপ্যায়িত হতো। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ায় ‘পুণ্যাহ’ এখন বিলুপ্ত হয়েছে। তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে হিন্দু ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’র সমৃদ্ধ ইতিহাস ছোট আকারে হলেও পালন করে আসছে। ইতিহাস মতে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের (আনুমানিক) ১০ ও ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। সম্রাট আকবরের সময়ে এই গণনা পদ্ধতি প্রচলিত হয় এবং সে সময় এই পদ্ধতির নাম ছিল ‘ফসলি সন’। পরবর্তীতে এটিকে ‘বাংলা সন’ নামে নামকরণ করা হয় এবং সে থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন খাজনা, মাশুল, শুল্ক পরিশোধ করা হতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে। জমির মালিকরা এসব খাজনা, মাশুল, শুল্ক গ্রহণ করতেন। একটি খাতায় এসব খাজনা, মাসুল ও শুল্ক পরিশোধকারীদের নাম লিখে রাখা হতো। সেই খাতাতেই হালনাগাদ হিসাব তুলে রাখা হতো। আজকের আধুনিক ‘হালখাতা’ সেকালের সেই খাজনা, শুল্ক ও কর পরিশোধকারীদের নাম লিখে রাখার খাতার বর্তমান সংস্করণ। সেসময় জমির মালিকরা এই দিনে কৃষকদের মিষ্টি মুখ করাতেন যা বর্তমানেও প্রচলিত রয়েছে। কাগুজে কিংবা ধাতব মুদ্রার প্রচলন না থাকায় প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃষিপণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিল। এই ব্যবস্থায় কৃষকরা যেসব পণ্য উত্পাদন করত তা অন্যের উত্পাদিত পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করত। রশিতে গিরা দিয়ে তারা তার হিসাব রাখত। কেউ কেউ মাচানের খুঁটিতে দাগ কেটেও হিসাব রাখার ব্যবস্থা করত। পরে তালপাতায় বা তুলট কাগজের চিরকুট এই হিসাব ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই দিনে গণেশ ও বিত্তের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। সারাটি বছর যেন আজকের দিনের মতো নগদ আয় হয় সেই প্রত্যাশায় তারা এই পূজা করেন। দেবতার চরণে দেয়া সিঁদুর ও চন্দন নতুন বছরের খাতায় লাগিয়ে তারা নতুনভাবে হিসাব শুরু করেন। অতীতে এই উত্সবটি বৈশাখের ১ম দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বর্তমানে এই উত্সব দুই-তিন দিনও হয়ে থাকে। মোটকথা ‘হালখাতা’ সেই পুরাতন ব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপ। সময়ের বিবর্তনে হালখাতার গুরুত্ব কমে এলেও পহেলা বৈশাখে শহরকেন্দ্রিক ইলিশ-পান্তার উত্সব আজ বাঙালি প্রাণের অবিচ্ছেদ্য আনন্দ হয়ে উঠেছে। তবে সুগন্ধি পানের গুরুত্ব কমেনি। পহেলা বৈশাখে ইলিশ-পান্তা খাওয়া শেষে হাজারও নারী-পুরুষ একখিলি পান মুখে দিতে ভুল করে না। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের আকাশ ছোঁয়া দরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাকিতে ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের বিষয়টি আবার মাথা তুলতে শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়িক পর্যায়ে বাকিতে বেচাকেনা চললেও তার অর্থ পরিশোধের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। হালখাতার পৌরাণিক আবহের সঙ্গে যাকে তুলনা করা সম্ভব নয়। তাই হালখাতার সেই সমৃদ্ধ দিন আজ অনেকটাই স্মৃতিনির্ভর হয়ে পড়ছে।