গল্প

দেশ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:২৪
প্রায় দেড়দিন পর তেরপল সরিয়ে উঁকি দিল আব্দুল কাদের। কাল ভোরে বায়দোয়া থেকে রওনা হবার পর এই প্রথম আকাশ দেখলো সে। বাইরে ঝকঝকে রোদ। তেরপলের ফাঁক দিয়ে দস্যুর মতো ছুটে আসছে সমুদ্রের হাওয়া। তারপরেই আটকে যাচ্ছে তেরপল-ঢাকা ট্রাকের চৌহদ্দিতে। ভ্যাঁপসা গরমে কলা আর তেরপলের গন্ধ মাখামাখি হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার নাক। অনেকক্ষণ পর পর নিঃশ্বাস নিচ্ছে আব্দুল কাদের। পুরোপুরি ঢাকনা সরিয়ে মাথা বের করার সাহস হচ্ছে না। মোহামেদ ওসমান তাকে বায়দোয়া থেকেই সাবধান করে দিয়েছিল, ‘আর যা-ই কর, বন্দরে ঢোকার সময় মাথা তোলার চেষ্টা করো না। কড়া চেকিং, বাংলাদেশি সৈনিকরা গেটে আছে। কার্ড ছাড়া মশা পর্যন্ত ঢুকতে পারে না বন্দরে’। ‘না, মাথা বের করার দরকার কী? এক ঘুমে পার করে দেবো’ ভেবেছিল কাদের। তিন মাস ধরে প্ল্যান করেছে সে। মোহামেদ ওসমানকে গুনে দিতে হয়েছে পঁচিশ ডলার। এত কিছুর পর এই সামান্য কারণে পিছু হটবে না আব্দুল কাদের। চারশ কিলোমিটার রাস্তা প্রায় ঘুমিয়েই কাটিয়েছে সে। ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচার জন্যে প্রচুর খাত চিবিয়েছিল ট্রাকে ওঠার আগে। এতে ক্ষুধা মরে গিয়েছিল ঠিকই, তবে ঘুমও চলে গিয়েছিল চোখ থেকে। পরে ট্রাকের দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল কাদের। পাহাড়ের চড়াই উতরাই পার হবার সময় ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙেছে মাঝে মাঝে। স্বপ্নও দেখেছে দু-একবার। একবার দেখে, ইফরার সাথে হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে বায়দোয়ার কলাবাগানে। আর একবার তীব্র আতংকে ঘুম ভেঙে গেছে। সিয়াদ বারির সৈন্যরা রাইফেল বাগিয়ে তেড়ে এসেছিল স্বপ্নে। তখন বুকের ভেতর ভেসে উঠেছিল বৃদ্ধা মায়ের মুখ, ভাইদের মৃত্যুদৃশ্য আর বোনের ছলছল চোখ। তবে কোনো কিছুই ফেরাতে পারেনি তাকে। কোনো ছবিই স্থায়ী হয়নি বুকের গহনে। এই দেশে থাকা মানে প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। এর চেয়ে পালিয়ে যাওয়া ভালো। দেশ যদি তাকে কাপুরুষ ভাবে তো ভাবুক। তার কাছে এসবের কোনো মানে নেই। বায়দোয়ায় বাংলা ক্যাম্পে যাওয়া আসা ছিল তার। অফিসারদের ফাইফরমাস খাটত সে মাঝে মাঝে। শহর থেকে কিছু এনে দেওয়া, গেরিলাদের খোঁজ-খবর দেওয়ার বিনিময়ে দুই-এক ডলার বকশিস পেত কাদের। ১ ডলার এখন অনেক টাকা। যুদ্ধের আগে ৪ সিলিং-এ পাওয়া যেত ১ ডলার। এখন সেটা ভাঙিয়ে পাওয়া যায় ৪০০০ সিলিং। হাজার সিলিং-এর নোট তো যার তার কাছে পাওয়া যায়। সৌখিন বিদেশিরা এক, দুই সিলিং-এর কয়েন কেনে পাঁচশ সিলিং দিয়ে। কারণ, ছোট নোটগুলো কাজে লাগতে না লাগতে এখন এন্টিক হয়ে গেছে। কয়েন