যে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে...

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:২৪
সাহিত্য সম্বন্ধে আমাদের একটা প্রচলিত ধারণা আছে। কবিতা গল্প উপন্যাস নাটক এসবই হলো সাহিত্য। সাহিত্যের এ হলো বিভিন্ন রূপের দিক, যাকে বলা হয় ‘প্রকরণ’; যেখানে গল্পকে উপন্যাস থেকে সহজেই আলাদা করে ফেলা যায় অথবা কবিতাকে নাটক থেকে। ভাষা আর শৈলীও সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা করা তাই কঠিন কিছু নয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো সাহিত্যবিশ্ব বলতে কী বুঝবো আমরা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা প্রবেশ করবো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যে বা সাহিত্যবিশ্বে। তবে সাহিত্যবিশ্বের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটটি বুঝতে হলে ‘সাহিত্য’ বলতে কী বোঝায় সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। প্রচলিত ধারণার বাইরে সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দু’-একজন লেখক ভাবুক কী বলেছেন, সেসবও আমরা বিবেচনা করে দেখতে পারি। প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা একবার একটা সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘সাহিত্য হচ্ছে এমন একটা প্রতিষ্ঠান যা একজন মানুষকে যে-কোনো উপায়ে যা ইচ্ছে বলার অনুমোদন দেয়।’ সাহিত্য এভাবেই একসময় ফ্রান্সে দর্শনের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে জাঁ পল সার্ত্রে, কামুর লেখায়। দেরিদা নিজের প্রসঙ্গেও বলেছেন তাঁর দার্শনিক রচনাতেও সাহিত্য ও দর্শন মিলে-মিশে আছে। অমিয় চক্রবর্তী সাহিত্য প্রসঙ্গে আরেকটু বিস্তৃত করে লিখেছিলেন, ‘অভিজ্ঞতাকে ভাষায় ফলানোর কাজই হোলো সাহিত্যের। অভিজ্ঞতার কোনো স্তর, কোনো বার্তাকে ঠেকিয়ে রাখা সাহিত্যের অসাধ্য। সাহিত্যের প্রকাশ। ... লক্ষ্য একই : মানুষের অস্তিত্বের সন্ধান দেওয়া। তার স্বত্বকে প্রকাশ করা।’ কিন্তু এই যে প্রকাশ, তার স্বরূপ কী হবে? রবীন্দ্রনাথ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে মানুষের ইচ্ছারূপ এমন করে প্রকাশ পায় যাতে সে মনোহর হয়ে ওঠে, এমন পরস্ফুিট মূর্তি ধরে যাতে সে ইন্দ্রিয়গোচর বিষয়ের চেয়ে প্রত্যয়গম্য হয়।’ এভাবেই সহিত্য ‘সমাজের আত্মসৃষ্টিতে বিশিষ্টতা দান করে।’ সাহিত্য একারণেই অনন্য, অন্যান্য শিল্পের তুলনায় গভীর। এতে একই সঙ্গে মিশে থাকে রূপ আর অনুভবের উপাদান। সাহিত্যের এই অনন্যতা, বলা বাহুল্য, সত্যিকার অর্থেই অনস্বীকার্য। কিন্তু অনন্যতার এই সূত্রটি কখনও কখনও সমালোচকদের কাছে অধরা থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে ঔপন্যাসিক হেনরি জেমস ‘কার্পেটের নক্শা’ (১৮৯৬) শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এই প্রবন্ধে লেখক ও সমালোচকের সম্পর্ক সম্বন্ধে চমত্কার একটা কাল্পনিক গল্প আছে। গল্পের প্রধান কুশীলব হচ্ছেন দুজন — লেখক (নাম ভেরিকার) এবং সমালোচক। লেখক