একাত্তরের মার্চ মাসের অনেকগুলো দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। দিনগুলো হলো ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ, ১০ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিল ও ১৬ ডিসেম্বর। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনা রেসকোর্সে দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১০ এপ্রিল গঠন করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার এবং ১৭ এপ্রিল এই সরকার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন। আর ১৬ ডিসেম্বর পাক-বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর মরণপণ লড়াইয়ের পরে পাকবাহিনী যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন। আজ তোমাদের ১৭ এপ্রিলের কথা শোনাবো।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ছিল শনিবার। বৈদ্যনাথতলা গ্রামের এক ছায়াঢাকা আমবাগানে আয়োজন করা হয়েছিল উত্তেজনা, আনন্দ আর আশংকা মেশানো এক অনুষ্ঠানের। একটি ছোট্ট মুক্তমঞ্চে বসলেন নেতৃবৃন্দ। সামনে উড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। আর পতাকার পেছনে লাইন দিয়ে দাঁড়ালো একদল মুক্তিযোদ্ধা। তাদের কাঁধে শত্রু হননের অস্ত্র, চোখে-মুখে আগুন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমবাগানটি জনারণ্যে রূপ নিল। আশপাশের বাড়ি ও গ্রাম থেকে ছুটে এলো মুক্তিপাগল মানুষরা। একটু পরই মঞ্চে উঠে এলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি ঘোষণা কররেন:‘পলাশীর আম্রকাননের যুদ্ধে ১৭৫৭ সালে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা হারিয়েছিল, আজ সেই প্রাচীন জায়গায় আরেক আম্রকাননে ১৯৭১ সালে সেই স্বাধীনতা ফিরে এলো। জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র।” এসময় আনসার-মুক্তিযোদ্ধারা তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। তারপর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। বঙ্গবন্ধু তখন নরঘাতক পাকিস্তানীদের কারাগারে বন্দি। অতঃপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুর ইসলাম তাঁর মন্ত্রী পরিষদের নাম ঘোষণা করেন। তাজউদ্দীন আহমদকে দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব, প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন আওয়ামী লীগের এমএন এ কর্নেল (অবঃ) ওসমানী এবং চীফ অব স্টাফ কর্নেল (অব) এম এ রব। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, পাকিস্তান ঘাতক ইয়াহিয়ার হাতে নিহত হয়েছে। মৃতের পাহাড়ে পাকিস্তান এখন গোরস্থান। জনসংখ্যায় আমরা এখন পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্ রাষ্ট্র। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ এখন আমাদের দখলে। হানাদারদের সম্পূর্ণ বিতাড়িত না করা পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী থামবে না। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী বলেন, দরকার হলে আমরা ২০ বছর ধরে লড়াই করব। জনতার উল্লাস, শঙ্কা এবং মুহুর্মুহু “জয়বাংলা” ধ্বনির মধ্যদিয়ে শেখ হলো শপথ অনুষ্ঠান। বাংলার ইতিহাসে সংযোজিত হলো নতুন অধ্যায়, সোনালি অধ্যায়।
আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। স্বাধীনতার সুফল ভোগ করেছি। একাত্তরে যে চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে পাকিস্তানী নরঘাতকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, তা আমরা হারিয়েছি ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার মধ্যদিয়ে। ১৭ এপ্রিল যাঁরা শপথ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান পাকিস্তানী দোসর খুনিদের হাতে নিহত হন। পঁচাত্তরের পর আমরা হারিয়েছি আমাদের সত্তা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিকদের। আমরা বড়ো বেভুলো জাতি। আমরা সহজেই ভুলে যাই ইতিহাসের ধারাকে, ইতিহাসের শিক্ষাকে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এখন আমাদের স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত। ঔজ্জ্বল্যে যা ম্লান হবার কথা নয়, পঁচাত্তরের পর বিকৃত করা হয় ষড়যন্ত্রকারীদের কূটকৌশলে ১৭ এপ্রিলের মহান বীরদের কথা দীর্ঘদিন আমরা ভুলে থাকি। আমরা ভুলে যেতে বাধ্য হই সেই ঐতিহাসিক দিনে যাঁদের কর্মকাণ্ডে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম তাদের কথা। আমরা ভুলে যাই বৈদ্যনাথতলা গ্রামের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনকারী সংগ্রাম কমিটির মমিন চৌধুরী, তোয়াজউদ্দীন ও আইউব হোসেনের কথা। যাঁরা ১৬ এপ্রিল দিবাগত রাতে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজনে ছিলেন এবং ভয়ভীতি অগ্রাহ্য করে পাশের বাড়ি থেকে