একটি ঘূর্ণিচক্রের গল্প
গরিবের ছেলে আর বড়লোকের মেয়ের ক্লাইমেক্স। মাঝে হঠাত্ ভিলেনের আগমন। এর ভেতরে দু-চারটে গান। বাঁচাও। ছেড়ে দে শয়তান। কিংবা তুই আমার মন পাবি...
এইসব ডায়লগ আর ছবির এক ফর্মেট বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এখন বড় স্যাটায়ার পোস্টার। বারে বারে টক শো, কিংবা ছবি রিলিজের আগে কোনো ইন্টারভিউতে চ্যানেল বুমটি সামনে এলেই পরিচালকের বক্তব্যেরও কোনো পরিবর্তন দেখা যেত না। পরিচালক সেই ডায়লগ কপচাচ্ছেন হয়তো—আমার এই ছবির গল্প একেবারেই ভিন্ন। এই প্রথম আমি অমুক করেছি। তমুক করেছি... ইত্যাদি। বাংলা সিনেমার এই ঘূর্ণিচক্রের বাইরে এসে বদলাতে শুরু করেছে এখনকার চলচ্চিত্র।
ভিন্নতার ধাক্কা
এখন চলচ্চিত্রে বড় একটি জেনারেশন গ্যাপ থাকলেও কিছুটা হলেও বদলাতে শুরু করেছে চলচ্চিত্র। অ্যাকশন ছবি হলেও গ্যাংস্টার মুভি বাংলাদেশে হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। তবে ঠাণ্ডা মাথার খুনি, পাশাপাশি প্রেম নিয়ে নতুন রসায়নে তরুণ নির্মাতা রেদওয়ান রনি তার ‘চোরাবালি’ দিয়ে দর্শকদের বেশ বড়োসরো ধাক্কা দিয়েছেন। রেদওয়ান রনির কথায়, ‘আমাদের চলচ্চিত্রে বাজেটের চেয়েও বড় সংকট নতুন কিছু করতে না দেওয়া। কোনো প্রোডিউসার যখন টাকা দিতে চান, তখন বলেন—আপনার যা ইচ্ছে করেন। ছবি যাতে চলে। পাবলিকে খায়। আমি কোনোরকম কিছুতে নাক গলাতে আসব না। কিন্তু ছবিটা শুরু করা মাত্র নানা রকম বায়নাক্কা শুরু হয়। ফলে পরিচালক তখন টাকা না প্রযোজকের সাথে কম্প্রোমাইজ শুরু করে দিতে হয়।’ রেদওয়ান রনির এই আক্ষেপের গল্পের পরও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ‘চোরাবালি’ উপহার দিয়েছেন। এবারে আসেন চলচ্চিত্রের বাজেট ও তার রিটার্ন প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রের ব্যবসা বা লগ্নি থেকে লাভে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সকলেই এখনও ওয়ানওয়ে টিকেটের হিসেবেই রেখেছে। আজ পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্রে নায়ককে একটি কোকাকোলা বা আরসি কোলা খাইয়ে, সেই কোম্পানি থেকে একটি টাকাও আনার প্রস্তাব দিতে পারেননি। এইসব উদাহরণ এখনকার নির্মাতারাই শুরু করছেন। তরুণ নির্মাতা শাহীন কবির টুটুল ও মোস্তফা কামাল রাজ তাদের ছবির কর্পোরেট স্পন্সর নিয়ে এরই মধ্যে ছবি ব্যবসায় লোকসানের আশঙ্কা অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছেন। একই সাথে তাদের দেখাদেখি শাকিব খানও তার প্রথম প্রযোজিত চলচ্চিত্র ‘হিরো :দ্য সুপারস্টার’-এও শুরু করেছেন।
ছবির চরিত্রগঠন
আমাদের দেশে চলচ্চিত্রে এখনও সেই অর্থে কোনো বিশেষ চরিত্র তৈরি হয়নি। আজ পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্রের ক্যাটাগরি ভাগ হয়নি। প্রেম আর অ্যাকশনেই বন্দি যেন অধিকাংশ। ভৌতিক, থ্রিলার, গ্যাংস্টার, রাজনৈতিক, কমেডি ইত্যাদি ধরনে আলাদা ছবির ভাগ করে দিলেই যেন প্রযোজকের ভয়—এই বুঝি দর্শকেরাও কিনা বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু গত কয়েক দশকে আধুনিক কিশোর যে আজ তরুণ হয়েছে, সেই তরুণ ডিভিডির দোকানে বা পাইরেটেড ওয়েব লিংক থেকে নিজের পছন্দের ক্যাটাগরির ছবি ডাউনলোড করে দেখছে, সে কথা এখনও অনেকে বিশ্বাস করতে চান না।
তবে এখনকার অনেক তরুণই এই বিষয়টি ভাঙার পক্ষে। যেমন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও নির্মাতা স্বপন আহমেদ এদেশে প্রথমবারের মতো সাই-ফাই মুভি তৈরি করছেন। ‘পরবাসিনী’ নামের এই চলচ্চিত্র নিয়ে যেমন ব্যবসার আশঙ্কা আছে, তেমনি উচ্ছ্বসিত সাফল্যের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা নির্মাতা যে নতুন কিছু করার ঝুঁকিটা নিয়েছেন সেখানেই তার সার্থকতা। প্রসঙ্গক্রমেই এই ছবি নিয়ে নিজের আশঙ্কার কথা শুনতে চাই স্বপনের কাছে। তিনি বলেন, ‘এই ছবিতে আমার ফিফটি ফিফটি চান্স থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি পুরো বিশ্বজুড়ে ছবির ডিস্ট্রিবিউশনের কাজ করব বলেই আর টেনশন নেই। আমার কথা হলো এদেশে এখন অনেক ছবি হলে দেখতে বসলেই পাশের দর্শকটি বলে, এরপর এই সিক্যুয়েন্স হবে। এ যেন পাতানো ক্রিকেট ম্যাচের মতো বাজিকর দর্শক ছবির বর্ণনা করছেন। এর চেয়ে ছবি না করা ভালো। একটা ঝুঁকি না নিলে তরুণরা সকলেই বয়কট করবে একদিন।’
গল্পের রহস্যজাল...