চাইছেন, তার লেখার সূক্ষ দিকগুলো সমালোচক আবিষ্কার করুক। কিন্তু প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে তিনি লক্ষ করলেন, সমালোচক এটা করতে পারছেন না। এরকম একটা মুহূর্তে তার মনে হলো, কার্পেটের কারুকাজ প্রথমবার দেখে যেমন মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, সমালোচকের চোখও সেইভাবে ধাঁধিয়ে গেছে। সমালোচক এর নান্দনিক সৌন্দর্যটা বুঝতে পারছেন না, যে নান্দনিক সৌন্দর্যের সূত্রে তার সব বই একসূত্রে গেঁথে আছে। সমালোচক বুঝতে পারলেন তার সীমাবদ্ধতার কথা। বুঝতে পারলেন, সৃজনশীল সাহিত্য কতটা গভীর আর বহুমুখি। তিনি জানালেন, ‘আমার দেখা — এ হলো জীবন সম্পর্কিত ভাব বা আইডিয়া। একধরনের দর্শন।’ কোনো লেখার গভীর অর্থ পেতে হলে এভাবেই পাওয়া যেতে পারে। এই অনুসন্ধানটাই জরুরি। এর মধ্য দিয়ে একটা লেখা আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আবশ্যিকভাবেই এতে থাকবে শৈলীর ব্যবহার আর কিছু ভাবনার কথা। প্রকরণের সৌন্দর্য বা অনুভূতির অনন্যতা — এসবেরও প্রকাশ থাকবে সৃজনশীল রচনায়। সমালোচক বুঝতে পারলেন প্রকরণ ও বিষয়ের দ্বিচারিতা কীভাবে একটি লেখায় পরম্পরিত হয়ে থাকে। সমালোচক তখনি বলে ওঠেন, লেখা হলো স্টাইলের খেলা, ভাষার মধ্য দিয়ে যা প্রকাশিত হয়। ঔপন্যাসিক উত্তরে জানালেন, আমার লেখার মধ্যে পাওয়া যাবে কোনো না কোনো আইডিয়ার কথা। আইডিয়া ছাড়া আমি কিছুই লিখতে পারি না। এই হচ্ছে আমার আসল কাজ, আসল অভিপ্রায়। সমালোচক এভাবেই খুঁজে পেলেন সৃজনশীল রচনার মূলসূত্র। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুসারে পারস্যের কার্পেটে কিছু জটিল কারুকৃতি থাকে, সুসমন্বিত বুনট বা প্যাটার্ন। ওই বুননের ভেতরে ভেতরে থাকে জটিল সূক্ষ সূক্ষ কাজ। এর কিছুটা থাকে দৃশ্যমান, কিছুটা লুকোনো। লেখক জানালেন, আমার লেখায় যদি গোপন কিছু থাকে, তাহলে সেটা থাকে লেখার নিজস্ব প্রয়োজনে। আমি যে খুব সতর্ক হয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে এটা করি তা নয়। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনা এর মধ্যে কোনো কিছু আপনা আপনিই আভাসিত হয়ে যাবে। সমালোচকের কাজ হচ্ছে একটি লেখা কীভাবে অনন্য হয়ে ওঠে তার সূত্রগুলো আবিষ্কার করা। হেনরি জেমস এভাবেই সর্বপ্রথম ওই প্রবন্ধে লেখকের সঙ্গে সমালোচকের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এইখানে জেমসের সূত্রে আমাদের মনে পড়ে যাবে জীবনানন্দের কথা। তার ‘সমারূঢ়’ কবিতার কথক সমালোচককে লক্ষ করে বলেছিলেন, ‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটা কবিতা।’ লেখক ও সমালোচকের সম্পর্ক নিয়ে জীবনানন্দের কটাক্ষ আর জেমসের যে সংশয়, তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আসলে ‘লেখা’, যাকে আমরা কখনও কখনও বলি ‘রচনা’, ইংরেজিতে টেক্সট। জেমস মনে করেছিলেন টেক্সট বা লেখার ওপর সমালোচকের তেমন কোনো কর্তৃত্ব নেই, সমালোচক লেখার বৈশিষ্ট্য ঠিকমতো ধরতে পারেন না। কিন্তু তার কাজ হচ্ছে, প্রথমত, নির্দিষ্ট কোনো লেখা পড়ে কী বলা হলো তা আবিষ্কার করা; দ্বিতীয়ত, লেখার মধ্যে গোপনীয় অকথিত কিছু যদি থেকে থাকে তবে তা প্রকাশ করা। সমালোচক এভাবেই লেখার ভেতরকার রহস্য উন্মোচন করে দেখাবেন। কার্পেটের কথা উল্লেখ করে জেমস তাই বলেছেন, সাধারণভাবে তাকিয়ে দেখলে কার্পেটের একটা নক্শা থাকে। এই নক্শার রূপ বা গঠন ‘বেশ স্পষ্ট, মূর্ত’ বলে মনে হবে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই নক্শার পাওয়া যাবে আরও নানান রূপ। এভাবেই সাহিত্যের মধ্যে কী আছে আবিষ্কার করতে হবে যা এর আগে কেউ আবিষ্কার করেননি। কিন্তু সমালোচকের সমস্যা হচ্ছে তিনি লেখার ভেতরকার নক্শার চমকপ্রদ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বুনটটাকে ঠিক ঠিক দেখতে পান না যার ওপর ভিত্তি করে কোনো বই লেখা হয়। একটা লেখার মধ্যে আসলে থাকে জীবনের কোনো বিশেষ ভাবনা বা দার্শনিক দিক। কোনো লেখার উপরিতলের অর্থ ছাড়িয়ে তাই এর গভীরতর অর্থের অনুসন্ধান করতে হয়। সমালোচক ও পাঠক উভয়েই এই গভীরতর অর্থের সন্ধান করেন। হেনরি জেমসের ‘কার্পেটের নক্শা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি সাহিত্যের যে প্রধান দু’টি দিক আছে — সমলোচনামূলক প্রেক্ষাপট আর নান্দনিক ভিত্তিভূমি — সে-সবের প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রতিটি সাহিত্য রচনাকেই হতে হয় একক, অনন্য, আকস্মিক, অনির্ধারিত, সুসমঞ্জস, বিচ্ছিন্ন এক-একটি সৃজনীশিল্প। এই অনন্যতার পাশাপাশি এর জটিল বুননের ভেতরে অনুস্যূত থাকে ভাব ও বিন্যাসের অন্তর্গত সংগতি, সমন্বয়। অর্থাত্ লেখাটিকে হতে হয় অপূর্ব, এর কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত থাকে না, পূর্বজ কোনো লেখক এরকম কোনো লেখা আগে লেখেননি। জেমস তাই বলেছিলেন, কোনো কার্পেটে আমরা যে নক্শাটা পাই, তা একবারই পাওয়া যায়। এর জটিল বুননের মধ্যে থাকে গভীর সংগতি। কার্পেটের বাইরে এর কোনো নান্দনিক অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই নক্শাটাকে নানাভাবে দেখা যাবে। এইভাবে নান্দনিক যে বদলটা ঘটে সেটা হলো পরিপ্রেক্ষিতের পরিবর্তন; একটি লেখা এভাবেই নানা জনের কাছে ভিন্নভিন্ন ভাবে অনুভূত বা গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। নক্শাটাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে, আংশিকভাবে নয়। সাহিত্যকে বোঝা বা অনুধাবনের বিষয়টি হচ্ছে তাই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার — কে কীভাবে দেখেন, সেই পর্যবেক্ষণ। তবে এই দেখাটা হওয়া চাই সম্পূর্ণ দেখা, ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যাকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘সংরূপের সমগ্রতা’ বলে। সাহিত্যের এই সমগ্রতা হচ্ছে সাহিত্যিক সমগ্রতা আর নান্দনিক সমগ্রতা। সাহিত্যের অসাধারণত্ব হচ্ছে এর এককতায়, এর মৌলিকতায়। একটি লেখা এভাবে বিবেচনা করলে এক-একটা জটিল বুনন বিশেষ। এর সঙ্গে অনেক কিছু যুক্ত থাকে : কীভাবে রচনাটি লেখা হয়, কীভাবে