বিক্রির সূত্রেই তার পরিচয় হয়েছিল এক বাঙালি অফিসারের সাথে। দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবার ইচ্ছার কথা শুনে অনেক বুঝিয়েছিলেন তাকে ক্যাপ্টেন মাসুদ। ‘কী বলো তুমি, দেশ ছেড়ে কেউ যায়? এই যে আমি এত দূরে পড়ে আছি! দেশের কথা মনে হলে কেমন লাগে জানো? মনে হয় পালিয়ে চলে যাই’। আব্দুল কাদের বলেছিল, ‘আমিও তো তাই যেতে চাই’। শুনে হেসেছিলেন মাসুদ, তোমার যাওয়া আর আমার যাওয়া এক? আমি তো আমার মা, বাবার কাছে ফিরতে চাই। তুমি তো তাদের কাছ থেকে পালাতে চাইছ’। সে হতাশ হয়েছিল মাসুদের কথায়, ‘ইউ স্যার নট আন্ডারস্টান্ড মাই পব্লেম। দিস সোমালিয়া, নট মাই কান্ত্রি। আই ফম ইয়েমেন’। সি মাই স্কিন, মোর ফেয়ার লাইক ইউ, বাংলা’। কাদেরের এ ধরনের ইংরেজির সাথে মাসুদ পরিচিত। তাকে দেশ সম্পর্কে দু-একটা কথা বলে বিদায় করে দিয়েছিলেন তিনি। সিয়াদ বারির সময় বছর দুই সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছিল কাদের। তাদের পূর্বপুরুষদের হূত গৌরব উদ্ধারের উসিলায় ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিল সিয়াদ বারি। যুদ্ধে পরাজয় তাকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়ে দিয়েছিল। সেই সুযোগে ক্ষমতায় এলেন ফারাহ আইদিদ। জানিয়ে দিলেন, ‘হূত গৌরব-টৌরব কিছু নয়। এ ছিল সিয়াদ বারির ক্ষমতায় টিকে থাকার শেষ চেষ্টা’। যুদ্ধের পর সেনাবাহিনী থেকে ছাটাই হয়ে গেল আব্দুল কাদের। তার গোত্রের মিলিশিয়া প্রধান, কাদেরকে ভেড়াতে চেয়েছিল দলে। মোগাদিসু থেকে বায়দোয়া পালিয়ে বেঁচেছিল সে। তার বদলে মিলিশিয়ারা তার বাবা আব্দুল মোত্তাকিনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে তার উদ্বাস্তুর মতো বেঁচে থাকা। মহাজনের কলার খামারে কাজ করতে করতে একদিন তার মনে হলো, বায়দোয়া থেকে কলা যায় মোগাদিসু বন্দরে। সেখান থেকে জাহাজে করে চালান হয় বিদেশে। কোনো মতে কলার বাক্সে লুকিয়ে জাহাজে উঠতে পারলেই পিছে ফেলা যায় সোমালিয়ার দুঃসহ স্মৃতি। অবশ্য এই চিন্তাটা স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। ইফরার সাথে একদিন আলোচনা করতে গিয়েছিল সে। মেয়েটি তার সমস্যা বোঝার চেষ্টাও করেনি। বলেছে, ‘মনে যদি এই মতলব থাকে, এখনই আমার কথা ভুলে যেতে পারো তুমি’। কাদের তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ‘এদেশে এভাবে থাকলে একদিন এমনিতেই মরে যেতে হবে আমাদের। তার চেয়ে বড় কথা, এদেশের জন্যে আমি মরতে যাব কেন? আমার দেশ ইয়েমেন। আমার পূর্বপুরুষরা ছিলেন নবীজির আত্মীয়’। মুখ ঝামটা দিয়ে উঠেছিল ইফরা। ‘নবীজির আত্মীয় বলে কাজ হবে না। এদেশে জন্ম তোমার, নবীজির কোন নির্দেশটা তোমরা শোন? চারটা করে বিয়ে করা, বউদের সম্পত্তি হাতানো আর মারামারি ছাড়া আর তো কিছু করতে