দেশে নিবন্ধিত সমবায় সমিতির ৪৭ শতাংশই অকার্যকর হয়ে গেছে। নিবন্ধনের শর্তাবলী মাঠ পর্যায়ে যাচাই না করেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুরোধে কিম্বা নির্দেশে অনেক সমবায় সমিতির নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। ২১টি বহুমুখী এবং সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতির আনুমানিক ৯ লাখ সদস্য ও গ্রাহকের বিনিয়োগকৃত প্রায় ৯ হাজার ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সমবায় সমিতি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়। আবার এলাকাভেদে এই অর্থের পরিমাণ ৩৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘সমবায় সমিতি ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়। এতে একটি কেস স্টাডিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৫ সালে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ নিবন্ধন নিয়ে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত আট লাখের বেশি বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ২ হাজার ৫৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত লাভ দেয়ার প্রলোভন দেয়া হয়। ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ডেসটিনি ২০০০লি.-এর অ্যাকাউন্টে সরানো হয়েছে। ট্রি প্লানটেশনের প্রকল্পের ৪৯ শতাংশ শেয়ার সমিতির নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। সদস্য সংগ্রহের জন্য পরিবেশকদের ৭৪০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এ সমবায়ের ৮ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ৩০ শতাংশই ভুয়া। বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় অর্থ সংগ্রহ করে অন্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়াই ২৫১ কোটি ১৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন ও নিহার রঞ্জন রায়। উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান। এসময় জানানো হয়, প্রতিবেদন প্রণয়নে সমিতির ধরন, স্তর, তদারকি সংস্থা ও ভৌগোলিক বিন্যাস এই চারটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ৬টি বিভাগের ৮টি জেলার ১১টি উপজেলার মোট ৩৭টি সমবায় সমিতি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যে সকল অনিয়ম পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, যথাযথভাবে নিরীক্ষা সম্পাদন না করা এবং সমবায় সমিতির সাথে আর্থিক চুক্তিতে সমিতির হিসাব প্রস্তুত করে দেয়া; বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে আইন বহির্ভূতভাবে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ হারে সুদ আদায়; নিরীক্ষার সময় প্রকৃত লাভ গোপন করা; রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সমিতি গঠন; এবং সমিতিকে আয়কর ফাঁকি দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সমবায় খাতের এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, পর্যবেক্ষণ, তদারকি, পরিচর্যা, নিরীক্ষা, প্রণোদনা এবং উত্সাহ প্রদানে নিয়ন্ত্রক ও তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অন্যদিকে সমবায় সমিতিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি। সংবিধানে সমবায়ের উল্লেখ রয়েছে মন্তব্য করে সুশাসিত সমবায় ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সুলতানা কামাল। তিনি বলেন “কার্যকর নিরীক্ষার মাধ্যমে সমবায় সমিতিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে জন-প্রত্যাশার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে সমবায় সমিতি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি আইন ও বিধিমালা, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সমবায় সমিতি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সমবায় অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিআরডিবি)-এর মধ্যে সমন্বয় সংক্রান্ত ২২ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ‘সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩’ এর আলোকে সমবায় সমিতি বিধিমালা সংশোধন ও একটি যুগোপযোগী ‘সমবায় নীতিমালা’ প্রণয়ন; রাষ্ট্রীয় বাজেটে সমবায় সেক্টরের জন্য বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী অর্থের সংস্থান এবং কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকগুলোকে পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে সচল করা; সমবায় সমিতির নিবন্ধন প্রদানের পূর্বে মাঠ পর্যায়ে সমিতির যোগ্যতা যাচাইপূর্বক প্রাক-নিবন্ধন নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পাদন এবং সমবায় সমিতির নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, নিরীক্ষা, পরিবীক্ষণ ইত্যাদি কাজকে সহজতর ও গতিশীল করার জন্য সমবায় অধিদপ্তর ও বিআরডিবি’র মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন ইত্যাদি।