তা অনূদিত হয়, প্রকাশিত হয়, তত্ত্বায়িত হয়, সমালোচিত হয় অথবা হয় নন্দিত-উদ্যাপিত। একটি সাহিত্য-রচনা তাই সমগ্র সাহিত্যবিশ্বের অনন্য, অপূর্ব অংশ। সাহিত্যবিশ্বের পটভূমিতেই রচনার এককত্বকে বিচার-পুনর্বিচার করে দেখতে হবে। সাহিত্যবিশ্ব এখন পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণ সাহিত্য সৃষ্টি করেছে, একটি একক রচনা হচ্ছে তার ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নানান দেশ ও অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ লেখকেরা এভাবেই বিভিন্ন অনন্যধর্মী সাহিত্য রচনার সূত্রে গড়ে তুলেছেন সাহিত্যবিশ্বের অভূতপূর্ব পরিসর, বৈশ্বিক সংরূপ। যে-কোনো রচনা, তাই পৃথিবীর যে-প্রান্তে বসে লেখা হোক না কেন, লেখা হয়ে যায় এই বৈশ্বিক সংরূপের পটভূমিতে। ফলে, ওই রচনাকে যদি বিশ্লেষণ করতে হয়, তাহলে তা করতে হবে বৈশ্বিক সংরূপ অর্থাত্ বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে, দেশকালের পটভূমিকে ভুলে না গিয়ে। সাহিত্যবিশ্বের এই যে পরিসর, রচনাসম্ভার, তা প্রত্যেকটি একক রচনার অর্থ দিতে সক্ষম, এদের মধ্যে যে সংগতি আছে, তাও বুঝে নিতে পারি আমরা। সাহিত্যবিশ্বের পরিসর তাই বিমূর্ত নয় অথবা তাত্ত্বিক; এই পরিসর বাস্তব। সাহিত্যের দ্বারা গঠিত হয়েছে যে পৃথিবী, সেখানে ঘটেছে মানবিক অস্তিত্বের প্রকাশ। সাহিত্যবিশ্ব একারণেই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কীভাবে এই সাহিত্য রচিত হবে, কেমন হবে এর প্রকরণের ধরন বা ভাষা, সেসব নিয়েও ঘনিয়ে উঠেছে তর্ক-বিতর্ক। বৃহত্তর এই পরিসরের কথা ভাবলে সাহিত্যবিশ্বের সীমানাটা যে রাজনৈতিক সীমানার মতো বিভক্ত এবং বিচ্ছিন্ন নয়; বরং মুক্ত, স্বাধীন, স্বতন্ত্র, সেটা আমাদের চোখে পড়বে। এই সাহিত্যেরও সাম্রাজ্য আছে। ক্ষমতার সম্পর্ককেও আমরা এই সাহিত্যে প্রতিফলিত হতে দেখি। কিন্তু সেই ক্ষমতা হচ্ছে লেখকের সৃজনীক্ষমতা, যে-ক্ষমতার শক্তিতে তিনি তার প্রকরণ ও রচনাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন আর তার লেখালেখি ছড়িয়ে পড়ে এই সাম্রাজ্যে — সাহিত্যসাম্রাজ্যে। লেখকের এই পৃথিবীরও আছে নিজস্ব রাজধানী, নিজস্ব প্রদেশ আর সীমান্ত, যেখানে ভাষাই তার প্রতাপ প্রতিপত্তি আর কর্তৃত্ব জাহির করে থাকে। এই প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি সদস্য, অর্থাত্ লেখককে সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা আর স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হয়। রাজনীতি আর জাতীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সাহিত্যকে দূরে সরিয়ে মু্ক্ত-স্বাধীন রাখবার জন্যে অনুসরণ করতে হয় কিছু কিছু রীতি-পদ্ধতির। তবে এখানেও আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর আধিপত্যের লড়াই আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন ভাষার লেখকেরা। দ্রোহ আর বিপ্লবও এখানে প্রায়শই ঘটে থাকে। সময় আর সংবেদনার তীব্র ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অনন্য