সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বিষয়ে আপিলের রায় যেকোন দিন

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:৩২
জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়ে আপিলের রায় অপেক্ষমাণ রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে যে কোনো দিন এ রায় ঘোষিত হতে পারে। বুধবার নথি তলবে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ রায় অপেক্ষমাণের আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহ্াব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন সাঈদীর ফাঁসির রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখবে। তিনি বলেন, কাদের মোল্লার চেয়ে সাঈদীর অভিযোগ গুরুতর। অন্যদিকে সাঈদীকে আইনগতভাব ন্যূনতম শাস্তি দেয়ারও কোন সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান। তিনি বলেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার দায়ে সাঈদীর ফাঁসির দণ্ড হয়। অথচ এই মামলার নিম্ন আদালতের নথি তলবের জন্য আমরা আপিল বিভাগের কাছে আবেদন করেছিলাম। আমাদের আবেদন গৃহীত হলে দেখা যেত ওই মামলার এজাহার ও চার্জশীটে সাঈদীর নাম নেই। এর আগে গত রবিবার রাষ্ট্রপক্ষ স্বাধীনতার পর দালাল আইনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের নথি এবং আসামিপক্ষ ওই মামলার জেনারেল রেজিস্ট্রার (জি.আর) নথি তলবের আবেদন করে। এই দুই আবেদনের ওপর দেয়া আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, ‘উভয় আবেদন খারিজ করা হলো, রায় যে কোনদিন।’ গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের দুটি ঘটনায় পাক বাহিনীকে সহায়তার দায়ে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণ ইত্যাদি ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে পিরোজপুরের চিথোলিয়ার মানিক পসারির বাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও তার ভাই ইব্রাহিম কুট্টিকে পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে হত্যা এবং উমেদপুরের হিন্দুপাড়ায় অগ্নিসংযোগ ও বিসাবলীকে সাঈদীর ইন্ধনে হত্যার দায়ে ফাঁসির মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হলো। তবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় প্রমাণিত হওয়া অন্য ছয়টি অপরাধের জন্য আলাদা করে কোনো শাস্তি দেয়নি ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা অন্য ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে সেগুলো থেকে বেকসুর খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও আলাদা কোন দণ্ড না দেয়া সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিলে এসব প্রমাণিত অভিযোগে সাঈদীর সাজা দাবি করা হয়। অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে বেকসুর খালাস চেয়ে আপিল করেন সাঈদী। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর পৃথক দুটি আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার আপিলের শুনানি শেষ হয়। আপিলের শুনানি শেষ হলেও ওইদিন আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য দিন ধার্য না করে ইব্রাহিম কুট্টির হত্যার বিষয়ে নিম্ন আদালতের নথি তলবের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ ও উক্ত জিআর নথি তলবের জন্য আসামি পক্ষের আবেদনের ওপর আদেশের জন্য দিন ধার্য রাখেন। সেই মোতাবেক গতকাল মামলাটি আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্য তালিকার এক নম্বরে ছিলো। সকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পক্ষে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে তা লিখিত আকারে দাখিল করেন। এরপর সাঈদীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর একটি সাক্ষাত্কার লিখিত আকারে দাখিলের আবেদন জানান, তবে আদালত তা গ্রহণ করেনি। পরে আদালত নথি তলবের দুটি আবেদন খারিজ করে দেয়। আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রাইব্যুনাল যে সব অভিযোগে সাঈদীকে খালাস দিয়েছে সে বিষয়ে কোন আপিল করিনি। কেননা ওইগুলোকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনি। আমরা গুরুত্ব দিয়েছি সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা, গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোনকে ধর্ষণ, বিপুল সংখ্যক মানুষকে ধর্মান্তকরণ বিষয়ে। এ সময় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান ও মুরাদ রেজা উপস্থিত ছিলেন। সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে, সে সব ঘটনা সত্যি হতে পারে। তবে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী তাতে জড়িত নন। দেলাওয়ার শিকদারের পরিবর্তে দেলাওয়ার সাঈদীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই বিচার ইতিহাস হয়ে থাকবে, এখানে ন্যায় বিচার করা হয়েছে কি-না, সেটা বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। এ সময় অ্যাডভোকেট এস এম শাহাজাহান, তাজুল ইসলাম ও সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী উপস্থিত ছিলেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, তারা কাদের মোল্লার সময়ও একই ধরনের বিতর্ক তোলার চেষ্টা করেছিল। তারা তখনও বলেছিল, কসাই কাদের আর কাদের মোল্লা এক নয়। কিন্তু সেটা তারা প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসঙ্গত গত ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। তবে আপিল শুনানি শেষেও সুপ্রিম কোর্ট গত ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। গত ১২ ডিসেম্বর ওই দণ্ড কার্যকর হয়।