কলেজ স্ট্রিটের হালখাতা। একাডেমি অফ ফাইন্ আর্টের সামনে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়া। সঙ্গে কাঁচা-লঙ্কা-পেঁয়াজ।
কলকাতার বাইরে জেলাশহরে সামাজিক সংগঠনের নিজস্ব ভাবনায় বৈশাখ-বরণ উদ্যাপন।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের শান্তি নিকেতনে বৈশাখী আয়োজন ; বিশ্বে বাংলার দ্বিতীয় রাজধানী কলকাতায় এইভাবেই বাঙালির বর্ষবরণ হয়ে আসছে।
সরাসরি বৈশাখ উদ্যাপনের সঙ্গে জড়িত না হলেও পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে ’চৈত্র-সেল’ নামক ওপারবাংলার কেনা-কাটার মহত্সবে হামলে পড়েন গৃহকর্তা থেকে বাড়ির গিন্নি; সবাই। অর্ধেক দামে ঘর-গেরস্থর প্রায় সবসামগ্রী পাওয়ার সুযোগ একমাত্র চৈত্র মাসে পাওয়া যায়। বিশ্বাস না হলেও সত্যি, এই সুযোগে অনেকেই পূজো-ঈদ-বড়দিনের কেনাকাটাও সেরে ফেলেন চৈত্রসেলের বাজার থেকে। আর বৈশাখ-বরণের পোশাকও ’চৈত্রসেল’ থেকে কিনে নেয়া হয়। তাই বর্ষবরণের সঙ্গে চৈত্রসেলেও জড়িয়ে পড়েছে।
কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ায় হালখাতা নতুন খাতাপত্র বিক্রির ধুম পড়ে যায় চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে। লাল রঙে বাঁধাই করা রিম-রিম সাদা-কাগজ বাঁধাইয়ে খাতাগুলো মাথায় করে পৌঁছে দেয়ার দৃশ্য ত্রিশে চৈত্র এগিয়ে আসার সাথে-সাথে যেন বাড়তে শুরু করে।
হালখাতার গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ মিষ্টি। কলকাতার রসগোল্লা নিয়ে যতই গল্প উড়ুক আকাশে। বাস্তবে কলকাতার রসগোল্লার চেয়ে হলদিরামের শুকনো লাড্ডু-সনপাপড়ি দিয়েই পুরনো বছরের জড়া-তিক্ততা বিদায়ের ’মিষ্টি মুখ’ চলে আসছে এক-দেড় দশক ধরে।
শহরের হালখাতার সঙ্গে বরাবরই গ্রাম-বাংলার হালখাতার বর্ণময় পার্থক্য ছিল। এখনও সেটি রয়ে গিয়েছে। গ্রামের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে এখনও রসডোবা রসগোল্লা দিয়েই হালখাতা করেন ব্যবসায়ীরা।
‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’ নামের এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রায় দুই দশক ধরে কলকাতায় এই দিবসটি ’জাতীয় নববর্ষ দিবস’ হিসাবে উদযাপন করে আসছে। ঈদ কিংবা পূজো নয়, বাঙালির জাতীয় উত্সব হোক বাংলা বর্ষবরণ এই স্লোগানকে সামনে রেখেই তাদের নিরব আন্দোলনও এগিয়ে চলছে গুটিগুটি পায়ে।
বলাবাহুল্য, এরাই মূলত পহেলা বৈশাখের আয়োজনকে আস্তে-আস্তে বর্ণাঢ্য রুপ দিয়ে চলেছে ওপারবাংলায়। একাডেমি অফ ফাইন আর্টের সামনে দিনভর বর্ষণবরণে চলে জারি-সারি-ভাটিয়ালি থেকে সব ধরনের লোকসঙ্গীত। লোকনৃত্য-নৃত্যনাট্য। পান্তা-ইলিশ। আলু-মাখা। ইত্যাদি আয়োজনে বাঙালির চিরাচরিত রসনাবিলাসকে তুলে আনা হয় বর্ষবরণের এই আয়োজনে।
কবি গুরুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শান্তি নিকেতনেও বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য আয়োজন চোখে পড়ে। আম্রকাননে সকালে জমায়েত হয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েল পড়ুয়ারা। এর আগে ভোরে শোভাযাত্রা গিয়ে মিশে যায় মন্দিরে। সেখানে কবির ভাষায় চলে প্রার্থনা। এরপরই সমবেত সুরে এসো হে বৈশাখ-এসো এসো গানে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। প্রায় দিন-জুড়েই চলে নানা আয়োজন।
আগেকার বামদের শাসন। কিংবা হালের তৃণমূলের সরকার। বাংলায় সাইনবোর্ড লেখার বিরুদ্ধে যেমন তাদের মাথাব্যথা ছিল না। নেইও। সেই রকম সরকারি পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বঙ্কিম কিংবা অমর্ত্য সেনের বাংলায় বাঙালির এই উত্সবে সরকারি পৃষ্ঠপোষক ছিল বরাবর নগণ্য। তাই বলে বেসরকারি উদ্যেগেও খুব সাড়ম্বরে বর্ষবরণ উত্সব হয়, হচ্ছে, তেমনও নয়। রাজ্যের ঘরে-ঘরে এই দিনটি পালিত হয় ঈদ-পূজো কিংবা বড়দিনের মতই। বাজারে উপচে পড়া ভিড় পড়ে পহেলা বৈশাখে। দোকানে-দোকানে অগ্রিম টাকা দিয়ে নতুন খাতায় হিসেব খুলে মিষ্টি মুখ করতে যাওয়া বাঙালিদের মজ্জায় মিশে গিয়েছে ওপারেও। আর বছরের প্রথম দিন কব্জি-ভিজিয়ে পেটপূজোতেও আপসহীন মনোভাব দেখা যায় প্রায় প্রত্যেক বাঙালি বাড়িতে। আর সে কারণে ইলিশ থেকে পাঠার মাংসের দোকান। মিষ্টির থেকে ফলের দোকান। কোথাও যেন লম্বা লাইন টপকে যাওয়ার জো-নেই। বর্ষবরণের দিনে হেঁসেলে ব্যস্ত সময় কাটানা জননী-গৃহিণী। দুপুরে একসঙ্গে স্বামী-সন্তান-পরিজনের সামনে রসনার ঢালি সাজিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর না দিতে পারলে বাঙালির বর্ষবরণের পুরো আয়োজনটা যেন মাটি হয়ে যায় গৃহকর্তীর। এটাই বাঙালির উত্সব। বাংলার উত্সব। ওপার বাংলার উত্সব।