সৃষ্টিশীল সাহিত্যেরই শুধু স্বীকৃতি আছে এই সাহিত্যবিশ্বে। আমার লক্ষ্য নয় এই সাহিত্যবিশ্ব আর বৌদ্ধিক চিত্প্রকর্ষের যে চর্চা দেশে-দেশে ঘটে চলেছে তার বিবরণ দেয়া, বিশ্লেষণ করা। বিপুল রচনাসম্ভারের কারণে বাস্তবে সেটা সম্ভবও নয়। আমি শুধু এই সাহিত্যের উত্থান ও বিকাশের একটা পূর্বাপর বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করবো, বিশেষ করে কোন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাহিত্য বিশ্বসাহিত্য হয়ে উঠেছে, সেই সাহিত্যবিশ্বের কথা পাওয়া যাবে এই লেখায়। ফরাসি ঐতিহাসিক ফারনান্দ ব্রোদেলের সেই কথাটিই আমি এখানে স্মরণে রেখেছি, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘দেখ সেই সাহিত্যবিশ্বকে যাকে এতকাল ধরে আমরা অগ্রাহ্য করে এসেছি; আর দেখাও সেই সূত্র আর রীতি-পদ্ধতিগুলোকে যা নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করেছে এই বিপুল চিত্প্রকর্ষের জগেক।’ এই জগতেও আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংগ্রাম, অসাম্য, তর্ক-বিতর্ক। তবে আমাদের লক্ষ করতে হবে সেই আলোকবর্তিকা যা আমাদের দেবে সাহিত্যকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টি। এখন অব্দি সাহিত্যবিশ্বের এরকম কয়েকটি অসামান্য দীপবর্তিকার স্রষ্টা হচ্ছেন জেমস জয়েস, সামুয়েল বেকেট, ফ্রানত্স কাফকা। এই পঙিক্ততে আরও স্থান হতে পারে হেনরিক ইবসেন, আঁরি মিশো, পল সেলান, এমিল সিওরান, হোর্হে লুই বোর্হেস, উইলিয়াম ফকনার, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ভিএস নাইপল, সালমান রুশদি, ডেনিলো কিস, অমিতাভ ঘোষ এবং অন্য আরও অনেকের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকেরাই সাহিত্যের বৈশ্বিক পরিসর ও ইতিহাসের স্রষ্টা। কিন্তু এই সাহিত্যবিশ্বের বৈশিষ্ট্য কী, এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, থাকলে তার স্বরূপ কী, এসব নিয়ে তেমন একটা লেখালেখি হয়নি। সাহিত্যবিশ্বের সামগ্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরিবর্তে বেশিরভাগ আলোাচনা বা লেখালেখিতে স্থান পেয়েছে বিশ্বসাহিত্যের কথা; তাও হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। কিন্তু ‘সাহিত্যবিশ্বের সাতকাহনে’র লক্ষ্য ঠিক এমনটা নয়। এই লেখায় সেই সাহিত্যের কথাই বলা হবে যা রচিত হয়েছে বিশেষ কোনো ঐতিহাসিক পটভূমিতে, বিশেষ কোনো দেশে, বিশেষ কোনো লেখকের হাতে। এরপর যে লেখা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে, প্রভাবিত করেছে নানা দেশের জাতীয় সাহিত্যকে। গভীরভাবে দেখলে আধুনিক সাহিত্যই নানা বৈচিত্র্য আর ভাবনার বৈভবে বদলে দিয়েছে সাহিত্যের প্রচলিত গতিধারা, সামগ্রিক চরিত্র; এই সাহিত্যই হয়ে উঠেছে সাহিত্যবিশ্বের অবশ্যপাঠ্য অনিবার্য কোনো রচনা বা টেক্সট। তবে ইতিহাসের ক্রান্তিকালে রচিত হলেও একক অনন্য সাহিত্যশৈলী আর ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে এক-একটি রচনা আলাদা