জল পাহাড়ের স্বপ্ন কেলি...

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৪, ২০:০৮
সকাল থেকে বৈরী আবহাওয়াও চিড় ধরাতে পরেনি আমাদের শিক্ষা সফরের আনন্দকে। অনেকের ধারণা ছিলো, হয়তো বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্য মামার তীব্র তাপে আমরা অঙ্গার হবো। কিন্তু সেই সকাল থেকে সূর্য মামার কোন দেখা নেই। সকাল সাতটায় কলেজ ক্যাম্পাসের ‘হতাশার মোড়’ এ সহপাঠিরা জড়ো হতে থাকি। হতাশার মোড়? নামটিরও একটি ছোট ইতিহাস রয়েছে। ক্লাসের ফাঁকে, আড্ডার ফাঁকে শিক্ষার্থীরা এ মোড়ে বসে বসে হা-হুতাশ করে। এর ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে, যার কারণে এর নামকরণ করা হয়, ‘হতাশার মোড়’। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আজ আনন্দের উচ্ছ্বাস। চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগ আজ আঁকা-বাঁকা পথ পেরিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্বপ্ন ছুঁয়ে আসবে। এ আনন্দ রাখি কোথায়? সকাল সাড়ে সাতটায় পাঁচটি গাড়ি যোগে অর্থনীতি বিভাগ প্রায় ২৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলো রাঙ্গামাটির পথে। মুরাদপুর পেরিয়ে বায়োজিদ। তারপর ধীরে ধীরে হাটহাজারী, কিছুক্ষণ পর রাউজান। রাঙ্গামাটির বিপজ্জনক পথগুলো যেন আমাদের বন্ধু হয়ে উঠলো। গাড়ির মধ্যে সারাক্ষণ উচ্ছ্বাসের মাঝে ভুলে গিয়েছিলাম, বাইরের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির এ অপরূপ সৌন্দর্য। প্রায় দুই ঘণ্টা গাড়িতে চড়ে আমরা পৌঁছালাম রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে। কলেজের শিক্ষকরা আমাদের সানন্দে গ্রহণ করলেন। প্রায় বিশ মিনিট অবস্থান করার পর আবার যাত্রা শুরু করা হলো। এবারের গন্তব্য ‘সুবলং’। আমরা ঘাটে পৌঁছানোর আগেই বোট প্রস্তুত। সবাই হুড়-মুড় করে বোটে উঠে পড়লো। আহ্! বোটে করে যাওয়ার মজাই আলাদা। দু’পাশে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন আমাদের মুগ্ধ করছে। সত্যি মনে হচ্ছিল এ যে এক স্বপ্নের রাজ্য। দূরের পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডেকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পৌঁছালাম রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতুর কাছে। বোট থেকে নেমে সবাই সে কি ফটোসেশন। বান্ধবীরা তো পারলে সেতু জড়িয়ে ধরে ছবি তুলবে! অপরূপ রূপের এ যেন এক অনাবিল হাতছানি। এবার শুরু হলো সুবলং-এর পথে যাত্রা। দুই পাশের পাহাড়গুলো আজ যেনো কালের সাক্ষী। একি রূপে রাঙালে প্রকৃতি। তোমার সৃষ্টির কোন তুলনা হয় না প্রভু। সাইফুল স্যারের গানের গলায় মুগ্ধ সকল ছাত্র-ছাত্রীরা। আজিজ স্যার রীতিমত মেয়েদের মত ক্যাটওয়ার্ক করে দেখালেন। যা একজন প্রফেশনাল মডেলকেও হার মানাবে। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ ফেলতে পারলেন না সবার প্রিয় মাসুম মুকুল স্যার। স্পিকার হাতে গেয়ে উঠলেন ‘কফি হাউজ’ গানটি। মুহূর্তেই শত শত শিক্ষার্থীর কণ্ঠ ধ্বনিত হয়ে উঠলো সবখানে। ঐদিকে রাব্বি স্যারও গেয়ে ফেললেন দুই একটি গান। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছিলো সুদীপা ম্যাডাম, একরাম স্যার ও সুকুমার স্যারের বেলায়। গান গাওয়ার ভয়ে তারা স্পিকার থেকে ১০০ হাত দূরে ছিলেন। তবুও দূর থেকে বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আখতারী বেগম ম্যাডামের সাথে তারাও সঙ্গ দিয়ে গিয়েছেন। সুবলং পৌঁছাতেই বেজে গেল বিকাল দুইটা। আধ ঘণ্টা ঘুরার পর আবার যাত্রা রাঙ্গামাটি কলেজের উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে ক্ষিধায় পেট চো চো করছে সবার। এর মধ্যে আবহাওয়া বৈরী রূপ ধারণ করলো। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সাথে কনকনে ঠান্ডা বাতাসে সবাইকে এবড়ো থেবড়ো করে ফেললো। কলেজে পৌঁছানোর আগেই সেমিনার সহকারী, সকলের প্রিয় সুমন ভাই ও মিনহাজ আমাদের জন্য খাবারে পসরা সাজিয়ে বসলেন। নিজেদের আনন্দটুকু মাটি করে যেন আমাদের আনন্দের মাঝে সুখটুকু খুঁজে নিলেন। খাওয়া শেষে র্যাফেল ড্র শুরু হয়। ১০ টাকা দামের টিকেট কিনে অনেকে জিতে নিলেন মূল্যবান পুরস্কার। এবার ফেরার পালা। হালকা বৃষ্টি পারেনি আনন্দকে মাটি করতে। বাসে গানে গানে মুখরিত ছিলো প্রতিটি সময়। কখনো নাচ, কখনো গান আবার কখনো লাফালাফি। সন্ধ্যায় সাড়ে আটটা। আমরা ফিরে আসলাম আমাদের প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজে। সত্যিই স্বপ্নগুলো হাতে করে নিয়ে এসেছি। এ এক অনাবিল স্বপ্ন। আনন্দগুলো এমনি সাময়িক হয়। কিন্তু কিছু ফেলে আসা কিছু নিয়ে আসা এর মধ্যে বেঁচে থাকে আমাদের ভালোবাসা। হূদয় এখনো ঘুরে বেড়ায় রাঙ্গামাটির আঁকা-বাঁকা পথে।