বাংলাদেশের পুঁথি সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক পরিচয় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের মানুষ বিচিত্র রীতিতে যেভাবে পুঁথি রচনা অব্যহত রেখেছেন, এভাবে নানান রীতিতে পুঁথি পাঠ বা পুঁথির উপস্থাপনা করে আসছেন। যদিও অতীতের তুলনায় পুঁথি সংস্কৃতির সেই ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে, কিন্তু পুঁথি সংস্কৃতির চর্চা বাংলাদেশের গ্রাম ও নাগরিক জীবন থেকে একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। এখনো এদেশের গ্রামীণ সাধক-কবিদের অনেকে মুখে মুখে এবং কাগজে-কলমে কিছু ছন্দোবদ্ধ পুঁথি রচনা করে থাকেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পার্বণে, কৃত্যে ও উত্সবে পুঁথি পাঠসহ গীত ও নৃত্য সহযোগে উপস্থাপন করেন। এদেশের বাঙালিদের পাশাপাশি বিচিত্রভাষী ও বিচিত্র ধর্মাচারী জনগোষ্ঠী প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কিছু কৃত্যে অনিবার্যভাবে পুঁথি সংস্কৃতির উপস্থাপনা করে থাকেন। যেমন—এদেশের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে জারি-মার্সিয়া আকারে প্রতি বছর হিজরি (আরবি) মহররম মাসের প্রথম দশ দিন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো মহররম মাস জুড়ে কারবালা বিষয়ক হাতে লেখা, মুদ্রিত বা স্মৃতিবাহিত পুঁথি একক ও সম্মিলিতভাবে উপস্থাপন করেন; আবার রামপূর্ণিমার তিথিতে মৈতৈ মনিপুরি জনগোষ্ঠী জগন্নাথ মন্দিরের সামনে পুরো মাসব্যাপী কাশীদাসী মহাভারত পাঠ করেন; ভোজপুরী জনগোষ্ঠী নিত্য সন্ধ্যায় মন্দিরের সামনে গীতাকারে তুলসীদাসী রামায়ণ উপস্থাপন করেন, এ সময় এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করেন; এছাড়া এদেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের পুঁথি-পাঁচালী পাঠ করে লক্ষ্মী, মনসা, সত্যনারায়ণ ইত্যাদি দেব-দেবীদের আরাধনা করেন। এরকম দৃষ্টান্ত দিয়ে শেষ করা যাবে না। তবে, সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস, যেমন—বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ইত্যাদি উপলক্ষে গ্রামের অনেক কবি-শিল্পীরা নতুন নতুন পুঁথি রচনা করে গ্রামে ও শহরের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের পুঁথি সংস্কৃতির এই নব রূপায়ণ নিয়ে নতুন গবেষণার সম্ভাবনা রয়েছে। সে যা-ই হোক, এবার আমরা বাংলা পুঁথি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ঐতিহ্য নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
প্রসঙ্গত বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, বাংলা ভাষা-সাহিত্যের আদিরূপ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা ধরনের মত প্রচলিত। তবে, বাংলার প্রাচীনতম সাহিত্যকীর্তিসমূহ যেমন—সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচলিত চর্যাপদ, শূন্যপুরাণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদিকে পুঁথি হিসেবেই অভিহিত করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হিসেবে গৌড়ের মুসলমান সুলতানদের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে তখন তার অধিকাংশও পুঁথি বলে পরিচিত হয়। কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারতকে সে সময়ে পুঁথিকাব্যই বলা হতো। তেমনি মোহাম্মদ খান, আলাওল, দৌলত উজীর বাহরাম খা, মোহাম্মদ সগীর, শাহ গরীবুল্লাহ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকদের কাব্যবলিকেও পুঁথিকাব্য বলা হতো। বস্তুত কাহিনিমূলক পদ্য রচনাগুলোই প্রধানত বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগে পুঁথিকাব্য বলেই পরিচিত ছিল। অবশ্য কাহিনিকাব্য ছাড়াও সে যুগে ছিল সঙ্গীতময় রচনা যেমন—বৈষ্ণব পদাবলী রামপ্রসাদের শ্যামাসঙ্গীত। এগুলো কখনো পুঁথি বলে উল্লিখিত হতো না।
প্রথম দিকে পুঁথিগুলোর ভাষা ছিল প্রধানত সংস্কৃতপ্রধান। রামায়ণ, মহাভারত, পদ্মাবতী, সতী-ময়না, লোর-চন্দ্রানী প্রভৃতি পুঁথি কাব্যগুলোর ভাষায় সংস্কৃতের প্রাধান্যই অবশ্য লক্ষ করা গেছে। তবে সেগুলোতেও প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের আবির্ভাব দেখা যায়নি—এমন নয়। এদেশে মুসলমানদের আগমনের ফলে এদেশের জনসাধারণের মুখের ভাষায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ স্বাভাবিকভাবেই অনুপ্রবেশ করেছে। দীর্ঘ আট শত বছর ধরে পাঠান ও মোগল শাসন এদেশের অধিবাসীদের ভাষায় বিস্ময়কর পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও, তাতে অস্বাভাবিকতা কিছুই ছিল না। এই শাসনামলে সরকারি ভাষা ছিল ফারসি। ফলে, শিক্ষা-দীক্ষায় আইন-আদালতে ফারসির প্রচলনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই এদেশবাসীর মুখের ভাষায় অজস্র আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশাধিকার লাভ করেছিল। শুধু তা-ই নয়, আরবি-ফারসি মিশ্রিত বাংলা ভাষাই এদেশবাসীর মুখের ভাষা হয়ে উঠেছিল। সে আমলের প্রথম দিকে সংস্কৃতপ্রধান বাংলা ভাষায় পুঁথিকাব্যগুলো লিখিত হয়ে থাকলেও সে ভাষা সে সময়কার জনসাধারণের মুখের ভাষার থেকে অনেক দূরেই রয়ে গিয়েছিল। তার ফলে ক্রমে প্রথম যুগের সে পুঁথিকাব্যগুলো পরবর্তীকালে জনচিত্তে আনন্দের শিহরণ আর তেমনভাবে জাগাতে পারছিল না। কারণ, সাহিত্যের ভাষা জনসাধারণের মুখের ভাষার থেকে বেশি দূরে সরে থাকলে তা আর জীবন্ত ভাষার মর্যাদা পেতে পারে না। ঠিক মুখের ভাষাও হয়তো সাহিত্যের ভাষা হওয়ার যোগ্য নয়, কিন্তু জনসাধারণের মুখের ভাষার সন্নিহিত মার্জিত ভাষাই সাধারণের সাহিত্যের জীবন্ত ভাষার মর্যাদা লাভ করে। সব কালে সমস্ত ভাষায় যে যুগোপযোগী পরিবর্তন দেখা যায় এটাই তার কারণ।
সে যুগেও বাংলা ভাষায় এ সংকট দেখা দিয়েছিল। জনসাধারণের মুখের ভাষার থেকে তার সাহিত্যের ভাষা অনেক দূরে সরে পড়ার ফলে সাহিত্য ক্রমে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল। এ ভাষাসংকট থেকে সাহিত্যকে উদ্ধার করার জন্য সে সময়ে যিনি সাহসের সাথে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগের কবি শাহ মোঃ গরীবুল্লাহ। তিনি তাঁর আমীর হামজা ও অন্যান্য কাব্যে সেকালের জনসাধারণের মুখের ভাষার সন্নিহিত ভাষাই ব্যবহার করলেন, ফলে তাঁর কাব্য রচনাগুলো প্রাণবন্ত ও সুন্দর হয়ে উঠল। সূচনাতেই তিনি যে জনপ্রিয়তা লাভ করলেন, তা ছিল অভাবিত। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তাঁর আমীর হামজা ও অন্যান্য পুঁথিগুলো প্রায় প্রতি গৃহে সাগ্রহে পঠিত হতে লাগল। কারণ, তাঁর এ পুঁথিগুলো ছিল জনসাধারণের সুবোধ্যতম ভাষায় রচিত, সে যুগের পুঁথি-সাহিত্যের ভাষায় ছিল এটা একটা বিপ্লব। তাঁকেই অনুসরণ করে এরপর অজস্র পুঁথিকাব্য রচয়িতা বাংলা সাহিত্যে এগিয়ে এলেন। এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পুঁথিকাব্য সাহিত্যের এ ধারা অব্যাহত গতিতেই চলেছিল।