চৌকি, বেঞ্চ ও চেয়ার এনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমরা ভুলে গেছি ‘ভবেরপাড়া’ ক্যাথলিক চার্চের সিস্টার তেরেজিনার কথা। যিনি মিশনের অসহায় ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা মালা তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমরা ভুলে গেছি দারিয়াপুর গ্রামের আসাদুল হকের কথা, যিনি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশনকারী দলের নেতৃত্ব দেন। আমরা আরও ভুলে যাই স্থানীয় দফাদার, চৌকিদার ও আনসারদের কথা, যাঁরা গার্ড অব অনার দেয়ার কাজে অংশ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এবং অনুষ্ঠানের পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রিন্সিপাল এইড নামজাদা আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ও তত্কালীন প্রশাসক ও ড. তৌফিক-এ-ইলাহী চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের ৮নং সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী ও ঝিনাইদহ পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবউদ্দিন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সেই শপথ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলেন, শপথ অনুষ্ঠান দেড় থেকে পৌনে দু’ঘণ্টা সময় স্থায়ী ছিল। শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন পূর্ব পরিকল্পনা, স্থান নির্বাচন সবই হয়েছিল গোপনে। তার নামটিও গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি রহমত আলী ছদ্মনামে কাজ চালাচ্ছিলেন। ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি কোলকাতা প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা আগামীকাল ১৭ এপ্রিল সকালে প্রেসক্লাব চত্বরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে উপস্থিত থাকবেন । আশ্চর্যের বিষয় ছিল ঐ সকালেই ৩৯টি দেশের প্রায় একশ’ দেশি-বিদেশি সাংবাদিক প্রেসক্লাবে জড়ো হয়েছিলেন। ‘মুজিবনগরে’ (বৈদ্যনাথতলা) না পৌঁছা পর্যন্ত কাউকেই অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানানো হয়নি। ‘মুজিবনগর’ প্রকৃতই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কিনা, তা নিশ্চিত হতে অনেক সাংবাদিক সীমান্তরেখা পর্যন্ত মেপে দেখেন। তখনই তারা বুঝতে পারেন তারা মুক্ত অঞ্চলে অবস্থান করছেন। তারই গাড়িতে চড়ে ‘মুজিবনগরে’ আসা বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে লন্ডন টাইমসের পিটার হেজেল হার্টস এবং নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। অনুষ্ঠানস্থলে ছোট্ট একটা মঞ্চ করা হয়েছিল। ন্যূনতম নিরাপত্তার ব্যুহ ছিল। শপথ অনুষ্ঠানের পর তাত্ক্ষণিক সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। শপথ অনুষ্ঠান সম্পর্কে ড. তৌফিক-ই-এলাহী বলেন, মুহূর্তগুলো ছিল একটা গরিব পরিবারে শিশু জন্ম নেয়ার মতো। আনন্দ-উল্লাস ঠিকই ছিল, তবে জাঁকজমক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। তিনি আরো বলেন, শাব্দিক অর্থেই একটা দেশের জন্ম দেখেছি ঐ আমবাগানে, ক্ষণে ক্ষণে শিহরণ ছিল। ‘সংক্ষিপ্ত সময়ের অনুষ্ঠানের মাঝে আমবাগানের আলোছায়া, দেশি-বিদেশি লোকজন, কর্মব্যস্ততা সবকিছুই একজন সাক্ষীর মতো দেখেছিলাম। সকাল ১০টার দিকে খবর এলো অতিথিরা আসছেন, তখন গাড়ির বহর আসা শুরু হলো।
মহকুমা প্রশাসক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন— একটা সিকিউরিটি লাইন করারও চিন্তা-ভাবনা ছিল। বাগানের গাছের ফাঁকে ফাঁকে তাকিয়েছি। আকাশে পাকিস্তানী প্লেন উড়ল কিনা। অনুষ্ঠানের আগের দিন বিএসএফ-এর কর্নেল চট্টোপাধ্যায়ের সাথে তার যোগাযোগ হয়। কোথায় কী করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা চলে। জায়গাটি এমন হতে হবে যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরাপদ থাকে। পাকবাহিনীর আর্টিলারীর যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। সংক্ষিপ্ত অনাড়ম্বর অথচ গুরুত্বপূর্ণ ঐ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার, শপথ গ্রহণ, বক্তৃতা ও সাংবাদিক সম্মেলন সবই ছিল। মেহেরপুরের বৈদনাথতলা এখন মুজিবনগর হিসেবে সুপরিচিত। এখানে নির্মাণ করা হয়েছে সেই শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতি রক্ষায় স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি-স্থাপনা বা ভাস্কর্য। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ প্রতিবছর ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানকে স্মরণে রেখে মুজিবনগর দিবস পালন করছে। আগামীকাল মুজিবনগর দিবস। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করি স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিকদের।
মোস্তাফিজুর রহমান জুয়েল