দেখি না’। ইফরার মুখ ঝামটানির সাথে পরিচয় ছিল তার। তবে মেয়েটার মুখের এই কথাগুলোর সাথে তার পরিচয় ছিল না। সিয়াদ বারি উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে বাবার সম্পত্তিতে মেয়েদের সমান অধিকার ঘোষণা করার পর থেকে মেয়েদের মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে। সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। যুদ্ধ আর দুর্যোগে এমনিতেই অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে তারা। পাঁচ ভাইয়ের চার জনকেই খেয়েছে যুদ্ধ আর হানাহানি। থাকার মধ্যে একটি মাত্র বোন। আইন না হলেও তাকেই অর্ধেক সম্পত্তি দিয়ে দেবে ভেবেছিল সে। ইফরার সাথে কথা বলার পর এসব কথা নতুন করে মনে পড়েছিল বটে, তবে তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ইফরার ধরে আসা গলা আর চোখের কোনে সযত্নে লুকিয়ে ফেলা অশ্রু। এদের ছেড়ে, এদেশ ছেড়ে চলে যাবার কথা কিছুদিনের জন্যে মন থাকে মুছে ফেলেছিল সে। গত মাসে ক্যান্ডি ফ্যাক্টরিতে যুদ্ধের পর সোমালিয়ায় ভালোভাবে বেঁচে থাকা আরও কঠিন হয়ে গেল। আমেরিকানরা পাগলা কুত্তার মতো হয়ে গেছে। মোগাদিসুতে ধরপাকড় শুরু হয়েছিল আগেই। এখন বায়দোয়াও এসে লেগেছে তার ঢেউ। এভাবে নিজের দেশে বিদেশিদের চোখ রাঙানি সয়ে বেঁচে থাকা যায়! কলার ক্ষেতে কাজ সেরে ফেরার সময় একদিন মোহামেদ ওসমানেকে সে একলা পেয়ে গেল। ওসমানের সাথে কলার বেপারিদের ভালো জানাশোনা। ট্রাক ড্রাইভাররাও তাকে চেনে। প্রথমে সে রাজি হয়নি, পরে টাকার টোপটা গিলেছে। দশ ডলার থেকে শুরু হয়েছিল দরাদরি, রফা হয়েছে ২৫ ডলারে। ওসমান হিসাব করেছিল, ‘দিব্যি একটা বন্দুক হয়ে যাবে এ টাকায়’। উট বা গরুর চেয়ে তা ঢের ভালো। জানোয়ারের দেখা শোনা করতে হয়। খাবার দিতে হয়। আর বন্দুক? শুধু কেনো আর ভাড়া দাও। কোনো ঝুটঝামেলা নেই মাসে মাসে পয়সা গোনা ছাড়া। আর ওসমানের কাজ শুধু ট্রাকে উঠিয়ে দেওয়া পর্যন্ত। বন্দরে যদি কাদের ধরা পড়ে, ওসমান তাকে চিনবে না। খাতের ঘোরটা কেটে যাওয়ায় ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছিল কাদেরের। ইচ্ছে করলে কলার বাক্সে হাত দেওয়া যায়, তবে দেড়দিন ধরে কলার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে তার বিরক্তি ধরে গেছে। বন্দরে তেমন সাড়াশব্দ নেই। সাহস করে তেরপলের বাইরে মাথা বের করে ট্রাকটা কোথায় থেমেছে ঠাওর করার চেষ্টা করল কাদের। বন্দরের কন্টেইনার টারমিনাল তার মোটামুটি চেনা। সেনাবাহিনীতে যাবার আগে কিছুদিন এখানে কাজ করেছিল সে। জাহাজে মাল লোড করার সময় অনেক মানুষ থাকে, ছোট ছোট ভিড়ভাট্টাও হয়ে যায়। সেই ফাঁকে উঠে পড়তে পারলেই হলো। সে শুনেছে, জাহাজে অনেক লুকানোর জায়গা আছে। বন্দর থেকে জাহাজ বের হবার আগে ধরা না পড়লেই হলো। টারমিনালের