তবে স্বপন আহমেদের সেই আশঙ্কা এখন অনেকেই দূর করছেন। কারণ এখন যেমন ছবির প্রচারণা বা পোস্টারেও এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তেমনি একাধিক নির্মাতা তাদের ছবির ধরণ বদলাচ্ছেন। তরুণ নির্মাতা দিলশাদুল হক শিমুল দীর্ঘদিন তারেক মাসুদের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। শিমুল প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন যার ধরন ‘পলিটিক্যাল থ্রিলার। যা এর আগে কখনও করা হয়নি। আর এই ছবির প্রচারণার কাজেও মৌসুমীর যে পোস্টার ব্যবহার করছেন, সেটিও একটি নির্বাচনী পোস্টারের ঢঙে। ছবির প্রচারণা আর গল্পের এই পরিবর্তনই তাই সেই আধুনিক, পাইরেটেড বিদেশি মুভি ডাউনলোডার দর্শককে হলে ফেরাবে। শিমুল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমি ছবিতে একটি চ্যালেঞ্জ রেখেছি তা গল্পের রহস্যজাল। প্রতিটা ফ্রেম এবং ডায়লগ কখনও দর্শকেরা আগাম ধারণা থেকে বলতে পারবে না।’ এত এত আশা-আকাঙ্খার পরও ছবি ফ্লপ বা হিট—দুটোই সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এই যে ছবির আঙ্গিক বদলে যাচ্ছে। শিমুল করছেন পলিটিক্যাল থ্রিলার মুভি ‘লিডার’, স্বপন আহমেদ করছেন প্রথম সাই-ফাই চলচ্চিত্র ‘পরবাসিনী’, জাকির হোসেন রাজুর নির্মাণে দীর্ঘদিন পর দর্শকেরা দেখলেন কমেডি চলচ্চিত্র ‘দবির সাহেবের সংসার’, রেদওয়ান রনির গ্যাংস্টার চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’ বা তরুণ নির্মাতা মনসুর আলী তৈরি করলেন ভিন্ন ধারার এক মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘সংগ্রাম’। এই ছবিগুলো তাই হিট-ফ্লপের বিচারে নয়, ছবির ভাষা বা সত্যিকার অর্থেই ভিন্ন কিছু তৈরির কারণে অনন্য এক উদাহরণ তৈরি করছে বা করবে। তরুণ প্রবাসী নির্মাতা মনসুর আলীর ‘সংগ্রাম’ ছবিতে সাংবাদিক চরিত্রে আনা হয়েছে বলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা অনুপম খেরকে। তার বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের এক গল্প উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি করতে শুধু কামান আর ভারী গোলাবারুদের প্রয়োজন উপরই নির্ভর করতে হয় না।
নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত নির্মাতা। মিষ্টি প্রেমের গল্পে চকোলেট হিরো-হিরোইনদের নিয়েই তিনি অভ্যস্ত। সেখান থেকে বেরিয়ে একেবারে আলাদা ঢঙে কমেডি ছবি তৈরির সাহস দেখিয়েছেন। এটাই সবচেয়ে বেশি প্রশংসার। দর্শকেরা এখন ছবির ধরন বুঝতে পারছেন টিকেট কাটার আগে। তাই এতে দর্শক বিভাজন নয়, বরং আধুনিক দর্শকেরা হলে ফিরছেন। তারা হল থেকে বেরিয়ে ফেসবুক বা আড্ডায় ছবি নিয়ে আলোচনা করছেন। যদিও আমাদের ছবি বদলানোর এই কারিগরদের সংখ্যা একেবারেই কম। তবে এই ভিন্ন পথে হাঁটা পথিকদের একটি বিরাট সাফল্যই বদলে দেবে গোটা ইন্ডাস্ট্রি। সেই দিনটিও বেশি দূরের নয়। খুব কাছে। বদলে যেতে যে শুরু করেছে আমাদের চলচ্চিত্র!
