বিরলপ্রজ প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার। তাঁর রচনা পাঠকদের উদ্দীপ্ত করে, চিন্তার খোরাক জোগায়। চিন্তার স্বচ্ছতায় বিশ্লেষণের গূঢ়তায়, বক্তব্যের বলিষ্ঠতায় তাঁর প্রবন্ধ হয়ে উঠেছে বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের অভিজ্ঞতা, বাঙালির লোক-সংস্কৃতি চর্চাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় এই চিন্তানায়কের সাথে। তাঁর সাথে কথা বলেছেন অতনু তিয়াস—
প্রথমে আপনার শৈশব থেকে শুরু করে এ যাবত্ দেখা পয়লা বৈশাখের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
যতীন সরকার : যেহেতুে আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে, তাই পয়লা বৈশাখও আমি গ্রামে থেকেই দেখেছি। গ্রামাঞ্চলে তখন চৈত্রসংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখ—এই দুটো দিনকেই বিশেষভাবে স্মরণ করা হতো। তবে সেই স্মরণে সভা-সমিতির অনুষ্ঠান হতো না। প্রতিটি বাড়িতে ঘর-দোর সাফ করা হতো, গৃহপালিত পশু—গরু-ছাগলদের ধুয়ে স্নান করিয়ে তাদের শরীরে নানারকম ছাপ দেয়া হতো। পুরোনো বছরটা যাতে তার সব অমঙ্গলসমেত চলে যায়, তেমনই সকলে কামনা করত। পরদিন নববর্ষের শুরুতে গুরুজনদের প্রণাম করা হতো, তাঁরা আশীর্বাদ জানাতেন। সেদিনের খাওয়া-দাওয়াটা সকলেই যথাসম্ভব ভালো রকমে করতে চেষ্টা করত। মনে করা হতো যে, বছরের প্রথম দিনে ভালো খাওয়া-দাওয়া করলে সারা বছরই ভালো খাওয়া-দাওয়া হবে, সকলেরই জীবন সুখে কাটবে। এইদিনে নানা স্থানে মেলাও বসতো। এই মেলায় আমরা বাঁশি, বেলুন, খেলনা ইত্যাদি কিনতাম, খুবই আনন্দ হতো। অথচ কৈশোরেই লক্ষ্য করলাম যে, পাকিস্তানি ভাবধারার কুপ্রভাব গ্রামেও এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, সংক্রান্তি বা নববর্ষে এ ধরনের অনুষ্ঠান হিন্দুয়ানি মাত্র, এগুলো থেকে ঈমানদার মুসলমানদের দূরে থাকতে হবে। অর্থাত্ পূর্বের সেই ঐতিহ্যানুসারিতার তাল কেটে গেল। তবে যখন শহরে এসে কলেজে পড়তে এলাম, তখন শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে নববর্ষ উদ্যাপনের অন্য ধরনের উদ্যোগ লক্ষ্য করলাম। গান-বাজনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে নববর্ষ উদ্যাপনের উত্সবে আমরা সবাই যোগদান করলাম। সেখানেও অবশ্যি পাকিস্তানপন্থিরা নানাভাবে বাগড়া দিচ্ছিল, এগুলোকে প্রকৃতিপূজা বলে অভিহিত করছিল। কিন্তু আমাদের জাতীয় চেতনার ক্রমবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে শহুরে প্রগতিশীল মধ্যবিত্তদের মধ্যে নববর্ষসহ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী অন্য অনুষ্ঠানগুলো উদ্যাপনের বিস্তৃতি দেখা দিল। বলা যেতে পারে, এসব অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরই জোয়ার বয়ে গেল। গত শতকের ষাটের দশকের মধ্যভাগে রমনার বটমূলে ছায়ানট যে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের সূত্রপাত ঘটায়, তা অচিরেই সারা দেশের শহর-বন্দরে অনুসৃত হতে থাকে।
বাংলদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নববর্ষ উত্সবটি আমাদের জাতীয় উত্সবেরই রূপ পেয়ে গেল। কিন্তু স্বাধীনতা-বিরোধীরা এটিকে কোনোমতেই মেনে নিতে পারেনি। তাই তো দেখি, রমনার বটমূলের অনুষ্ঠানে তারা হামলা করে। সেই হামলায় অনেক মানুষ নিহত হয়। কিন্তু এর ফলেও নববর্ষ উদ্যাপন করা থেকে বিরত থাকার বদলে দেশের মানুষ পরের বছর থেকে আরো আড়ম্বর ও উদ্দীপনার সঙ্গে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করতে থাকে।
আপনার কি মনে হয় না যে, আমাদের লোকসংস্কৃতি চর্চার পরিসর দিন দিন কমে আসছে? এর কারণ কী? বাঙালি লোকসংস্কৃতির চর্চায় গ্রাম ও শহরের বর্তমান চিত্রটি কেমন?