পাশে ছোট ছোট দোকানগুলোর কথাও তার মনে আছে। আগে এত কড়াকড়ি ছিল না। ভাত, ঝলসানো মাছ, চা, বিস্কুট সবই পাওয়া যেত সেখানে। এসব মনে পড়তেই ক্ষুধাটা আরো একটু মুচড়ে দিলো পেট। আব্দুল কাদের ভালো করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল। মাল বোঝাই ট্রাকগুলো সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের ছায়াটি পর্যন্ত নেই। হঠাত্ হঠাত্ বাতসে ভেসে আসছে বিগড্রামের আওয়াজ। খুব স্পষ্ট নয়। তবে আওয়াজটা তার চেনা। মার্চ করার সময় যে ব্যান্ড বাজে সেই ব্যান্ডের বিগড্রাম। আর কোনো শব্দ নেই। তার মানে কোনো কারণে আজ পাহারা তেমন জোরদার নয়। বন্দরে একবার যখন ঢোকা গেছে, আর তেমন অসুবিধা নেই। এত ট্রাক, কন্টেইনারের সারি, এখানে লুকিয়ে থাকা কঠিন নয়। সে চারদিকে আরেকটু দেখে নিয়ে টুপ করে নেমে পড়ল ট্রাক থেকে। তাদের ট্রাক থেমেছে বন্দরের দক্ষিণ দিকে। খাবারের দোকানগুলো ছিল উত্তর দিকে। তারমানে খাবারের সন্ধানে তাকে প্রায় পুরোটা টারমিনাল পাড়ি দিয়ে উত্তরে যেতে হবে। ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। তারপরও একটা সুযোগ নিতে হবে। পা টিপে টিপে উত্তরে সরতে শুরু করল সে। একটু দূরে আসতেই আইরিশ এক সৈনিকের দিকে চোখ পড়লো তার। রাইফেল পিঠে ঝুলিয়ে ক্যাম্পস টুলের ওপর বসে আছে কোলের ওপর বই মেলে। কাছেপিঠে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ঝট করে একটি কন্টেইনারের পাশে সরে গেলো কাদের। একবার সামনের দিকে তাকিয়ে আবার বইয়ের মধ্যে ডুব দিল সৈনিকটি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার পা বাড়াল কাদের। খানিক দূর যাবার পর এক সোমালি পুলিশের খপ্পরে পড়ল সে। পুলিশকে অবশ্য তার ভয় নেই। প্রথমে হম্বিতম্বি করলেও টাকা দিলে কাজ হয়। সম্ভব হলে বন্দরে ঢোকার একটি পাশও জোগাড় করে দিতে পারে পুলিশ। আব্দুল কাদেরকে তল্লাশি করে পকেটে খাতের কিছু ডাল ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না। পুলিশের কাছেই জানা গেল, বাংলা ক্যাম্পে মেডেল প্যারেডের ফাইনাল রিহারসেল হচ্ছে। স্থানীয় সোমালিদের অনেকেই ক্যাম্পে দাওয়াত পেয়েছে। যারা পায়নি তারা গিয়েছে রিহারসেল দেখতে। বাংলারা অন্যদের মতো নয়। ক্যাম্পে একবার ঢুকতে পারলে অন্তত বিনি পয়সার খানাটা পাওয়া যায়। পুলিশটি বলল, ‘চুরির মতলব আছে কী না বল, এখানে ঢুকলি কী করে?’ কাদের অনায়াসে তাঁর দুঃখের কথা বলে গেল, কলার গাড়িতে বাইদোয়া থেকে মাকে দেখতে এসেছে শুনে পুলিশটার একটু করুণা হলেও হতে পারে। একটু দুখি মনে হলো পুলিশটাকে। সেই সুযোগে আব্দুল কাদের পাশের ব্যপারে একটা রফা করে ফেলল। পুলিশের কাছে আরও জানা গেল, দুটি জাহাজ আজ বন্দর ছেড়ে যাবে। তাঞ্জানিয়ার জাহাজটির কথা ভাবল সে। গরিব হলেও দারেসসালাম বন্দর থেকে অন্য কোনো দেশে যাবার সুযোগ আছে। নগদ ১০ ডলার আর বাংলা ক্যাম্পে যদি খাবার পাওয়া যায় তার আধাআধি বখরার কড়ারে পাশের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিল পুলিশ। কাদের আর দেরি না করে বাংলা ক্যাম্পের দিকে রওনা দিল। কন্টেইনার টার্মিনাল ছাড়িয়ে একটু দূরে ক্যাম্প। বিগ ড্রামের আওয়াজ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। সেই সাথে সাথে কানে আসছে পরিচিত গানের সুর। পুরোপুরি শোনা যাচ্ছে না। একেকবার কানের পর্দায় ঝাপ্টা দিয়ে বাতাসের দোলায় দূরে সরে যাচ্ছে সু...মালিয়ে তো সু... (জাগো সোমালিয়া)। স্কুলে ভর্তি হবার আগে, মা তাকে খানিকটা শিখিয়ে দিয়েছিল এই গান। সোমালিয়ে তো সু, তো সু স্কুদির সাদায়ে। মা যখন সু...মালিয়ে তো সু বলে টান দিতেন তখন সমস্ত রক্ত এসে জমা হতো তার মুখে। আলোকিত হয়ে উঠত তার মুখ। কাদেরের মনে হতো সোমালিয়ার সবাই যেন জেগে উঠছে তার মায়ের কণ্ঠ শুনে। এই গান শুনলেই দুলে উঠত তার মন। নিতম্ব দুলিয়ে নাচ শুরু করত সে। শুধু স্কুলের অ্যাসেম্বলি নয়, ঈদে মিলাদুন্নবি আর সোমালিয়ার ন্যাশনাল ডে-র প্যারেডেও এই গান গাইত সবাই। মোটকথা এই গান মানেই কোনো না কোনো উত্সবের দিন। ক্ষুধায় যতটুকু কাতর হয়ে পড়েছিল, গান শুনে ততটাই চনমনে হয়ে উঠল তার মন। সেই সাথে মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল। গানটা একবার গাইতে ইচ্ছা হলো। নিজেকে শাসন করল সে বিড়বিড় করে। ‘এ গানের জন্যে তোর এত দরদ কেন? সোমালিয়া কি তোর দেশ?’ তবে সুরটা মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করতে থাকল। একবার মনে হলো, বাংলা ক্যাম্পে গিয়ে সবার সাথে দাঁড়িয়ে সে এই গানটি একবার গাইবে। ‘চলে তো যাবই আজ অথবা কাল। শেষবারে মতো একবার গানটি গাইলে কী ক্ষতি?’ অবশ্য একটি ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে, পরিচিত কেউ যদি দেখে ফেলে! মায়ের সাথে দেখা হলে মা তাকে দেশ ছাড়তে দেবেন না। পর মুহূর্তে মনে হলো, মা এখানে আসবেন কোত্থেকে? গান গাইবার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়ে উঠল। আরো জোরে পা চালাল আব্দুল কাদের। ড্রামের আওয়াজ এখন আরো স্পষ্ট। সেনাবাহিনীতে থাকার সময় এই আওয়াজে তাল মিলিয়ে মার্চ করা শিখেছিল সে। এই শব্দ শুনলে এমনিতেই হাতপায়ে ছন্দ চলে আসে। সে একসময় নিজের অজান্তেই দৌড় শুরু করল ক্যাম্পের দিকে। রাস্তা থেকে ক্যাম্প পর্যন্ত সোমালিয়া আর বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ক্যাম্পের গেট থেকে একটু দূরে অনেক মানুষের ভিড়। তবে মূল অনুষ্ঠানটা হচ্ছে ক্যাম্পের সামনের খোলা জায়গায়। পেছনে পাহাড়ের গায়ে গ্যালারির মতো বানানো হয়েছে কাঠের তক্তা দিয়ে। সেখানেও অসংখ্য মানুষ। মোগাদিসু শহরের সবাই চলে এসেছে নাকি