আলাদা ভাবেই বাড়িয়ে দিয়েছে সাহিত্যবিশ্বের দিগন্ত। ফারনান্দ ব্রোদেলই বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, ইতিহাস বলতে বোঝানো হয় ইউরোপের কথা। কিন্তু তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া কোনো ইতিহাসই পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে না। সাহিত্যবিশ্বের উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোকে এই সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা জরুরি; জটিল বলে তা অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে এই সাহিত্যকে দেখতে হবে ইতিহাস, ভাষা আর সংস্কৃতির বৈশ্বিক পটভূমিতে, খণ্ডিত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। প্রাচ্যবাদ-খ্যাত এডওয়ার্ড সাঈদও মনে করতেন, ‘সাহিত্য হচ্ছে বৈশ্বিক রচনা; এর কিছুটা ঘটনাকেন্দ্রিক, কিন্তু অস্বীকার করবার উপায় নেই যে সামাজিক বিশ্ব, মানবিক জীবন আর অনিবার্যভাবে তাতে থাকে ইতিহাসের সেই ক্ষণমুহূর্তের কথা, যে-সময়ের মধ্যে রচনাটির অবস্থান আর সেই প্রেক্ষাপটেই লেখাটি ব্যাখ্যা করা জরুরি।’ এই বিশ্বদৃষ্টিই, বলা বাহুল্য, সাহিত্যকে জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে সাহিত্যবিশ্বের আলোকে দেখার দৃষ্টিকোণ তৈরি করে দিতে পারে। সংক্ষেপে বললে, সাহিত্যবিশ্ব হচ্ছে পৃথিবীর সমগ্র সাহিত্য। পৃথিবীতে রচিত সব রচনা তাই বৈশ্বিক। এই সাহিত্যবিশ্বই হচ্ছে আমাদের বিশ্বভাবনার জগত্, চিন্তনবিশ্ব। প্রতিটি সৃষ্টিশীল রচনাকে এই সাহিত্যবিশ্বের পটভূমিতে বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন। এভাবেই কোন রচনাটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তা বোঝা যাবে। বোঝা যাবে এর নান্দনিক একত্ব ও অনন্যতার কথা। আমার এই ধারাবাহিক রচনার পববর্তী অংশে পাওয়া যাবে সাহিত্যবিশ্ব গড়ে উঠবার সূচনাপর্বের বিচিত্র বিবরণ। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ফরাসি লেখক ও অনুবাদক ভ্যালেরি লারবো ভেবেছিলেন, একদিন এই পৃথিবীতেই হয়তো আবির্ভাব ঘটবে ‘বৌদ্ধিক আন্তর্জাতিকতার’। সাহিত্যকে তখন আর আঞ্চলিক, দৈশিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা সমীচীন হবে না, প্রয়োজন দেখা দেবে সমালোচনার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির। এভাবেই একক অনন্য হয়ে উঠবার জাতীয়তাবাদী বিভ্রম থেকে মুক্তি পাবে সাহিত্য, মুছে যাবে সাহিত্যিক জাতীয়তাবাদের সীমানা। পৃথিবীর যে প্রান্তে বসেই লেখক কোনো লেখা লিখুন না কেন, তা যদি উল্লেখযোগ্য উত্তীর্ণ কোনো বিশিষ্ট রচনা হয়, তাহলে সেই লেখা ইতিহাস আর আন্তর্জাতিকতায় অভিষিক্ত হবে। হেনরি জেমস সাহিত্যের একক অনন্য অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছিলেন আর ভ্যালেরি লারবো বলেছিলেন বৌদ্ধিক আন্তর্জাতিকতার কথা; আমার এই লেখায় কীভাবে সেই যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে, গড়ে উঠেছে সাহিত্যবিশ্ব, পাওয়া যাবে তারও বিবরণ ও বিশ্লেষণ।