যতীন সরকার : শহুরে মধ্যবিত্তরা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যেভাবে নববর্ষ উদ্যাপন করে, গ্রামে কিংবা দরিদ্র মানুষের মধ্যে নববর্ষ উদ্যাপনের সেরকম কোনো উত্সাহ বা তত্পরতা দেখা যায় না। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতেই হয় যে, আমাদের সংস্কৃতি বিভাজিত হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংস্কৃতির ব্যবধানটি খুবই প্রকট হয়ে উঠেছে। অথচ শহুরে মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই আমরা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি বলে ধরে নিচ্ছি। এ বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের তেমন সচেতনতাও গড়ে ওঠেনি। এরই সুদূরপ্রসারী কুফল ফলছে। শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রভাব বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হয়ে চলছে। চাঁদের বুকে যে জঘন্য যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে দেখানো যেতে পারে, এটি তো এই সাংস্কৃতিক বিভাজনেরই ফল। এ বিষয়ে আমাদের এখনই সচেতন হওয়া উচিত। গ্রামীণ মানুষের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা যদি গভীরভাবে পরিচিত হতে চেষ্টা না করে, তাহলে আমাদের এই সংস্কৃতির দুর্দশা ঘোচানো যাবে না, স্বাধীনতার অমৃত ফলও সকলে সমানভাবে ভোগ করতে পারবে না।
লোকসংস্কৃতি নিয়ে আমরা যে একাডেমিক চর্চা করি, তাতে অনেক ফাঁক ও ফাঁকি রয়ে গেছে। লোকসংস্কৃতিই যে বাঙালির মূল সংস্কৃতি, এ বিষয়টি আমাদের চৈতন্যে যথাযথভাবে উপস্থিত নেই। এটিও আমাদের সাংস্কৃতিক বিভাজনের অন্যতম কারণ।
লোকধর্ম এবং শাস্ত্রীয় ধর্ম—এই দুইয়ের মধ্যে সাজুয্য এবং বৈপরীত্য সম্পর্কে জানতে চাই? বাঙালি সমাজে লোকধর্মের প্রভাব কতটুকু?
যতীন সরকার : লোকসংস্কৃতির সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত লোকধর্ম। হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম বা খ্রিস্ট—এমন সকল ধ্রুপদী ধর্মই লোক-সমাজে এসে লৌকিক ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এ ধর্মে কোরানে-পুরাণে ঝগড়া বাঁধে না। প্রখ্যাত মনীষী বিনয় সরকার এই লোকধর্মকেই বলেছিলেন ‘বাঙালি ধর্ম’। এ ধর্মে—‘হিন্দুর দেবতা হলো মুসলমানের পীর, দুই কুলে পূজা পায় হইয়া জাহির’। পাকিস্তানি ভাবাদর্শ এই বাঙালি ধর্মের ওপরে আঘাত হানে, ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতার বিস্তার ঘটায়। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেও এই সামপ্রদায়িকতার হাত থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি বলেই আমাদের সংস্কৃতিকেও যথার্থ অসামপ্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতিরূপে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
আমাদের বাঙালি লোকসংস্কৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা পরিচিত?
যতীন সরকার : বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট উত্সাহ-উদ্দীপনা আছে অবশ্যই। বিশেষ করে, চেকোশ্লোভাকিয়ার দুশন জ্বাধিতেল মৈমনসিংহ গীতিকা নিয়ে অসাধারণ চর্চা করেছেন। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশেই লালন এবং হাছনসহ বাংলার বিভিন্ন লোককবি সম্পর্কে অনেক চর্চা হচ্ছে। তবু বলব, এসব চর্চায় অনেকটাই যান্ত্রিকতা বিদ্যমান। পাশ্চাত্য দেশের মানুষরা আমাদের লোকসংস্কৃতির গভীর তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মনোভঙ্গির বৈপরীত্যই এর কারণ।
বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ—দুইদেশে দুইদিনে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করা হয়, এই বিষয়টি আপনি কিভাবে বিবেচনা করেন?
যতীন সরকার : বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজনের উপলব্ধিটি সর্বপ্রথম করেছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। কিন্তু তাঁর উদ্যোগ সফল হয়নি। কারণ, প্রচলিত পঞ্জিকাকাররা এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে গ্রহণ করতে পারেননি। তাই পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতে বাংলা পঞ্জিকার পুরোনো রূপটিই রয়ে গেছে। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বাংলাদেশে যে সংস্কার করা হয়েছে, সেই অনুযায়ী আমরা প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল দিনটিকে পয়লা বৈশাখ রূপে চিত্রিত করে নিয়েছি। সেই অনুযায়ী প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল আমরা নববর্ষ উদ্যাপন করি, এতেই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের নববর্ষের দিনটির ব্যবধান ঘটে গেছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি তো স্বাধীন বাংলাদেশেরই অধিবাসী, তাই আমরা আমাদের মতো করেই নববর্ষ উদ্যাপন করি এবং করব। ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গে যদি ভিন্ন দিনে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়, তাতে আমাদের বলার বা করার কিছুই নেই।
এবার পয়লা বৈশাখ আপনি কিভাবে কাটাবেন?
যতীন সরকার : বরাবর যেভাবে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করি, এবার আর তা হচ্ছে না। আমার চোখের অপারেশন করা হয়েছে, তাই কালো চশমা পরে গৃহবন্দী অবস্থায় আছি। এ অবস্থায় পয়লা বৈশাখে কোথাও যেতে পারব না বলে খুব দুঃখ হচ্ছে।
অসুস্থ অবস্থায় সময় দেওয়ার জন্য ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
যতীন সরকার : তোমাকেও ধন্যবাদ।