শাহ গরীবুল্লাহর আগে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মোহাম্মদ খান, শাহ মোহাম্মদ সগীর প্রমুখ যেসব কবি তাঁদের কাব্যসম্পদ রেখে গেছেন, তাঁরা চলিত ভাষায় লিখেননি বলে যদিও তাঁদের লেখা তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি, তবু সেগুলোও পুঁথিসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত বলেই পণ্ডিতরা মনে করেন। তাছাড়া তাঁদের রচনায় কবিত্ব সম্পদও যথেষ্ট রয়েছে। এ কারণে পুঁথিসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁদেরও রয়েছে পাকা আসন, তবে জনপ্রিয়তার অভাবে তাঁদের কাব্য বর্তমানে একেবারেই দুষপ্রাপ্য। শুধু পুঁথি-গবেষকদের দলিল দস্তাবেজেই তাঁরা বেঁচে রয়েছেন। পক্ষান্তরে চলিত ভাষায় লিখিত পুঁথিগুলো আমাদের দেশের পল্লিতে পল্লিতে প্রায় প্রতিঘরেই আজও পঠিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগণ্য পুঁথি রচয়িতা ও পুঁথি পাঠকদের মধ্যে মানিকগঞ্জের সাইদুর রহমান বয়াতী ও নেত্রকোণার হেলিম বয়াতির নাম উল্লেখ করা যায়। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলার আলোচনা ও সাংস্কৃতিক মঞ্চসহ পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে এবং বেতার-টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই দুই জন পুঁথি রচয়িতাকে প্রায়ই তাঁদের স্বরচিত পুঁথি পাঠ করতে দেখা যায়। আমাদের বিশ্বাস, এদেশের গ্রামগঞ্জে তাঁদের মতোই আরো বহু পুঁথি রচয়িতা ও পাঠক রয়েছেন।
দুই
বিগত শতকের শেষার্ধ থেকেই প্রাচীন সাহিত্য-উদ্ধার-অভিযান চলছে। তার কিছুটা সরকারি, কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক আর কিছুটা ব্যক্তিগত। দুঃখের বিষয়, হিন্দুঘরের পুঁথিগুলো সংগৃহীত হলো, কিন্তু মুসলমান ঘরে কেউ উঁকি মেরেও দেখলেন না। অথচ সর্বত্রই হিন্দু-মুসলমানের একই গাঁয়ে বাস।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদই প্রথম অকৃত্রিম সাহিত্যানুরাগ ও স্বদেশ-প্রাণতা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান অবিশেষে সবার পুঁথি সংগ্রহে ব্রতী হন। তাঁর এ দুস্তর সাধনার পশ্চাতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রেরণা ছিল না, ছিল না কারোর আর্থিক সাহায্য কিংবা সহযোগিতা।
এ তো গেল পুঁথি সংস্কৃতির সংগ্রহ ও রচনার সমৃদ্ধ সময়ের কথা। কিন্তু এই সংস্কৃতির ধারা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও শহর থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আমরা একথা বলতে চাই না, তার চেয়ে পুঁথি সংস্কৃতির নবরূপায়ণ এবং প্রাচীন চর্চার যে ধারা এখনো গ্রামদেশে ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শহরের মন্দিরে-উপাসনালয়ে প্রচলিত, তা নিয়ে নতুন অনুসন্ধান ও গবেষণার ব্যাপারে আগ্রহী হলে, আমাদের বিশ্বাস—নিশ্চয় এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসের নতুন পরিচয় উন্মোচিত হতে পারে।