এখানে? কাদের ভাবল, একবার বাংলাদের কাছে পৌঁছাতে পারলেই খাবার পাওয়া যাবে। জাহাজেও নিয়ে যাওয়া যাবে। বন্দর ছাড়ার আগে জাহাজে কোনো রকম খাবার পাবার সম্ভাবনা নেই। নিজের অজান্তেই গতি বেড়ে গেল তার। বাংলা ক্যাম্পের গেটে পৌঁছানোর প্রায় সাথে সাথেই চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো তার। পায়ের নিচে মাটিটা সরে গেল হঠাত্ করেই। শেষ কথা কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, কাদেরের মনে নেই। সেটা ঘুম না অন্য কিছু তা-ও ঠাওর করতে পারছিল না সে। এই ঘর তার পরিচিত নয়। চোখ মেলতেই যে মুখটিকে তার ওপর ঝুঁকে পড়া দেখতে পেলো সে, মুখটি তার মায়ের। কিন্ত মা এখানে এল কিভাবে? আরেক জনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে। ‘চোখ মেলেছে,’ আওয়াজটা আসছে পায়ের দিক থেকে। একটু ঝুঁকে এল মায়ের মুখটা। ‘আমার বাবা তাকিয়েছে’ বলতে বলতে মুখটা আরও নামিয়ে ফেললেন তিনি। তার চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু টুপ করে ঝরে পড়লো আব্দুল কাদেরের গালে। উঠে বসার চেষ্টা করল সে। সামনে থেকে প্রায় দৌড়ে এলো এক বাংলাদেশি সৈনিক। বলল, ‘যেমন আছ শুয়ে থাকো। শরীরে কিছু নেই। পেটে দানাপানি পড়েনি কতদিন?’ আবার শোনা গেল মায়ের গলা। ‘কোথায় ছিলি আমার জানের টুকরা?’ আব্দুল কাদেরের সব হিসাব গোলমাল হয়ে যেতে লাগল। আরো একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলো সে। মিটি মিটি হাসতে হাসতে ক্যাপ্টেন মাসুদ বললেন, ‘ইজ কা ওয়ারান? ওয়াক্তহ জি কামা আরাং’ (কেমন আছ?, অনেকদিন দেখা নাই)। কিছু বলল না আব্দুল কাদের। লাজুক হাসি দিয়ে তাকাল মাসুদের দিকে। মাসুদ বললেন, ‘কোথায় ছিলে এতদিন? আর ওরকম পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিলেই বা কেন? ভাগ্যিস, তোমার মা এসেছিলেন রিহারসেলে গান করতে, আর আমার সেন্ট্রি না দেখলে তো চলেই গিয়েছিলে পরপারে’। মায়ের চোখ আবার জলে ভরে উঠল। তিনি কাদেরের মাথাটা কোলে নিয়ে বসলেন, ‘পরপারে মানে? কিভাবে যাবি তুই, এই বুড়িকে রেখে? খোদা কি এতই নিষ্ঠুর!’ কাদেরের বুকের লাফিয়ে ওঠা উত্তরটা কেউ শুনতে পেলো না। ‘পরপারে না হোক, এদেশ তো ছেড়ে যেতে পারতাম!’ আব্দুল কাদের দুই হাতে জড়িয়ে ধরল তার মাকে। তারপর বলল, মা, ওই গানটা একবার গাও না! সুমালিয়ে তো সু। লজ্জা পেয়ে গেলেন মা, ‘ধুর পাগল, এখানে কত লোক।’ ‘হোক না! কোনো অসুবিধা নেই।’ খুব মিহি গলায় শুরু করলেন তিনি—সু মা লিয়ে তো সু...। আস্তে আস্তে এম আই (মেডিকেল ইন্সপেকশন) রুমের সবাইকে ছুঁয়ে যেতে লাগল সেই সুর। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে এলো তার। মনে হলো, মা নয়, তার দুঃখিনি দেশই যেন চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে জেগে ওঠার গান।